০৩:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
বিএসইসির পুনর্গঠিত বোর্ডও ব্যর্থ: নীতিনির্ধারক শূন্যতায় মহাবিপাকে ফারইস্ট ফাইন্যান্স

পরিচালকদের পদত্যাগে গভীর সংকটে ফারইস্ট ফাইন্যান্স

পরিচালনা পর্ষদ থেকে একের পর এক সদস্যের পদত্যাগের ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে চারজন পরিচালক সরে দাঁড়ানোয় প্রতিষ্ঠানটিতে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে কোম্পানির নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক চাকা সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগে জরুরি সহায়তা ও দিকনির্দেশনা চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে ফারইস্ট ফাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকেও (বিএসইসি)। চিঠিতে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের অবস্থাকে “অত্যন্ত সংকটাপন্ন” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিক লোকসানে থাকা ফারইস্ট ফাইন্যান্স ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারের মূল বোর্ড থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর হয়। পরবর্তীতে সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০২১ সালের ২৯ মার্চ তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করে বিএসইসি। সেই বোর্ডে সাবেক আমলা, দক্ষ পেশাজীবী ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলা। কিন্তু পুনর্গঠিত সেই বোর্ডও চার বছর পূর্ণ করার আগেই কার্যত ভেঙে পড়েছে।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিএসইসি চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আশরাফুল মকবুল পদত্যাগ করলে সংকটের শুরু হয়। এর মাত্র একদিন পর দায়িত্ব ছাড়েন স্বতন্ত্র পরিচালক শেখ নাজমুল হক সৈকত। সংকটের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় চলতি বছরের ৪ মে, যখন স্বতন্ত্র পরিচালক এহসানুল আজিজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন একযোগে পদত্যাগ করেন। ৫ মে তাদের পদত্যাগপত্র কোম্পানির হাতে পৌঁছালে দেখা যায়, বর্তমানে বোর্ডে মাত্র একজন পরিচালক অবশিষ্ট রয়েছেন।

কোম্পানির সংঘবিধি (Articles of Association) অনুযায়ী, যেকোনো বোর্ড সভা আয়োজনের জন্য ন্যূনতম পাঁচজন পরিচালকের উপস্থিতি প্রয়োজন। বর্তমানে মাত্র একজন পরিচালক থাকায় কোনো আইনি সভা করা সম্ভব নয়। এর ফলে ঋণ পুনর্গঠন, আমানতকারীদের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন এবং নিরীক্ষা কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পুরোপুরি থমকে গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার মতো কোনো কর্তৃপক্ষও নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে কোম্পানিটি জানিয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্ষদ পুনর্গঠন বা প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ না করা হলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের এই দশার পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত লোকসান, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা সংকট দায়ী। বিএসইসি কর্তৃক গঠিত বোর্ডও কেন সফল হতে পারল না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ৪৭.৮৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ করা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ৬৫ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৬ কোটি ৫০ লাখ ২২ হাজার ৭৯৩টি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, শেয়ারের বড় অংশই রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩৯.৭৫ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১২.৪১ শতাংশ শেয়ার থাকলেও বর্তমান প্রশাসনিক শূন্যতা পুরো মূলধনকেই ঝুঁকিতে ফেলেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বিএসইসির পুনর্গঠিত বোর্ডও ব্যর্থ: নীতিনির্ধারক শূন্যতায় মহাবিপাকে ফারইস্ট ফাইন্যান্স

পরিচালকদের পদত্যাগে গভীর সংকটে ফারইস্ট ফাইন্যান্স

প্রকাশিত : ০৬:২৭:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬

পরিচালনা পর্ষদ থেকে একের পর এক সদস্যের পদত্যাগের ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে চারজন পরিচালক সরে দাঁড়ানোয় প্রতিষ্ঠানটিতে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে কোম্পানির নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কোম্পানির প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক চাকা সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগে জরুরি সহায়তা ও দিকনির্দেশনা চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে ফারইস্ট ফাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকেও (বিএসইসি)। চিঠিতে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের অবস্থাকে “অত্যন্ত সংকটাপন্ন” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে ধারাবাহিক লোকসানে থাকা ফারইস্ট ফাইন্যান্স ২০১৮ সালে শেয়ারবাজারের মূল বোর্ড থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর হয়। পরবর্তীতে সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০২১ সালের ২৯ মার্চ তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করে বিএসইসি। সেই বোর্ডে সাবেক আমলা, দক্ষ পেশাজীবী ও স্বতন্ত্র পরিচালকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলা। কিন্তু পুনর্গঠিত সেই বোর্ডও চার বছর পূর্ণ করার আগেই কার্যত ভেঙে পড়েছে।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিএসইসি চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আশরাফুল মকবুল পদত্যাগ করলে সংকটের শুরু হয়। এর মাত্র একদিন পর দায়িত্ব ছাড়েন স্বতন্ত্র পরিচালক শেখ নাজমুল হক সৈকত। সংকটের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় চলতি বছরের ৪ মে, যখন স্বতন্ত্র পরিচালক এহসানুল আজিজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মোশাররফ হোসেন একযোগে পদত্যাগ করেন। ৫ মে তাদের পদত্যাগপত্র কোম্পানির হাতে পৌঁছালে দেখা যায়, বর্তমানে বোর্ডে মাত্র একজন পরিচালক অবশিষ্ট রয়েছেন।

কোম্পানির সংঘবিধি (Articles of Association) অনুযায়ী, যেকোনো বোর্ড সভা আয়োজনের জন্য ন্যূনতম পাঁচজন পরিচালকের উপস্থিতি প্রয়োজন। বর্তমানে মাত্র একজন পরিচালক থাকায় কোনো আইনি সভা করা সম্ভব নয়। এর ফলে ঋণ পুনর্গঠন, আমানতকারীদের অর্থ ব্যবস্থাপনা, বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন এবং নিরীক্ষা কার্যক্রমের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পুরোপুরি থমকে গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার মতো কোনো কর্তৃপক্ষও নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো চিঠিতে কোম্পানিটি জানিয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্ষদ পুনর্গঠন বা প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ না করা হলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের এই দশার পেছনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত লোকসান, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা সংকট দায়ী। বিএসইসি কর্তৃক গঠিত বোর্ডও কেন সফল হতে পারল না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ৪৭.৮৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ করা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন বর্তমানে ৬৫ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। মোট শেয়ার সংখ্যা ৬ কোটি ৫০ লাখ ২২ হাজার ৭৯৩টি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, শেয়ারের বড় অংশই রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩৯.৭৫ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১২.৪১ শতাংশ শেয়ার থাকলেও বর্তমান প্রশাসনিক শূন্যতা পুরো মূলধনকেই ঝুঁকিতে ফেলেছে।