শেয়ারবাজারে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এক বড় ধরণের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ক্যাশ ডিভিডেন্ড (নগদ লভ্যাংশ) পরিশোধে ব্যর্থতা, আর্থিক প্রতিবেদনে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে তিনটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির চেয়ারম্যান, পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর মোট ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকার বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১০১৪তম কমিশন সভায় এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে। পুঁজিবাজারে জবাবদিহিতা তৈরি করতে বিএসইসির এই অবস্থানকে একটি সময়োপযোগী ও কড়া বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিচে অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোর আইন লঙ্ঘন এবং জরিমানার বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেড, কোম্পানিটি ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছিল। ঘোষিত মোট ৭ কোটি ৪৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪৬৪ টাকার মধ্যে কোম্পানিটি সিংহভাগ পরিশোধ করলেও ১ কোটি ১৬ লাখ ৮১ হাজার ৬৪৯ টাকা বিনিয়োগকারীদের দিতে ব্যর্থ হয়।
বিএসইসি আদেশ দিয়েছে যে, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই অবণ্টিত লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের বুঝিয়ে দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড কার্যকর হবে এবং পরবর্তী ৭ দিনের মধ্যে তা আদায় করা হবে। তাছাড়া, এই জরিমানা পরিশোধ করলেও কোম্পানি লভ্যাংশ দেওয়ার দায় থেকে মুক্তি পাবে না। সময়মতো জরিমানা না দিলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা গুনতে হবে।
চেয়ারম্যান শফিউল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলামকে ৩০ লাখ টাকা করে এবং পরিচালক খালেদা ইসলাম, সাজেদুল ইসলাম ও ফারহানা ইসলামকে ২০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া তৎকালীন সিএফও-কে ১০ লাখ ও কোম্পানি সেক্রেটারিকে ৫ লাখ টাকা ব্যক্তিগত জরিমানা করা হয়েছে। এই কোম্পানিতে মোট জরিমানার পরিমাণ ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এই কোম্পানির অপরাধটি আরও গুরুতর। তারা ২০২৩ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেছিল, যা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার শামিল। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কমিশন পর্ষদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এনামুল কবির খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল কবির খান, পরিচালক মো. রুহুল কবির খান, হযরত আলী ও জারিন কবির খানকে ২৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. আজিজুল জব্বারকে ১০ লাখ টাকা এবং কোম্পানি সচিব তাপস কুমার সরকারকে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই কোম্পানির সংশ্লিষ্ট সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মোট ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জরিমানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জেনেক্স ইনফোসিস ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের অ্যাকাউন্টে পাঠাতে ব্যর্থ হয়। এটি সরাসরি সিকিউরিটিজ আইন ও বিধি-বিধানের লঙ্ঘন।
লভ্যাংশ প্রদানে ব্যর্থতার দায়ে কোম্পানির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আদনান ইমাম, অ্যাক্টিং ম্যানেজিং ডিরেক্টর শাহজালাল উদ্দিন, পরিচালক চৌধুরী ফজলে ইমাম, প্রিন্স মজুমদার, ওরাকল সার্ভিসেস পিএলসি, নিলুফার ইমাম এবং তৎকালীন সিএফও ও কোম্পানি সেক্রেটারিসহ মোট আটজনকে ১ লাখ টাকা করে (সর্বমোট ৮ লাখ টাকা) জরিমানা করা হয়েছে।
কমিশন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, জরিমানার এই অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত দায় হিসেবে গণ্য হবে, অর্থাৎ কোম্পানির তহবিল থেকে এই টাকা দেওয়া যাবে না। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও এমন জিরো টলারেন্স নীতি ও কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে বিএসইসি।
ইয়াসিন 





















