১০:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

কৃষি বাঁচলে বাঁচবে খাদ্য নিরাপত্তা: ড. আনসারী

বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ খাদ্য চাহিদা এই খাত থেকেই পূরণ হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গবেষণায় সীমাবদ্ধতা, ফসলের অপচয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে কৃষি খাত।

এমন এক সময়ে নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। কৃষি খাতের উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—সেসব বিষয়ে দেশ সমাচারের বিশেষ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন দেশের কৃষি খাতের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও এসিআই পিএলসি-এর গ্রুপ অ্যাডভাইজার ড. এফ এইচ আনসারী। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন দেশ সমাচারের সম্পাদক ও প্রকাশক শাহাদাত হোসেন।

নিচে সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

শাহাদাত হোসেন: আপনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের কৃষি খাতের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। নতুন সরকারের আসন্ন বাজেট নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনার প্রত্যাশা কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: বাংলাদেশে আমরা মূলত দুটি কারণে কৃষি করি—প্রথমত কর্মসংস্থান এবং দ্বিতীয়ত খাদ্য সংস্থান। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ খাদ্য চাহিদা স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। সামান্য কিছু খাদ্যপণ্য বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়।

এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি এগ্রি ভ্যালু চেইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সরকার যদি বাজেটে এই ভ্যালু চেইনের প্রতিটি ধাপকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করে, তাহলে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত হবে, কর্মসংস্থান বজায় থাকবে এবং কৃষির বিদ্যমান সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

শাহাদাত হোসেন: বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তন।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কোথাও অতিবৃষ্টি হচ্ছে, আবার কোথাও তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি হাওড় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ধান পানিতে ডুবে গেছে।

এই বাস্তবতা আমরা পরিবর্তন করতে পারব না, কিন্তু এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আর সেই সক্ষমতার প্রথম শর্ত হলো কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

শাহাদাত হোসেন: গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: আমাদের দেশে একটি গবেষণার ফল কৃষকের হাতে পৌঁছাতে প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এর চেয়ে অনেক বেশি।

তাই গবেষণাকে দ্রুততর করতে হবে। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, বেসরকারি খাতকেও গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণা ইতোমধ্যে প্রস্তুত রয়েছে। সেগুলো দ্রুত দেশে এনে অভিযোজন করা সম্ভব। এজন্য অন্তত ১০০টি বেসরকারি কোম্পানিকে গবেষণায় উৎসাহিত করতে বাজেটে বিশেষ সহায়তা, স্বল্প সুদের ঋণ বা সাবসিডির ব্যবস্থা করা উচিত।

শাহাদাত হোসেন: গবেষণার ফল কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর আধুনিক উপায় কী হতে পারে?

ড. এফ এইচ আনসারী: ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে খুব দ্রুত কৃষকের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

বর্তমানে বেসরকারি খাতের প্রায় এক লাখেরও বেশি সম্প্রসারণ কর্মী মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। তাদের প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।

সরকার শুরুতে এই বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতও নিজস্ব উদ্যোগে এগিয়ে আসবে।

শাহাদাত হোসেন: সারের ভর্তুকিতে সরকারের বিপুল ব্যয় হয়। এর বিকল্প কোনো পথ আছে কি?

ড. এফ এইচ আনসারী: অবশ্যই আছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি সার ব্যবহার করি। কৃষকদের সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা গেলে সারের ব্যবহার এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। তাহলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে সার আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও বাঁচবে।

তবে এজন্য প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং শক্তিশালী কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা।

শাহাদাত হোসেন: তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ত করার জন্য কী করা উচিত?

ড. এফ এইচ আনসারী: বর্তমান প্রজন্ম মাঠে কাজ করতে আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে কৃষক সমাজ ক্রমেই বয়স্ক হয়ে পড়ছে।

তরুণদের আকৃষ্ট করতে হলে কৃষিকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। তাদের হাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি তুলে দিতে হবে।

কম্বাইন হারভেস্টারের উদাহরণই ধরা যাক। আগে হাতে ধান কাটলে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ ধান নষ্ট হতো। এখন সেই ক্ষতি মাত্র ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

এ ধরনের প্রযুক্তি কৃষিকে লাভজনক ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

শাহাদাত হোসেন: ফসল সংগ্রহের পর যে বিপুল অপচয় হয়, তা কমানোর উপায় কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: বাংলাদেশে উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সংগ্রহ-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়।

এই ক্ষতি কমাতে দেশের প্রতিটি উপজেলায় কোল্ড স্টোরেজ বা আধুনিক গুদাম নির্মাণ করা প্রয়োজন। সরকার এগুলো নির্মাণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করতে পারে। এতে কৃষকরা সংরক্ষণের সুযোগ পাবেন এবং ভালো দাম পেলে পরে বিক্রি করতে পারবেন।

শাহাদাত হোসেন: স্ট্রিট ফুড ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত খাতে কী সম্ভাবনা দেখছেন?

ড. এফ এইচ আনসারী: আমাদের স্ট্রিট ফুড খাত স্থানীয় কৃষিপণ্যের বড় ভোক্তা। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় রয়েছে। সরকার যদি বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ, স্যানিটেশন সহায়তা এবং আধুনিক প্রদর্শন ব্যবস্থার সুযোগ দেয়, তাহলে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে। এর ফলে দেশীয় কৃষিপণ্যের ব্যবহার বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

শাহাদাত হোসেন: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সরকার কি কৃষি ভর্তুকি ধরে রাখতে পারবে?

ড. এফ এইচ আনসারী: কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতেই হবে। ভর্তুকি বন্ধ হলে উৎপাদন কমে যাবে, কৃষকের আগ্রহ নষ্ট হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সেচ ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আমরা যদি কৃষিতে সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে পারি, তাহলে ডিজেল আমদানি ও ডলারের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

শাহাদাত হোসেন: কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রয়োজন আছে কি?

ড. এফ এইচ আনসারী: বর্তমানে মূল সমস্যা শুল্ক নয়, বরং যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্প্রসারণ। জমি চাষ ও সেচে উল্লেখযোগ্য যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। কিন্তু ধান রোপণ, সবজি চাষ, ভুট্টা, গম এবং ডেইরি খাতে এখনও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার খুব সীমিত। আগামী কয়েক বছর এসব খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।

শাহাদাত হোসেন: জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বেসরকারি খাতকে গবেষণায় যুক্ত করার কার্যকর উপায় কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, গবেষণায় বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়।

গবেষণার ফল আসতে কয়েক বছর সময় লাগে বলে অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিতে চায় না। সরকার যদি স্বল্প সুদে অর্থায়ন করে, তাহলে বহু প্রতিষ্ঠান গবেষণায় বিনিয়োগ করবে।

আমি মনে করি, আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে গবেষণা সহায়তা দেওয়া গেলে কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

কৃষি বাঁচলে বাঁচবে খাদ্য নিরাপত্তা: ড. আনসারী

প্রকাশিত : ০৯:৫৮:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ খাদ্য চাহিদা এই খাত থেকেই পূরণ হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গবেষণায় সীমাবদ্ধতা, ফসলের অপচয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে কৃষি খাত।

এমন এক সময়ে নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। কৃষি খাতের উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—সেসব বিষয়ে দেশ সমাচারের বিশেষ সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন দেশের কৃষি খাতের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও এসিআই পিএলসি-এর গ্রুপ অ্যাডভাইজার ড. এফ এইচ আনসারী। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন দেশ সমাচারের সম্পাদক ও প্রকাশক শাহাদাত হোসেন।

নিচে সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

শাহাদাত হোসেন: আপনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের কৃষি খাতের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন। নতুন সরকারের আসন্ন বাজেট নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনার প্রত্যাশা কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: বাংলাদেশে আমরা মূলত দুটি কারণে কৃষি করি—প্রথমত কর্মসংস্থান এবং দ্বিতীয়ত খাদ্য সংস্থান। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ খাদ্য চাহিদা স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। সামান্য কিছু খাদ্যপণ্য বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়।

এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি এগ্রি ভ্যালু চেইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সরকার যদি বাজেটে এই ভ্যালু চেইনের প্রতিটি ধাপকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করে, তাহলে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত হবে, কর্মসংস্থান বজায় থাকবে এবং কৃষির বিদ্যমান সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

শাহাদাত হোসেন: বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তন।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কোথাও অতিবৃষ্টি হচ্ছে, আবার কোথাও তীব্র খরা ও তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি হাওড় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ধান পানিতে ডুবে গেছে।

এই বাস্তবতা আমরা পরিবর্তন করতে পারব না, কিন্তু এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আর সেই সক্ষমতার প্রথম শর্ত হলো কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

শাহাদাত হোসেন: গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: আমাদের দেশে একটি গবেষণার ফল কৃষকের হাতে পৌঁছাতে প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যায়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের গতি এর চেয়ে অনেক বেশি।

তাই গবেষণাকে দ্রুততর করতে হবে। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, বেসরকারি খাতকেও গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণা ইতোমধ্যে প্রস্তুত রয়েছে। সেগুলো দ্রুত দেশে এনে অভিযোজন করা সম্ভব। এজন্য অন্তত ১০০টি বেসরকারি কোম্পানিকে গবেষণায় উৎসাহিত করতে বাজেটে বিশেষ সহায়তা, স্বল্প সুদের ঋণ বা সাবসিডির ব্যবস্থা করা উচিত।

শাহাদাত হোসেন: গবেষণার ফল কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর আধুনিক উপায় কী হতে পারে?

ড. এফ এইচ আনসারী: ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে খুব দ্রুত কৃষকের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

বর্তমানে বেসরকারি খাতের প্রায় এক লাখেরও বেশি সম্প্রসারণ কর্মী মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। তাদের প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।

সরকার শুরুতে এই বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতও নিজস্ব উদ্যোগে এগিয়ে আসবে।

শাহাদাত হোসেন: সারের ভর্তুকিতে সরকারের বিপুল ব্যয় হয়। এর বিকল্প কোনো পথ আছে কি?

ড. এফ এইচ আনসারী: অবশ্যই আছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি সার ব্যবহার করি। কৃষকদের সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা গেলে সারের ব্যবহার এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। তাহলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে সার আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও বাঁচবে।

তবে এজন্য প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং শক্তিশালী কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা।

শাহাদাত হোসেন: তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ত করার জন্য কী করা উচিত?

ড. এফ এইচ আনসারী: বর্তমান প্রজন্ম মাঠে কাজ করতে আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে কৃষক সমাজ ক্রমেই বয়স্ক হয়ে পড়ছে।

তরুণদের আকৃষ্ট করতে হলে কৃষিকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। তাদের হাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি তুলে দিতে হবে।

কম্বাইন হারভেস্টারের উদাহরণই ধরা যাক। আগে হাতে ধান কাটলে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ ধান নষ্ট হতো। এখন সেই ক্ষতি মাত্র ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

এ ধরনের প্রযুক্তি কৃষিকে লাভজনক ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

শাহাদাত হোসেন: ফসল সংগ্রহের পর যে বিপুল অপচয় হয়, তা কমানোর উপায় কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: বাংলাদেশে উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সংগ্রহ-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়।

এই ক্ষতি কমাতে দেশের প্রতিটি উপজেলায় কোল্ড স্টোরেজ বা আধুনিক গুদাম নির্মাণ করা প্রয়োজন। সরকার এগুলো নির্মাণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করতে পারে। এতে কৃষকরা সংরক্ষণের সুযোগ পাবেন এবং ভালো দাম পেলে পরে বিক্রি করতে পারবেন।

শাহাদাত হোসেন: স্ট্রিট ফুড ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত খাতে কী সম্ভাবনা দেখছেন?

ড. এফ এইচ আনসারী: আমাদের স্ট্রিট ফুড খাত স্থানীয় কৃষিপণ্যের বড় ভোক্তা। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় রয়েছে। সরকার যদি বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ, স্যানিটেশন সহায়তা এবং আধুনিক প্রদর্শন ব্যবস্থার সুযোগ দেয়, তাহলে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হবে। এর ফলে দেশীয় কৃষিপণ্যের ব্যবহার বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

শাহাদাত হোসেন: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সরকার কি কৃষি ভর্তুকি ধরে রাখতে পারবে?

ড. এফ এইচ আনসারী: কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতেই হবে। ভর্তুকি বন্ধ হলে উৎপাদন কমে যাবে, কৃষকের আগ্রহ নষ্ট হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে সেচ ব্যবস্থায় সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আমরা যদি কৃষিতে সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীল হতে পারি, তাহলে ডিজেল আমদানি ও ডলারের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

শাহাদাত হোসেন: কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক কমানোর প্রয়োজন আছে কি?

ড. এফ এইচ আনসারী: বর্তমানে মূল সমস্যা শুল্ক নয়, বরং যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্প্রসারণ। জমি চাষ ও সেচে উল্লেখযোগ্য যান্ত্রিকীকরণ হয়েছে। কিন্তু ধান রোপণ, সবজি চাষ, ভুট্টা, গম এবং ডেইরি খাতে এখনও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার খুব সীমিত। আগামী কয়েক বছর এসব খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।

শাহাদাত হোসেন: জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বেসরকারি খাতকে গবেষণায় যুক্ত করার কার্যকর উপায় কী?

ড. এফ এইচ আনসারী: চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, গবেষণায় বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিলে দ্রুত ফল পাওয়া যায়।

গবেষণার ফল আসতে কয়েক বছর সময় লাগে বলে অনেক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিতে চায় না। সরকার যদি স্বল্প সুদে অর্থায়ন করে, তাহলে বহু প্রতিষ্ঠান গবেষণায় বিনিয়োগ করবে।

আমি মনে করি, আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে গবেষণা সহায়তা দেওয়া গেলে কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।