মো. আনোয়ারুল ইসলাম: “টেনেসির কমলারঙের ক্যাম্পাসে বাংলাদেশের লাল-সবুজ শুধু একটি পতাকা নয়, এটি শেকড়ের টান, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আপনজনদের উষ্ণতার প্রতীক। এক কাপ দুধ-চা, এক টুকরো সিঙাড়া আর একদল তরুণের আন্তরিকতায় বিদেশের মাটিতেও খুঁজে পাওয়া যায় এক টুকরো বাংলাদেশ।”
বাংলাদেশ থেকে দীর্ঘ বিমান যাত্রা শেষে এক অপরিচিত বিমানবন্দরে গভীর রাতে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি, নক্সভিলে (ইউটিকে) আমার ফুলব্রাইট-যাত্রার সূচনা। ১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১৫ মিনিটে নক্সভিলের দক্ষিণে আলকোয়া শহরে অবস্থিত ম্যাকগি টাইসন বিমানবন্দরে অবতরণ করে আমার ফ্লাইট। ২০২৬–২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ফুলব্রাইট ভিজিটিং ফেলো হিসেবে গবেষণা ও একাডেমিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে এসেছি যুক্তরাষ্ট্রে এবং সঙ্গে ছিল উদ্দীপনা, কৌতূহল এবং গবেষণার কিছু পরিকল্পনা। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, জীবনের এই পর্যায়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করার অর্থ শুধু গবেষণা বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে নতুন এক জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতাও। এই অভিজ্ঞতার কিছুটা ছিল মজার, কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। অপরিচিত স্থাপনা ও পরিবেশের সাথে পরিচিত হওয়া থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হচ্ছিল। চারপাশে অসংখ্য মানুষ, অথচ কথা বলার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। প্রথম দিকের দিনগুলোতেই বুঝতে শুরু করলাম, একটি নতুন দেশে থিতু হওয়া মানে শুধু নিজের অফিস খুঁজে নেওয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ করা কিংবা গবেষণা শুরু করা নয় বরং এই নতুন পরিবেশেও আপনজনদের মধ্যে আছি, এই অনুভূতি তৈরী করা। আর সেই আপন হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু হয়েছিল ইউটিকে-তে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগঠন (বিএসএ) সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে।
অপরিচিত পরিবেশে পরিচিত মুখের সন্ধান: ইউনিভার্সিটি অব টেনেসিতে কমলা রঙ এক ধরণের গর্বের রঙ এখানে সবার কাছে। শিক্ষার্থী, গবেষক এবং ক্যাম্পাসে হাঁটতে হাঁটতে চারদিকে চোখে পড়ে এই রঙের আধিক্য। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আসা একজন নতুন গবেষক হিসেবে আমার মনেও চলছিল পরিচিত কিছুর খোঁজ। কিছু চেনা মুখ, আন্তরিক কথাবার্তা, পরিচিত খাবার আর এমন কিছু যা আমাকে বাড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একদিন দুপুরের খাবারের আড্ডায় পরিচিত হওয়ার পর মনে হলো, নক্সভিলের বুকে যেন বাংলাদেশের ছোট্ট একটি অংশ খুঁজে পেলাম। দেশের বাইরে থাকলেও মানুষ নিজের সঙ্গে কত কিছু বহন করে নিয়ে যায় তা নতুন করে উপলব্ধি করলাম। ভাষা, খাবার, সংস্কৃতি, উৎসব আর সম্মিলিত স্মৃতিগুলোও আমাদের সঙ্গে দেশান্তরি হয় কিন্তু হারায়না।
‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ বাঙালির কাছে উৎসব কেবল ক্যালেন্ডারে চিহ্নিত কোনো দিন নয়, এটি একত্র হওয়ার, খাবার ভাগাভাগি করার, পুরোনো বন্ধুত্ব নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ্য মাত্র। শিগগিরই বুঝতে পারলাম, ইউটিকে-র বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই চিরচেনা উৎসবমুখরতা প্রাণবন্তভাবে বেঁচে আছে। তাঁদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁরা শুধু নিজেদের ঐতিহ্যই ধরে রাখছে না, বরং ভিন্ন পটভূমি থেকে আসা মানুষের কাছেও বাংলাদেশের সংস্কৃতি তুলে ধরছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর আগেই আগষ্টে অনুষ্ঠিত নক্স এশিয়ান ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা খাবার, মেহেদিশিল্প, সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে নিজেদের দেশকে তুলে ধরেছিল। সেখানে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাঁদের অংশগ্রহণের কথা শুনে এই কমিউনিটির অন্যান্য কার্যক্রম সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই সুযোগ এল ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এ। সেদিন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জন সি. হজেস লাইব্রেরিতে আয়োজন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল কফিহাউস ২০২৬: বাংলাদেশ’।
ইউটিকে-তে প্রথম কয়েক দিন সুপারভাইজারের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নেটআইডি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে সময় নিয়েছিল। এই সময়ে নিজেই ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছিলাম। জন সি. হজেস লাইব্রেরি অল্প সময়ের মধ্যেই আমার প্রিয় জায়গাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। গ্রন্থাগারের কর্মীরা ইন্টারনেট সংযোগ ও ই-রিসোর্স ব্যবহারের জন্য আমাকে আমাকে সহযোগিতা করেছিল। গ্রন্থাগারে নিরিবিলি ল্যাপটপে কাজ করা এবং গ্রন্থাগারের কফিশপ ও স্ন্যাক্স কর্নার ক্ষুধা মেটাতে বেশ কাজে এসেছিল। অপরিচিত এই পরিবেশে এই গ্রন্থাগার হয়ে উঠেছিল আমার একটি কমফোর্ট জোন। কাজেই গ্রন্থাগার ভবনেই বাংলাদেশকে ঘিরে ইন্টারন্যাশনাল কফিহাউসের আয়োজন হবে জানতে পেরে সেখানে যাওয়ার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। আমার রুমমেট আন্দালিবের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বললাম এবং ও রাজী হলো যাবার জন্য। আন্দালিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে পিএইচডি করছে। বুধবার, ১৪ অক্টোবর, সকাল প্রায় ১১টার দিকে আমরা অনুষ্ঠানস্থলে যাই। ঢোকার সময় শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র পরীক্ষা করছিল এবং সবাই এক এক করে ভেতরে প্রবেশ করছিল। ভেতরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করছিল, আর বিদেশী শিক্ষার্থীরা সেসব খাবারের স্বাদ নিচ্ছিল। একদল তরুণ বাংলাদেশি তাঁদের দেশের পরিচয় তুলে ধরছে বিদেশী শিক্ষার্থীদের সামনে। আর সেই পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে খাবারের মতো সহজ, পরিচিত ও আন্তরিক একটি অনুষঙ্গ – অসাধারণ ।
এক টুকরো সিঙাড়ায় ফিরে যাওয়া যায় ঢাকায়: শিক্ষার্থীদের আয়োজনে ছিল বাংলাদেশের দুধ-চা, সিঙাড়া, ঝালমুড়িসহ আরও অন্যান্য খাবার। বিদেশী শিক্ষার্থীদের এত আগ্রহ নিয়ে আমাদের দেশের খাবারের স্বাদ নিতে এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে অপেক্ষা করতে দেখে আমার আনন্দই হচ্ছিল। দুধ-চায়ের চাহিদা ছিল সেই রকম, তবে সিঙাড়া ও ঝালমুড়িও ছিল পছন্দের তালিকায়। শিক্ষার্থীদেরকে আমাদের খাবার উপভোগ করতে দেখে আমার ঢাকার সিঙাড়ার কথা মনে পড়ে। বাংলাদেশ ছেড়ে আসার প্রায় দেড় মাস পর সস দিয়ে মচমচে একটি সিঙাড়ায় কামড় দিতেই মনে হলো, ফিরে গেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে। চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল বিভাগের শিক্ষক ও সহকর্মীদের সাথে আমাদের চিড়াচড়িত সিঙাড়া ও চা চক্রের কথা। এরপর নিলাম নিলাম শসা, গাজর, ধনেপাতা ও কাঁচা মরিচের ছোট্ট একটি সালাদ। কয়েক সপ্তাহ ধরে অপরিচিত খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর এই স্বাদগুলো যেন ফিরিয়ে আনল বাড়ির চেনা অনুভূতি। একটি সাধারণ খাবারই হয়ে উঠেছিল ভিন্ন দেশের মানুষের পরিচিত হওয়া, গল্প বিনিময় এবং পরস্পরের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার মাধ্যম।
কমলারঙের মাঝে সবুজ ও লাল: খাবার ছিল এই অনুষ্ঠানের একটি অংশ মাত্র। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী আলোকচিত্র, বই ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে সাজানো একটি ছোট প্রদর্শনীও দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইউটির কমলারঙের পটভূমিতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হয়ে উঠেছিল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। একই ক্যাম্পাসে পাশাপাশি অবস্থান করা ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় ও সংস্কৃতির এক সুন্দর দৃশ্যমান প্রতীক যেন। খাবার পরিবেশনের টেবিলগুলোর পাশে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে কথা বলছিলেন এবং নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। কেউ ব্যস্ত ছিল খাবার পরিবেশন করতে, কেউ খাবারের পরিচয় বুঝিয়ে দিতে, আবার কেউ বন্ধুবান্ধবকে সহযোগিতা করে পুরো আয়োজনটি সুন্দরভাবে পরিচালনায় ভূমিকা রাখছিল। আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল শিক্ষার্থীদের নিজেদের তৈরি করা পরিবেশটি। তাঁদের হাসি, প্রাণবন্ত কথাবার্তা, খুনসুটি ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ মনে করিয়ে দিচ্ছিল দেশের বাড়িতে পরিচিত মানুষের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা। বিদেশীদের সামনে বাংলাদেশকে তুলে ধরার কাজে ব্যস্ত থেকেও তাঁরা আমাদের কমিউনিটির স্বাভাবিক আন্তরিকতা ও খুনসটিতেও মেতে উঠেছিল। কমলারঙের আবহে বাংলাদেশের সবুজ ও লালও খুঁজে পেয়েছে নিজস্ব একটি জায়গা। রং, সংস্কৃতি ও স্মৃতির এই মেলবন্ধনে আমি আবিষ্কার করেছি মুহূর্তের জন্য নক্সভিল ও ঢাকার মধ্যকার দূরত্ব যেন অনেকটাই কমে এসেছিল।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি, নক্সভিলে ফুলব্রাইট ভিজিটিং ফেলো হিসেবে কর্মরত।
অনলাইন ডেস্ক 























