০৩:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

ইরান-ইজরাইল জুন যুদ্ধের দামামা, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য, সমীকরণ

১৩ ই জুন ২০২৫ মধ্যরাতে ইরানের অন্তত আশিটি (৮০) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আতর্কিত ভয়াবহ আঘাত হানে ইসরাইল। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে দখলদার এবং অবৈধ ভূ-খণ্ড (রাষ্ট্র নয়) হিসেবেই পরিচিত ইসরাইলের আকস্মিক এই আক্রমণকে বিশ্লেষকরা একটি গুপ্ত আক্রমণ হিসেবেই অভিহিত করছেন। কোন রকম উস্কানী কিংবা পূর্ব ঘোষণা ছাড়া শুক্রবার রাতের আধারে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের এই আক্রমণ মূলতঃ দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা মাফিক বিভিন্ন বাসা-বাড়ি এবং স্থাপনার ছাদে সন্তর্পনে লুকিয়ে রাখা মাইক্রো ড্রোনের (Micro Drone) সাথে শক্তিশালী বিস্ফোরক (High Explosives) সংযুক্ত রেখে রিমোট পদ্ধতির মাধ্যমে “অপারেশন রাইসিং লায়ন (Operation Rising Lion)” কোড নামে এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়।

মোসাদ এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র”য়ের সরাসরি পরিকল্পনা ও সহায়তায় কিছু বিশ্বাসঘাতক ইরানী নাগরিকের মাধ্যমে এই রিমোট চালিত মাইক্রো ড্রোন গুলো দীর্ঘ সময় ধরে নিখুঁত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুলোতে রাখা হয়। আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু গুলোর মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক সদর দপ্তর সমূহ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বর্গের (বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক, সামরিক) আবাসিক ভবন সমূহ।

‘অপারেশন রাইজিং লায়নের’ বিপরীতে ইরান নিজেদেরকে স্বল্প সময়ের মধ্যে গুছিয়ে নিয়ে প্রতিরোধ, প্রতিরক্ষা এবং প্রতিশোধের অঙ্গীকার নিয়ে শুরু করে “অপারেশন ট্রু প্রমিস থ্রি (Operation True Promise-3)” নামের যুদ্ধাভিযান। বিগত তিন দিনে ইরান তার চিরশত্রু ইসরাইলকে ব্যাপক ভাবে বিপর্যস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। কল্পনার বাহিরে ক্ষতিসাধন করেছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর, বিমান ঘাঁটি, পাওয়ার জেনারেশন প্লান্ট,সামরিক গবেষণাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সমূহ। ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোসহ প্রায় ২২টি শহর এখন ধ্বংস স্তুপে পরিনত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে ইসরাইলের অহংকার ভরা আত্মবিশ্বাস।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও সফলতাঃ যুদ্ধের শুরুটাতে মোসাদের গোয়েন্দা সফলতা একশতভাগ, এতে কোন সন্দেহ নেই। যার অর্থ দাঁড়ায় ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা(MOIS) সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এই ভয়াবহ আক্রমণের পূর্বের কোন তথ্য জানতে ও জানাতে। ইরানের এই গোয়েন্দা ব্যর্থতা নতুন কোন বিষয় নয়। বিগত বছরগুলোতেও মোসাদ ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে সফল অপারেশনের মাধ্যমে হত্যা করেছে।তারপরেও যথাযথ পারদর্শিতা এবং পেশাদার গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনায় ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা চরমভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। যদিও ইতোমধ্যে ইরান মোসাদের কয়েকজন সদস্য আটক, ইরানের অভ্যন্তরে ইসরাইলের ড্রোন কারখানা সনাক্তকরণ এবং কিছু পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে। ইরানের অভ্যন্তরে মোসাদ এখনো পর্যন্ত শক্তিশালী অপারেশন পরিচালনায় সক্ষম বলেই বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। হয়তো সুযোগের অপেক্ষায় আছে। সময় হলেই সেটা পরিষ্কার বোঝা যাবে।

সামরিক শক্তি এবং পেশাদারিত্বঃ পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং ধংসযজ্ঞের “খেলা”র নাম যুদ্ধ। এখানে বাঘ-সিংহের মত শেয়ানে শেয়ানে লড়াই হলে তো কথাই নেই। বুদ্ধিমত্তা বা যুদ্ধ কৌশল (Tactics) এর সাথে সামরিক শক্তি, সরঞ্জাম এবং সময়ের যথাযথ ব্যবহারের পারদর্শিতা ও পেশাদারিত্বের উপরে ভর করে এই খেলায় তীব্রতা যত বাড়ে সমানুপাতিক ভাবে বাড়তে থাকে প্রাণ এবং সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ। ১৩ ই জুন যুদ্ধ শুরুর পূর্বে পেশাদারিত্ব বিশেষ করে গোয়েন্দা ক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রমাণ রেখেছে ইসরাইল। অপরদিকে যুদ্ধ শুরুর পর হতে যুদ্ধ লিলার পেশাদারীত্বের পাল্লার ভার এ পর্যন্ত (১৫ জুন) নিঃসন্দেহে তেহরানের দিকেই সুস্পষ্ট।

উল্লেখযোগ্য যে ২০২৫ সালের ‘গ্লোবাল মিলিটারি স্ট্রেন্থ ইনডেক্স (Global Military Strength Index)’ অনুযায়ী ইরানের অবস্থান ১৬ তম, পক্ষান্তরে ইসরাইলের অবস্থান ১৫ তম। অন্যদিকে ‘গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স(Global Fire Power Index)’ অনুযায়ী ইরানের অবস্থান ১৫ তম(০.৩০৪৮) এবং ইসরাইলের অবস্থান ১৬ তম(০.২৬৬১)। এসব পরিমাপকের মূল্যায়ন নির্ধারণী সময় চলে এসেছে, বাস্তবতার নিরিখে এ সকল ইনডেক্সের গ্রহণ যোগ্যতার প্রমাণের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিবে। এটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, সকল ইনডেক্স এর মধ্যে কোন মাত্রার সাইওয়ারফেয়ার (PSYOP) সংমিশ্রণ রয়েছে। বর্তমানের ফিফথ জেনারেশন যুদ্ধের মাঠের বহুমাত্রিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সময় এবং সামর্থের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রমাণ হবে পেশাদারিত্ব ও পারদর্শিতার।

ইরান ইসরাইলের বিগত তিন দিনের (১৩,১৪ ও ১৫ জুন) যুদ্ধের মাঠের পর্যবেক্ষণ ও অবস্থাগত বিষয়গুলো সারা পৃথিবীর সকল সামরিক বিশ্লেষকদের কঠোর নজরদারির অধীনে রয়েছে। ঘন্টা কিংবা দিন হিসেবে তারা হয়তো ফলাফলের একটা হিসেব নিকেশ ও করে যাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে ইসরাইলের কঠোর নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া কিংবা পশ্চিমাদের তথাকথিত ওপেন মিডিয়া-এ সকলই সকল হিসেবের বাইরে থাকবে। যুগ যুগ ধরে স্নায়ু যুদ্ধে অবতীর্ণ এই দুই শক্তির শক্তিময়তার খেলা বিশ্ববাসী যেমন দেখছে তেমনি ইরান ও ইসরাইল নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে যার যার হিসেব ঠিকই বুঝিয়ে দিতে হবে।

কোল্ডওয়ার(Cold War) যখন আগুনের বিভীষিকায় প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে, তখন সেনাবাহিনীর সাথে সাথে যার যার জনগণ সেই ক্ষতির বাইরে নয়। উভয় দেশেরই সামরিক ও বেসামরিক জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ ইসরাইলকে সাময়িক সময়ের জন্য কিছু আত্মতৃপ্তি দিলেও বাস্তবিক পক্ষে সেটা এখন ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বিপর্যস্ত হয়েছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গাজা শহরের ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ইসরাইলের তেলআবিব, হাইফা, রেহভত ও হারজলিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে। ইসরাইলের শক্তির ব্যাপক প্রচার এবং পেশাদারিত্বের লেফাফাদুরস্ত কথাগুলো এখন সকলের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ এবং অসার। ইসরাইল বরাবর নিরস্ত্র ফিলিস্তিনের উপরে যে অসামঞ্জস্য যুদ্ধে(Asymmetric Warfare) বিজয় এনে নিজেদেরকে বিশ্বশক্তিমান হিসেবে জাহির করেছে তা এখন ভূলণ্ঠিত।

দখলদার ইসরাইল উন্নত বিশ্বের নিকট হতে সরাসরি আর্থিক ও সামরিক সরঞ্জামাদির সরাসরি সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে প্রযুক্তিগতভাবে এবং সামরিক শক্তিতে যে উৎকর্ষতায় উন্নীত ও সুসজ্জিত হয়েছিল সেটা তাদের অপেশাদারিত্বের ফলে নিমিষেই হারিয়ে গেছে। তাদের পেশাদারিত্ব নিষ্ফল প্রমাণ হয়েছে আয়রন ডোম এবং এফ-৩৫ পঞ্চম প্রজন্মের স্টিল্থ টেকনোলজির যুদ্ধ বিমান পরিচালনায় ব্যর্থতার দায় সামনে রেখে। সামরিক শক্তি শূন্য ফিলিস্তিনের সাথে যুদ্ধ আর ইরানকে মোকাবেলা এক নয়, এটা হয়তো দখলদার ইসরাইলি বাহিনী এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

আয়রন ডোম (Iron Dome) এবং এফ-৩৫(F-35) যুদ্ধবিমানঃ ব্যাপকভাবে প্রচারিত ইসরাইলের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’র দুর্ভেদ্য আত্মবিশ্বাসের নাম “আয়রন ডোম”কে কার্যত অকার্যকর প্রমাণ করেছে ইরান। ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলের আকাশ সীমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আত্মবিশ্বাসকে। যা ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তির সাথে কৌশলগত বিন্যাসের চৌকস পেশাদারিত্বের প্রমাণই প্রচার করছে শত্রুদেশ সহ বিশ্ব মিডিয়া জুড়ে। ধারণা করা হয় ইসরাইলের আয়রন ডোম হয়তোবা স্বল্পমাত্রার মিজাইল কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য প্রযোজ্য। যেখানে ইরান ব্যবহার করছে ব্যালিস্টিক মিজাইল, হাইপারসনিক মিজাইল এবং ক্রুজ মিসাইল। যেগুলোর জন্য আয়রন ডোম কার্যকরী প্রতিরক্ষা দিতে সক্ষম নয়। অথবা ইরানের সামরিক বাহিনী এমন কোন টেকনোলজিতে পৌঁছেছে যা কিনা আয়রন ডোমকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।

F-35 যুদ্ধবিমান, পঞ্চম প্রজন্মের ( Fifth Generation) সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এই স্টিল্থ ফাইটার বিমানের অধিকারী ইসরাইল। যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র এবং সামান্য কটি উন্নত রাষ্ট্রের কুক্ষিগত রয়েছে, বাকিদের কাছে এটা স্বপ্নেরও অধিক। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘লকহীড ও মার্টিন’ নামের অত্যন্ত স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই এফ-৩৫ বিমান। স্টিল্থ প্রযুক্তিতে তৈরি এই বিমান যে কোন রাডার ব্যবস্থার কাছে অদৃশ্যই থেকে যায়, এমনটাই বলা হয়েছিল এ পর্যন্ত। কিন্তু ইরান দাবি করেছে তারা ইসরাইলের তিনটি F-35 বিমান ভূপাতিত করেছে। দাবিটি উড়িয়ে দেবার মত নয়। কেননা তারপর হতে এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ইসরাইল আর কোন এফ-৩৫ বিমান ব্যবহার করেনি। এখানেও একদিকে যেমন ইরানি বাহিনীর পেশাদারিত্বের উৎকর্ষতার প্রমাণ মিলেছে। অপর দিকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এফ-৩৫ বিমানের তথাকথিত গুণগত মান ও রাডার ফাঁকি দেবার পদ্ধতি নিয়ে। এই বিমানকে বলা হয়েছিল যুদ্ধের গেইম চেঞ্জার, অর্থাৎ যার কাছে এটা থাকবে সেই দেশ যুদ্ধের গেইম চেঞ্জ করতে সক্ষম হবে। প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো করে দিয়েছে ইরানি বাহিনী। বিমানগুলো ভূপাতিত করে প্রকৃতপক্ষেই গেইম চেঞ্জ করে ফেলেছে। গেইম এখন পর্যন্ত ইরান সেনাবাহিনীরই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মেরুকরণ বা (Polarisation) পোলারাইজেশনঃ ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ভাঙ্গনের পরে রাষ্ট্রগুলো সামরিক ক্ষমতার মেরুকরণের ক্ষেত্রে সামান্য কিছুদিন আমেরিকার অধীনে পৃথিবী একক ক্ষমতার আয়ত্তে বা ইউনিপোলার(Unipolar) থাকলেও বর্তমান পৃথিবী রাষ্ট্রগুলোর বলয়ে বিভক্ত হয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power) বজায় রাখছে। বর্তমানের পৃথিবী রাষ্ট্রসমূহের সামরিক ক্ষমতার মেরুকরণে দ্বিমাত্রিক(Bipolar) কিংবা বহুমাত্রিক (Multipolar) মেরু করণে চলছে। ইরান ইসরাইল যুদ্ধ পৃথিবীকে আবারো নতুন করে পরিষ্কার মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাবে। গত তিন দিনে বিষয়টা অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে যা অদূর ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরাইলের পক্ষে আছে খোদ আমেরিকা। সাথে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মুসলিম দেশ। অপর দিকে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তান সহ মুসলিম বিশ্বের প্রায় সকল দেশ। বরাবরের মতো কিছু দেশ স্বভাবতই পক্ষপাতবিহীন থাকার বৃথা চেষ্টা করবে। নতুন কোন ভিন্ন মাত্রার সামরিক বলয়ের সম্ভাবনাকে কোন ভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। একটি বিষয় না বললেই নয় যে, ভারতের পেহেলগামে গত ২২ এপ্রিল সন্ত্রাসী আক্রমণের সূত্র ধরে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ইরান সম্পূর্ণ নীরব ছিল। কিন্তু ইরানের ভেতরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মোসাদের সাথে সমন্বয় পূর্বক ইরানের উপরে রচনা করা এই আক্রমণ ভারত, পাকিস্তান এবং ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের মেরুকরণকে নতুন মোড় নিতে উদ্বুদ্ধ করবে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাঃ পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হলেই মানুষের মনে স্বভাবতই উঁকি দেয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের উস্কানি ধরনের আগমনী বার্তা। সেখানে যদি সুপার পাওয়ারদের অংশগ্রহণ থাকে তাহলে বিষয়টি ভাববার বাইরে রাখার তেমন সুযোগ থাকে না। ইরান-ইজরাইল যুদ্ধে সুপার পাওয়ার সমূহ- বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্স যেখানে মেরুকরণ করছে সেখানে বিশ্ব নাগরিকগণ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের গন্ধ খুঁজবেন এটাই স্বাভাবিক।
তাই বলে কি বিষয়টা এতই সহজ? না, একদমই না। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমন কোন মামুলি খেলা হবে না।ইরান-ইসরাইল, রাশিয়া-ইউক্রেন, চীন-আমেরিকা কিংবা রাষ্ট্র সমূহ সামান্য উত্তেজনা প্রশমিত করলেই সেটা ভয়াবহ হলেও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত ভয়ংকর কোন ধ্বংসলীলার ইঙ্গিত বহন করে না।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে অবশ্যই অনেক অনেক ধারাবাহিকতা থকবে, তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে সকল ধারাবাহিকতার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যেতে হবে।
আরেকটা কথা বলতেই হয়, তা হলো “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” নামে কিছু হবে না। যেটা হবে সেটা হলো, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে সেটা “Last World War” হিসেবে রূপান্তরিত হবে। তাই সেটাকে “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” না বলে “শেষ বিশ্বযুদ্ধ” বলাটাই সমীচীন ও যথার্থ হবে এবং পৃথিবীর মানুষ সময় পাওয়ার আগেই সেটা বুঝতেও পারবে। উপরন্তু সেটা কোন পাগলের পাগলামি দিয়ে শুরু হবে না। খুব ধীর স্থির প্রকৃত প্রতিপক্ষরা এটা সুচনা করবে (বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে)। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে শুরু নয় কিংবা সেটি “Proxy War” এর মাধ্যমে শুরু না হবার সম্ভাবনাই সিংহভাগ।

ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবঃ যেকোনো যুদ্ধেরই স্বল্পকালীন এবং দীর্ঘকালীন প্রভাব থাকে। ইরান ইসরাইল দুই বিশ্বশক্তির যুদ্ধ হয়তো শীঘ্রই বিরতি পাবে কিন্তু স্থায়ীভাবে থেমে যাবে না কখনোই। এই সমীকরণের রেশ ধরে এবং যুদ্ধের ক্ষতিকে সামনে রেখে বলাই যায়- বিশ্ব অর্থনীতি এই যুদ্ধের খেসারতের বাইরে থাকবে না। আর যেখানে যুদ্ধ সেখানে রাজনৈতিক নতুন সমীকরণ এবং পরিচালন অতি স্বাভাবিক। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা বিশ্বকে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে নিয়ে যাবে। যে সমীকরণ বিশ্ব অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবান্বিত করবে।সেটা হোক তেল রাজনীতি, জল রাজনীতি, খাদ্য রাজনীতি অথবা সমর রাজনীতি সম্পৃক্ত অর্থনীতি। আর স্বল্প সময়ের জন্য তেলের দামের উপরে যে প্রভাব পড়বে সেটা বলাই বাহুল্য। যার প্রভাব গিয়ে পড়বে স্বর্ন, খাদ্য, বস্ত্র ও পরিবহনসহ সকল কিছুর ওপরে। যার মাশুল গুনতে হবে পৃথিবীবাসী সকল নাগরিককেই।

পুনশ্চঃ
১। ইসরাইল এখন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে একটি যুদ্ধ বিরতি চুক্তিতে যাবার পন্থা খুঁজবে।
২। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের মাধ্যমে তার কিছু টেকনোলজির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে নিয়েছে। বলাই যায় এটি যুক্তরাষ্ট্রেরই বদলিযুদ্ধ বা Proxy War
৩। ইরান তার সময়ের শেষ সীমানায় পৌঁছেছে নিজেদের গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে ঢালাওভাবে সাজানোর জন্য। তানাহলে এর চরম মাশুল গুনতে হবে সাহসাই এবং বারংবার।
৪। যুদ্ধবিরতি কিংবা অন্য কোন ভাবে এই যুদ্ধ শেষ হলে ইসরাইল তার সাধ্যের সকল চেষ্টা করবে ইরানের বিরুদ্ধে আনায় আনায় প্রতিশোধ নেবার।
৫। হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানকে সিদ্ধান্ত নেবার সময় হয়তো ঘনিয়েও এসেছে।
৬। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ইসরাইলের “ট্রাম কার্ড”।

লেখাঃ এম.আই.টি এজে
১৬.০৬.২০২৫

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান-ইজরাইল জুন যুদ্ধের দামামা, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য, সমীকরণ

প্রকাশিত : ১১:২৯:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০২৫

১৩ ই জুন ২০২৫ মধ্যরাতে ইরানের অন্তত আশিটি (৮০) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আতর্কিত ভয়াবহ আঘাত হানে ইসরাইল। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে দখলদার এবং অবৈধ ভূ-খণ্ড (রাষ্ট্র নয়) হিসেবেই পরিচিত ইসরাইলের আকস্মিক এই আক্রমণকে বিশ্লেষকরা একটি গুপ্ত আক্রমণ হিসেবেই অভিহিত করছেন। কোন রকম উস্কানী কিংবা পূর্ব ঘোষণা ছাড়া শুক্রবার রাতের আধারে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের এই আক্রমণ মূলতঃ দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা মাফিক বিভিন্ন বাসা-বাড়ি এবং স্থাপনার ছাদে সন্তর্পনে লুকিয়ে রাখা মাইক্রো ড্রোনের (Micro Drone) সাথে শক্তিশালী বিস্ফোরক (High Explosives) সংযুক্ত রেখে রিমোট পদ্ধতির মাধ্যমে “অপারেশন রাইসিং লায়ন (Operation Rising Lion)” কোড নামে এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়।

মোসাদ এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র”য়ের সরাসরি পরিকল্পনা ও সহায়তায় কিছু বিশ্বাসঘাতক ইরানী নাগরিকের মাধ্যমে এই রিমোট চালিত মাইক্রো ড্রোন গুলো দীর্ঘ সময় ধরে নিখুঁত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুলোতে রাখা হয়। আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু গুলোর মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক সদর দপ্তর সমূহ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বর্গের (বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক, সামরিক) আবাসিক ভবন সমূহ।

‘অপারেশন রাইজিং লায়নের’ বিপরীতে ইরান নিজেদেরকে স্বল্প সময়ের মধ্যে গুছিয়ে নিয়ে প্রতিরোধ, প্রতিরক্ষা এবং প্রতিশোধের অঙ্গীকার নিয়ে শুরু করে “অপারেশন ট্রু প্রমিস থ্রি (Operation True Promise-3)” নামের যুদ্ধাভিযান। বিগত তিন দিনে ইরান তার চিরশত্রু ইসরাইলকে ব্যাপক ভাবে বিপর্যস্ত করতে সক্ষম হয়েছে। কল্পনার বাহিরে ক্ষতিসাধন করেছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর, বিমান ঘাঁটি, পাওয়ার জেনারেশন প্লান্ট,সামরিক গবেষণাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সমূহ। ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোসহ প্রায় ২২টি শহর এখন ধ্বংস স্তুপে পরিনত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে ইসরাইলের অহংকার ভরা আত্মবিশ্বাস।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও সফলতাঃ যুদ্ধের শুরুটাতে মোসাদের গোয়েন্দা সফলতা একশতভাগ, এতে কোন সন্দেহ নেই। যার অর্থ দাঁড়ায় ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা(MOIS) সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এই ভয়াবহ আক্রমণের পূর্বের কোন তথ্য জানতে ও জানাতে। ইরানের এই গোয়েন্দা ব্যর্থতা নতুন কোন বিষয় নয়। বিগত বছরগুলোতেও মোসাদ ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে সফল অপারেশনের মাধ্যমে হত্যা করেছে।তারপরেও যথাযথ পারদর্শিতা এবং পেশাদার গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনায় ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা চরমভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। যদিও ইতোমধ্যে ইরান মোসাদের কয়েকজন সদস্য আটক, ইরানের অভ্যন্তরে ইসরাইলের ড্রোন কারখানা সনাক্তকরণ এবং কিছু পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে। ইরানের অভ্যন্তরে মোসাদ এখনো পর্যন্ত শক্তিশালী অপারেশন পরিচালনায় সক্ষম বলেই বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। হয়তো সুযোগের অপেক্ষায় আছে। সময় হলেই সেটা পরিষ্কার বোঝা যাবে।

সামরিক শক্তি এবং পেশাদারিত্বঃ পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং ধংসযজ্ঞের “খেলা”র নাম যুদ্ধ। এখানে বাঘ-সিংহের মত শেয়ানে শেয়ানে লড়াই হলে তো কথাই নেই। বুদ্ধিমত্তা বা যুদ্ধ কৌশল (Tactics) এর সাথে সামরিক শক্তি, সরঞ্জাম এবং সময়ের যথাযথ ব্যবহারের পারদর্শিতা ও পেশাদারিত্বের উপরে ভর করে এই খেলায় তীব্রতা যত বাড়ে সমানুপাতিক ভাবে বাড়তে থাকে প্রাণ এবং সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ। ১৩ ই জুন যুদ্ধ শুরুর পূর্বে পেশাদারিত্ব বিশেষ করে গোয়েন্দা ক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রমাণ রেখেছে ইসরাইল। অপরদিকে যুদ্ধ শুরুর পর হতে যুদ্ধ লিলার পেশাদারীত্বের পাল্লার ভার এ পর্যন্ত (১৫ জুন) নিঃসন্দেহে তেহরানের দিকেই সুস্পষ্ট।

উল্লেখযোগ্য যে ২০২৫ সালের ‘গ্লোবাল মিলিটারি স্ট্রেন্থ ইনডেক্স (Global Military Strength Index)’ অনুযায়ী ইরানের অবস্থান ১৬ তম, পক্ষান্তরে ইসরাইলের অবস্থান ১৫ তম। অন্যদিকে ‘গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স(Global Fire Power Index)’ অনুযায়ী ইরানের অবস্থান ১৫ তম(০.৩০৪৮) এবং ইসরাইলের অবস্থান ১৬ তম(০.২৬৬১)। এসব পরিমাপকের মূল্যায়ন নির্ধারণী সময় চলে এসেছে, বাস্তবতার নিরিখে এ সকল ইনডেক্সের গ্রহণ যোগ্যতার প্রমাণের প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিবে। এটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, সকল ইনডেক্স এর মধ্যে কোন মাত্রার সাইওয়ারফেয়ার (PSYOP) সংমিশ্রণ রয়েছে। বর্তমানের ফিফথ জেনারেশন যুদ্ধের মাঠের বহুমাত্রিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সময় এবং সামর্থের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রমাণ হবে পেশাদারিত্ব ও পারদর্শিতার।

ইরান ইসরাইলের বিগত তিন দিনের (১৩,১৪ ও ১৫ জুন) যুদ্ধের মাঠের পর্যবেক্ষণ ও অবস্থাগত বিষয়গুলো সারা পৃথিবীর সকল সামরিক বিশ্লেষকদের কঠোর নজরদারির অধীনে রয়েছে। ঘন্টা কিংবা দিন হিসেবে তারা হয়তো ফলাফলের একটা হিসেব নিকেশ ও করে যাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে ইসরাইলের কঠোর নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া কিংবা পশ্চিমাদের তথাকথিত ওপেন মিডিয়া-এ সকলই সকল হিসেবের বাইরে থাকবে। যুগ যুগ ধরে স্নায়ু যুদ্ধে অবতীর্ণ এই দুই শক্তির শক্তিময়তার খেলা বিশ্ববাসী যেমন দেখছে তেমনি ইরান ও ইসরাইল নিজ নিজ দেশের জনগণের কাছে যার যার হিসেব ঠিকই বুঝিয়ে দিতে হবে।

কোল্ডওয়ার(Cold War) যখন আগুনের বিভীষিকায় প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে, তখন সেনাবাহিনীর সাথে সাথে যার যার জনগণ সেই ক্ষতির বাইরে নয়। উভয় দেশেরই সামরিক ও বেসামরিক জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ ইসরাইলকে সাময়িক সময়ের জন্য কিছু আত্মতৃপ্তি দিলেও বাস্তবিক পক্ষে সেটা এখন ভয়ংকর দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। বিপর্যস্ত হয়েছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গাজা শহরের ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ইসরাইলের তেলআবিব, হাইফা, রেহভত ও হারজলিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে। ইসরাইলের শক্তির ব্যাপক প্রচার এবং পেশাদারিত্বের লেফাফাদুরস্ত কথাগুলো এখন সকলের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ এবং অসার। ইসরাইল বরাবর নিরস্ত্র ফিলিস্তিনের উপরে যে অসামঞ্জস্য যুদ্ধে(Asymmetric Warfare) বিজয় এনে নিজেদেরকে বিশ্বশক্তিমান হিসেবে জাহির করেছে তা এখন ভূলণ্ঠিত।

দখলদার ইসরাইল উন্নত বিশ্বের নিকট হতে সরাসরি আর্থিক ও সামরিক সরঞ্জামাদির সরাসরি সাহায্যপ্রাপ্ত হয়ে প্রযুক্তিগতভাবে এবং সামরিক শক্তিতে যে উৎকর্ষতায় উন্নীত ও সুসজ্জিত হয়েছিল সেটা তাদের অপেশাদারিত্বের ফলে নিমিষেই হারিয়ে গেছে। তাদের পেশাদারিত্ব নিষ্ফল প্রমাণ হয়েছে আয়রন ডোম এবং এফ-৩৫ পঞ্চম প্রজন্মের স্টিল্থ টেকনোলজির যুদ্ধ বিমান পরিচালনায় ব্যর্থতার দায় সামনে রেখে। সামরিক শক্তি শূন্য ফিলিস্তিনের সাথে যুদ্ধ আর ইরানকে মোকাবেলা এক নয়, এটা হয়তো দখলদার ইসরাইলি বাহিনী এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

আয়রন ডোম (Iron Dome) এবং এফ-৩৫(F-35) যুদ্ধবিমানঃ ব্যাপকভাবে প্রচারিত ইসরাইলের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’র দুর্ভেদ্য আত্মবিশ্বাসের নাম “আয়রন ডোম”কে কার্যত অকার্যকর প্রমাণ করেছে ইরান। ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলের আকাশ সীমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আত্মবিশ্বাসকে। যা ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তির সাথে কৌশলগত বিন্যাসের চৌকস পেশাদারিত্বের প্রমাণই প্রচার করছে শত্রুদেশ সহ বিশ্ব মিডিয়া জুড়ে। ধারণা করা হয় ইসরাইলের আয়রন ডোম হয়তোবা স্বল্পমাত্রার মিজাইল কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য প্রযোজ্য। যেখানে ইরান ব্যবহার করছে ব্যালিস্টিক মিজাইল, হাইপারসনিক মিজাইল এবং ক্রুজ মিসাইল। যেগুলোর জন্য আয়রন ডোম কার্যকরী প্রতিরক্ষা দিতে সক্ষম নয়। অথবা ইরানের সামরিক বাহিনী এমন কোন টেকনোলজিতে পৌঁছেছে যা কিনা আয়রন ডোমকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।

F-35 যুদ্ধবিমান, পঞ্চম প্রজন্মের ( Fifth Generation) সর্বাধুনিক প্রযুক্তির এই স্টিল্থ ফাইটার বিমানের অধিকারী ইসরাইল। যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র এবং সামান্য কটি উন্নত রাষ্ট্রের কুক্ষিগত রয়েছে, বাকিদের কাছে এটা স্বপ্নেরও অধিক। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশযান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘লকহীড ও মার্টিন’ নামের অত্যন্ত স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি এই এফ-৩৫ বিমান। স্টিল্থ প্রযুক্তিতে তৈরি এই বিমান যে কোন রাডার ব্যবস্থার কাছে অদৃশ্যই থেকে যায়, এমনটাই বলা হয়েছিল এ পর্যন্ত। কিন্তু ইরান দাবি করেছে তারা ইসরাইলের তিনটি F-35 বিমান ভূপাতিত করেছে। দাবিটি উড়িয়ে দেবার মত নয়। কেননা তারপর হতে এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ইসরাইল আর কোন এফ-৩৫ বিমান ব্যবহার করেনি। এখানেও একদিকে যেমন ইরানি বাহিনীর পেশাদারিত্বের উৎকর্ষতার প্রমাণ মিলেছে। অপর দিকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এফ-৩৫ বিমানের তথাকথিত গুণগত মান ও রাডার ফাঁকি দেবার পদ্ধতি নিয়ে। এই বিমানকে বলা হয়েছিল যুদ্ধের গেইম চেঞ্জার, অর্থাৎ যার কাছে এটা থাকবে সেই দেশ যুদ্ধের গেইম চেঞ্জ করতে সক্ষম হবে। প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো করে দিয়েছে ইরানি বাহিনী। বিমানগুলো ভূপাতিত করে প্রকৃতপক্ষেই গেইম চেঞ্জ করে ফেলেছে। গেইম এখন পর্যন্ত ইরান সেনাবাহিনীরই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মেরুকরণ বা (Polarisation) পোলারাইজেশনঃ ১৯৯১ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ভাঙ্গনের পরে রাষ্ট্রগুলো সামরিক ক্ষমতার মেরুকরণের ক্ষেত্রে সামান্য কিছুদিন আমেরিকার অধীনে পৃথিবী একক ক্ষমতার আয়ত্তে বা ইউনিপোলার(Unipolar) থাকলেও বর্তমান পৃথিবী রাষ্ট্রগুলোর বলয়ে বিভক্ত হয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power) বজায় রাখছে। বর্তমানের পৃথিবী রাষ্ট্রসমূহের সামরিক ক্ষমতার মেরুকরণে দ্বিমাত্রিক(Bipolar) কিংবা বহুমাত্রিক (Multipolar) মেরু করণে চলছে। ইরান ইসরাইল যুদ্ধ পৃথিবীকে আবারো নতুন করে পরিষ্কার মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাবে। গত তিন দিনে বিষয়টা অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে যা অদূর ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ স্পষ্ট হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরাইলের পক্ষে আছে খোদ আমেরিকা। সাথে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য, ভারত, ফ্রান্স এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মুসলিম দেশ। অপর দিকে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া এবং সৌদি আরব ও পাকিস্তান সহ মুসলিম বিশ্বের প্রায় সকল দেশ। বরাবরের মতো কিছু দেশ স্বভাবতই পক্ষপাতবিহীন থাকার বৃথা চেষ্টা করবে। নতুন কোন ভিন্ন মাত্রার সামরিক বলয়ের সম্ভাবনাকে কোন ভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। একটি বিষয় না বললেই নয় যে, ভারতের পেহেলগামে গত ২২ এপ্রিল সন্ত্রাসী আক্রমণের সূত্র ধরে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ইরান সম্পূর্ণ নীরব ছিল। কিন্তু ইরানের ভেতরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মোসাদের সাথে সমন্বয় পূর্বক ইরানের উপরে রচনা করা এই আক্রমণ ভারত, পাকিস্তান এবং ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের মেরুকরণকে নতুন মোড় নিতে উদ্বুদ্ধ করবে।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাঃ পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হলেই মানুষের মনে স্বভাবতই উঁকি দেয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের উস্কানি ধরনের আগমনী বার্তা। সেখানে যদি সুপার পাওয়ারদের অংশগ্রহণ থাকে তাহলে বিষয়টি ভাববার বাইরে রাখার তেমন সুযোগ থাকে না। ইরান-ইজরাইল যুদ্ধে সুপার পাওয়ার সমূহ- বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্স যেখানে মেরুকরণ করছে সেখানে বিশ্ব নাগরিকগণ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের গন্ধ খুঁজবেন এটাই স্বাভাবিক।
তাই বলে কি বিষয়টা এতই সহজ? না, একদমই না। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমন কোন মামুলি খেলা হবে না।ইরান-ইসরাইল, রাশিয়া-ইউক্রেন, চীন-আমেরিকা কিংবা রাষ্ট্র সমূহ সামান্য উত্তেজনা প্রশমিত করলেই সেটা ভয়াবহ হলেও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত ভয়ংকর কোন ধ্বংসলীলার ইঙ্গিত বহন করে না।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে অবশ্যই অনেক অনেক ধারাবাহিকতা থকবে, তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে সকল ধারাবাহিকতার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যেতে হবে।
আরেকটা কথা বলতেই হয়, তা হলো “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” নামে কিছু হবে না। যেটা হবে সেটা হলো, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে সেটা “Last World War” হিসেবে রূপান্তরিত হবে। তাই সেটাকে “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” না বলে “শেষ বিশ্বযুদ্ধ” বলাটাই সমীচীন ও যথার্থ হবে এবং পৃথিবীর মানুষ সময় পাওয়ার আগেই সেটা বুঝতেও পারবে। উপরন্তু সেটা কোন পাগলের পাগলামি দিয়ে শুরু হবে না। খুব ধীর স্থির প্রকৃত প্রতিপক্ষরা এটা সুচনা করবে (বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে)। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে শুরু নয় কিংবা সেটি “Proxy War” এর মাধ্যমে শুরু না হবার সম্ভাবনাই সিংহভাগ।

ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবঃ যেকোনো যুদ্ধেরই স্বল্পকালীন এবং দীর্ঘকালীন প্রভাব থাকে। ইরান ইসরাইল দুই বিশ্বশক্তির যুদ্ধ হয়তো শীঘ্রই বিরতি পাবে কিন্তু স্থায়ীভাবে থেমে যাবে না কখনোই। এই সমীকরণের রেশ ধরে এবং যুদ্ধের ক্ষতিকে সামনে রেখে বলাই যায়- বিশ্ব অর্থনীতি এই যুদ্ধের খেসারতের বাইরে থাকবে না। আর যেখানে যুদ্ধ সেখানে রাজনৈতিক নতুন সমীকরণ এবং পরিচালন অতি স্বাভাবিক। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা বিশ্বকে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে নিয়ে যাবে। যে সমীকরণ বিশ্ব অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবান্বিত করবে।সেটা হোক তেল রাজনীতি, জল রাজনীতি, খাদ্য রাজনীতি অথবা সমর রাজনীতি সম্পৃক্ত অর্থনীতি। আর স্বল্প সময়ের জন্য তেলের দামের উপরে যে প্রভাব পড়বে সেটা বলাই বাহুল্য। যার প্রভাব গিয়ে পড়বে স্বর্ন, খাদ্য, বস্ত্র ও পরিবহনসহ সকল কিছুর ওপরে। যার মাশুল গুনতে হবে পৃথিবীবাসী সকল নাগরিককেই।

পুনশ্চঃ
১। ইসরাইল এখন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে একটি যুদ্ধ বিরতি চুক্তিতে যাবার পন্থা খুঁজবে।
২। যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের মাধ্যমে তার কিছু টেকনোলজির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে নিয়েছে। বলাই যায় এটি যুক্তরাষ্ট্রেরই বদলিযুদ্ধ বা Proxy War
৩। ইরান তার সময়ের শেষ সীমানায় পৌঁছেছে নিজেদের গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে ঢালাওভাবে সাজানোর জন্য। তানাহলে এর চরম মাশুল গুনতে হবে সাহসাই এবং বারংবার।
৪। যুদ্ধবিরতি কিংবা অন্য কোন ভাবে এই যুদ্ধ শেষ হলে ইসরাইল তার সাধ্যের সকল চেষ্টা করবে ইরানের বিরুদ্ধে আনায় আনায় প্রতিশোধ নেবার।
৫। হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানকে সিদ্ধান্ত নেবার সময় হয়তো ঘনিয়েও এসেছে।
৬। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ইসরাইলের “ট্রাম কার্ড”।

লেখাঃ এম.আই.টি এজে
১৬.০৬.২০২৫