নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি’র আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিল লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়াও কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিদায়ী বছরের (৩০ জুন ২০২৫) আর্থিক প্রতিবেদনের ফিন্যান্সিয়াল পজিশনের সাত নাম্বার নোটে কোম্পানিটি আনরিয়েলাইজড লোকসান উল্লেখ করেছে ১৪ কোটি ৮২ লাখ ৭৭ হাজার ৭১ টাকা। আবার ফিন্যান্সিয়াল পজিশনের শেয়ারহোল্ডার ইক্যুটিতে আনরিয়েলাইজড লোকসান হিসেবে উল্লেখ করেছে ১৩ কোটি সাত লাখ ১৫ হাজার ৬১১ টাকা। এরপর একই বিষয় অর্থাৎ আনরিয়েলাইজড লোকসান আর্থিক প্রতিবেদনের প্রফিট অ্যান্ড লসে কোম্পানিটি উল্লেখ করেছে দুই কোটি ৫১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৬৫ টাকা।


এনএলআই সিকিউরিটিজের সিইও মো. শাহেদ ইমরান দেশ সমাচারকে বলেন, আনরিয়েলাইজড লোকসান কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় কেন ভিন্ন ভিন্নভাবে উল্লেখ করেছে তা আমিও বুঝতে পারিনি। আমিও বিষয়টি দেখেছি। কোম্পানির কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত।
হযরত আমানত শাহ সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ইনচার্জ মো. জামাল হোসেন দেশ সমাচারকে বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন আনরিয়েলাইজড লোকসান দেখানোর সুযোগ নেই। সাধারণত বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার জন্য এমনটি করতে পারে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস।
এদিকে এ ব্যাপারে কোম্পানি সচিব লরেন্স শ্যামল মল্লিক লিখিত বক্তব্যে জানান, সব প্রশ্নের উত্তর বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) উল্লেখ করা হয়েছে। তাই আমি কোনো বর্ণনা করতে পারবো না।
কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, বিদায়ী বছরে কোম্পানির রিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে এক কোটি ৪ লাখ ৫৭ হাজার ১৪৫ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৬৩ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির রিয়েলাইজড লোকসান বেড়েছে ৯৫ লাখ ৭৭ হাজার ৩৮২ টাকা বা এক হাজার ৮৯ শতাংশ।

এ ব্যাপারে শ্যামল মল্লিক লিখিত বক্তব্যে এই প্রতিবেদককে জানান, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে আমাদের কোনো লোকসান হয়নি; বরং আমরা ৫৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেছি।
রিয়েলাইজড লোকসানকে কোম্পানির মুনাফার সাথে কেন তুলনা করলেন প্রশ্ন করা হলে, তিনি এই প্রতেবেদককে বলেন, আমি রিয়েলাইজড লোকসান বুঝি না। আপনি বুঝিয়ে বলেন।
এদিকে, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।
নিরীক্ষক জানিয়েছে, গত ১২ মে ২০২৪ তারিখে ভ্যাট কর্তৃপক্ষ নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের কাছে ১৩৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দাবি করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। পরবর্তীতে গত ২৫ মে ২০২৪ তারিখে কোম্পানিটি ভ্যাট কর্তৃপক্ষের দাবি খণ্ডন করে এবং নিরীক্ষা চলাকালীন চিহ্নিত বিষয়গুলোর বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। এছাড়াও ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে কোম্পানিটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করে এবং দাবিকৃত প্রকৃত অর্থের পরিমাণ পুনরায় খতিয়ে দেখার অনুরোধ করে। গত ১১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে এ বিষয়ে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এ ব্যাপারে লরেন্স শ্যামল মল্লিক জানান, বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। তাই বিচারাধীন কোনো বিষয়ে আমাদের কিছু বলা উচিত নয়। কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, বিদায়ী বছরের কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি পেলেও কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সেবিলিটি (সিএসআর) খাতে বরাদ্দ কমিয়েছে ৭ লাখ ২৯ হাজার ৯৫০ টাকা।

কোম্পানিগুলো সাধারণত সমাজের পিছিয়ে পড়া, সুবিধা বঞ্চিত ব্যক্তিদের জন্য সিএসআর খাতে বরাদ্দ রাখে। কোনো কোম্পানির মুনাফা বাড়লে স্বাভাবিকভাবে সিএসআর খাতের বরাদ্দও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে কিছুদিন আগে কোম্পানির ভেতরে মালিকানার দ্বন্দ্ব ছিলো। এরই জেরে নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের ম্যানেজমেন্ট গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে লরেন্স শ্যামল মল্লিককে বাদ দিয়ে ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি সচিব হিসেবে মো. আমিনুল হক ভূইয়াকে নিয়োগ দেয়। তবে গত ০১ জুন ২০২৬ তারিখে ম্যানেজমেন্ট আবারও আগের কোম্পানি সচিব লরেন্স শ্যামল মল্লিককে নিয়োগ দেয়।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের নেতা মো. সাজ্জাদুল হক দেশ সমাচারকে বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস যদি ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে থাকে তবে, অবশ্যই জাতীয় রাজস্ব বোডের (এনবিআর) এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম দেশ সমাচারকে বলেন, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিলের বিষয়টি কমিশন খতিয়ে দেখবে।
উল্লেখ্য, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালসের পরিশোধিত মূলধন ১০৭ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৩৭ দশমিক ৬২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ১১ দশমিক ১১ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৩১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোম্পানির শেয়ার দর ছিল ৬১ দশমিক ১০ টাকা।
অনলাইন ডেস্ক 



















