১০:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

শবে বরাতের সামাজিক ভূমিকা

শবে বরাত উপমহাদেশের মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব বা ritual. এটিকে উৎসব বলার কারণ হচ্ছে, শবে বরাতের রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ বাড়তি এবাদত করে থাকেন। এ রাতে প্রায় প্রতিটি মসজিদে দোয়া-দুরুদ, জিকির এর পর মিষ্টি, হালুয়া রুটি বিতরণ করা হয়। আবার কোথাও গরু জবাই করে খিচুড়ি বা তেহারি রান্না করে উৎসব মুখর পরিবেশে খাওয়া দাওয়া করা হয়। ছোট বেলায় আমি এ দিনটির অপেক্ষায় থাকতাম এগুলো পাওয়ার আশায়। তখন আমরা শবে বরাতের রাতে এবাদত- বন্দেগী করে দল বেঁধে কবর জিয়ারত করতাম। আমার আম্মা অনেক রাত পর্যন্ত এবাদত-বন্দেগী করতেন আর আমাদের সবার জন্য আল্লাহ পাকের নিকট দোয়া করতেন।

আম্মা বলতেন, এদিন খাছ নিয়তে আল্লাহ পাক এর নিকট যা চাইবি আল্লাহ পাক তাই দিবেন। আমি তা বিশ্বাস করে বড় একটা মোনাজাত দিয়ে একই জিনিস বারবার শুধু চাইতে থাকতাম এবং একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। আমার পূর্ব পুরুষদের সবাই শবে বরাত পালন করতেন বলে শুনেছি। এটি পালন নিয়ে কোন বিতর্ক আমি ছোট বেলায় শুনিনি। ইদানিং এটি পালন নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। অনেকে বলছেন শবে বরাত পালন বেদাত বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অবৈধ।

অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের কথা শুনে মনে হয় শবে বরাত পালনকারীগণ মুসলিম হিসেবে গন্য হবে না। শবে বরাতের রাতে বাড়তি এবাদত, হালুয়া-রুটি খাওয়া ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া ইসলামের মূল নীতির সাথে কিভাবে বিরোধ তৈরি করে? ইসলামে প্রতিবেশীদের উপর দায়িত্ব-কর্তব্যের নির্দেশনা রয়েছে। এবাদত কিভাবে অবৈধ হতে পারে?

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম একটি বিখ্যাত বই লিখেছেন যার টাইটেল হচ্ছে The Elementary Forms of Religious Life. ধরা হয় এ বইটি ধর্মের সামাজিক ভূমিকা ব্যাখ্যায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ। তিনি গবেষণায় দেখেছেন বিভিন্ন আচার বা Rituals এর মাধ্যমে ধর্মের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। Rituals অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ Rituals এ একই ধর্মের অনুসারীরা একত্রিত হয়। এতে তাদের মধ্যে ঐক্যবোধ জাগ্রত হয়। এছাড়া Rituals সম্প্রদায়ের মধ্যে যেকোন নতুন রীতি বা আদর্শের বাস্তবায়নের উপলক্ষ্য হিসেবেও কাজ করে। ডুর্খেইম তাই মনে করেন ধর্ম নিজেই একটি সমাজ। আর Rituals মূলত একই সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীকে একটি ছাতার নিচে দাড় করিয়ে দেয়।

আমিতো মনে করি শবে বরাত সমাজের প্রতি, একজন মুসলিমের প্রতি বা প্রতিবেশীদের প্রতি, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি দায়িত্ববোধের একটি Orientation. নবী মুহাম্মদ (স:) তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন প্রতিবেশীদের, সমাজের মানুষের কল্যাণ করে। প্রতিবেশী বা সমাজে ব্যক্তির দায়িত্ববোধ যেকোন Orientation এর মাধ্যমেই বিকাশ লাভ করে। শবে বরাতের রাতে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ হয় কি হয়না তা নিয়ে আমরা বিতর্ক করতেই পারি। কিন্তু হালুয়া-রুটি খাওয়া, প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া, কবর জিয়ারত করা, এবাদত করা, মসজিদে লাইন ধরে জিলাপি-মিষ্টি সংগ্রহ করে খাওয়া ও সমবয়সীদের সাথে মজা করা ইত্যাদি কোন্ দৃষ্টিতে অবৈধ হতে পারে? তাই শবে বরাত পালনকে নিরুৎসাহিত করার জন্য যারা নানা বয়ান দিচ্ছেন তারা শবে বরাত পালনের সামাজিক ভূমিকাকেও বিবেচনায় নিবেন আশা করছি। সমাজে আরও নানা কর্মকাণ্ড ধর্মের নামে হচ্ছে যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে – এগুলো নিয়ে আমাদের অনেক মনোযোগী হওয়া উচিত।

লেখক : ড. আবু সিনা ছৈয়দ তারেক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ

জনপ্রিয় সংবাদ

শবে বরাতের সামাজিক ভূমিকা

প্রকাশিত : ০২:২৬:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ মার্চ ২০২৩

শবে বরাত উপমহাদেশের মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব বা ritual. এটিকে উৎসব বলার কারণ হচ্ছে, শবে বরাতের রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ বাড়তি এবাদত করে থাকেন। এ রাতে প্রায় প্রতিটি মসজিদে দোয়া-দুরুদ, জিকির এর পর মিষ্টি, হালুয়া রুটি বিতরণ করা হয়। আবার কোথাও গরু জবাই করে খিচুড়ি বা তেহারি রান্না করে উৎসব মুখর পরিবেশে খাওয়া দাওয়া করা হয়। ছোট বেলায় আমি এ দিনটির অপেক্ষায় থাকতাম এগুলো পাওয়ার আশায়। তখন আমরা শবে বরাতের রাতে এবাদত- বন্দেগী করে দল বেঁধে কবর জিয়ারত করতাম। আমার আম্মা অনেক রাত পর্যন্ত এবাদত-বন্দেগী করতেন আর আমাদের সবার জন্য আল্লাহ পাকের নিকট দোয়া করতেন।

আম্মা বলতেন, এদিন খাছ নিয়তে আল্লাহ পাক এর নিকট যা চাইবি আল্লাহ পাক তাই দিবেন। আমি তা বিশ্বাস করে বড় একটা মোনাজাত দিয়ে একই জিনিস বারবার শুধু চাইতে থাকতাম এবং একপর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। আমার পূর্ব পুরুষদের সবাই শবে বরাত পালন করতেন বলে শুনেছি। এটি পালন নিয়ে কোন বিতর্ক আমি ছোট বেলায় শুনিনি। ইদানিং এটি পালন নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। অনেকে বলছেন শবে বরাত পালন বেদাত বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অবৈধ।

অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের কথা শুনে মনে হয় শবে বরাত পালনকারীগণ মুসলিম হিসেবে গন্য হবে না। শবে বরাতের রাতে বাড়তি এবাদত, হালুয়া-রুটি খাওয়া ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া ইসলামের মূল নীতির সাথে কিভাবে বিরোধ তৈরি করে? ইসলামে প্রতিবেশীদের উপর দায়িত্ব-কর্তব্যের নির্দেশনা রয়েছে। এবাদত কিভাবে অবৈধ হতে পারে?

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম একটি বিখ্যাত বই লিখেছেন যার টাইটেল হচ্ছে The Elementary Forms of Religious Life. ধরা হয় এ বইটি ধর্মের সামাজিক ভূমিকা ব্যাখ্যায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ। তিনি গবেষণায় দেখেছেন বিভিন্ন আচার বা Rituals এর মাধ্যমে ধর্মের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। Rituals অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ Rituals এ একই ধর্মের অনুসারীরা একত্রিত হয়। এতে তাদের মধ্যে ঐক্যবোধ জাগ্রত হয়। এছাড়া Rituals সম্প্রদায়ের মধ্যে যেকোন নতুন রীতি বা আদর্শের বাস্তবায়নের উপলক্ষ্য হিসেবেও কাজ করে। ডুর্খেইম তাই মনে করেন ধর্ম নিজেই একটি সমাজ। আর Rituals মূলত একই সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীকে একটি ছাতার নিচে দাড় করিয়ে দেয়।

আমিতো মনে করি শবে বরাত সমাজের প্রতি, একজন মুসলিমের প্রতি বা প্রতিবেশীদের প্রতি, আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি দায়িত্ববোধের একটি Orientation. নবী মুহাম্মদ (স:) তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন প্রতিবেশীদের, সমাজের মানুষের কল্যাণ করে। প্রতিবেশী বা সমাজে ব্যক্তির দায়িত্ববোধ যেকোন Orientation এর মাধ্যমেই বিকাশ লাভ করে। শবে বরাতের রাতে মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ হয় কি হয়না তা নিয়ে আমরা বিতর্ক করতেই পারি। কিন্তু হালুয়া-রুটি খাওয়া, প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া, কবর জিয়ারত করা, এবাদত করা, মসজিদে লাইন ধরে জিলাপি-মিষ্টি সংগ্রহ করে খাওয়া ও সমবয়সীদের সাথে মজা করা ইত্যাদি কোন্ দৃষ্টিতে অবৈধ হতে পারে? তাই শবে বরাত পালনকে নিরুৎসাহিত করার জন্য যারা নানা বয়ান দিচ্ছেন তারা শবে বরাত পালনের সামাজিক ভূমিকাকেও বিবেচনায় নিবেন আশা করছি। সমাজে আরও নানা কর্মকাণ্ড ধর্মের নামে হচ্ছে যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে – এগুলো নিয়ে আমাদের অনেক মনোযোগী হওয়া উচিত।

লেখক : ড. আবু সিনা ছৈয়দ তারেক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ