০৫:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

সাদাকাতুল ফিতর কি এবং কেন?

শায়খ মো: সাইফুল্লাহ :  মাহে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হল ‘সাদাকাতুল ফিতর’। রমজান মাস শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের দিন অর্থাৎ শাওয়াল মাসের ১ তারিখে প্রত্যেক মুসলমান স্বেচ্ছাকৃতভাবে গরিবদের মধ্যে যে খাদ্য বন্টণ করে থাকে, ফিকাহবিদ ও মুহাদ্দিসগণ তাকে ‘যাকাতুল ফিতর’ নামে নামকরণ করেছেন।

হাদিস এবং অন্যান্য প্রামাণিক ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, রাসুলুল্লাহ সা. দ্বিতীয় হিজরীতে যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বেই যাকাতুল ফিতরের আদেশ জারি করেছেন। তিনি ফিতরার পরিমাণও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আবদুল্লাহ বিন ওমর রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকায়ে ফিতর হিসেবে এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব প্রত্যেক স্বাধীন ও পরাধীন (গোলাম) মুসলমানের উপর ফরজ করে দিয়েছেন। আর ‘সা’ হচ্ছে পরিমাপের একক (পাত্র বা ভান্ড), যাহা মোটামুটি ২.৫০ কেজি চালের সমান। তবে, ঘনত্ব ও ওজনের তারতম্য হেতু অন্যান্য শস্যদানার ওজনে এর কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।

খেজুর এবং যব ছাড়া অন্যান্য দ্রব্যও সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে দেওয়া যায়। আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, ‘আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা’ খাদ্য অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ যাবীব (কিসমিস) দিতাম’। নর-নারী, যুবা-বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। ইবনে ওমরের হাদিস থেকে নিশ্চিত যে, ‘স্বাধীন কিংবা দাস, যুবা কিংবা বৃদ্ধ, নারী কিংবা পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলমানকে এক সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব ‘ফিতরা’ বাবদ প্রদান করতে হবে। নিজের পক্ষে, স্ত্রী এবং তার উপর নির্ভরশীল সকলের পক্ষে, এমনকি তার উপর নির্ভরশীল পিতামাতার পক্ষে সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করতে হবে।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

রোজাদার ব্যক্তির চিত্তের পরিশোধনের অন্যতম উপায় হিসেবে তার উপর যাকাতুল ফিতর ধার্য করা হয়। এজন্য শেষ রমজানের দিন সুর্যাস্তের পরই তা প্রদেয় হয়। সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের নামাজের পূর্বেই সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত। এর ফলে গরীব-মিসকীনরা আনন্দচিত্তে অন্যান্য মুসলমান ভাইদের সাথে ঈদগাহে যেতে সক্ষম হয়। ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসুল সা. আদেশ দিয়েছেন, ‘মানুষ ঈদের জামায়াতে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করা হউক’। তবে রমজানের প্রথম দিকেও সাদাকাতুল ফিতর প্রদান অনুমোদনযোগ্য। যাদেরকে যাকাত দেয়া বৈধ, তাদেরকে সাদাকাতুল ফিতর প্রদান বৈধ।

এ বছর ফিতরার হার জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১০ টাকা, সর্বনিন্ম ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইসলামী শরীয়াহ মতে, গম, আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর, পনির ইত্যাদি পন্যগুলোর যেকোন একটির দ্বারা ফিতরা প্রদান করা যায়। উন্নত মানের গম বা আটা দিয়ে ফিতরা আদায় করলে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৭০ টাকা দিতে হবে। যব দিয়ে আদায় করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২৮০ টাকা, কিশমিশ দিয়ে করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১ হাজার ৩২০ টাকা, খেজুর দিয়ে করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১ হাজার ৬৫০ টাকা, পনির দিয়ে করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা বাজার মূল্য ২ হাজার ৩১০ টাকা (সূত্র-ইফাবা)। মুসলমানেরা নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী এসব পণ্যগুলোর যেকোন একটি পণ্য বা এর বাজার মূল্য দিয়ে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আদায় করতে পারবেন।

এসব পণ্যের স্থানীয় খুচরা বাজার মূল্যের তারতম্য রয়েছে। তাই, স্থানীয় মুল্যে পরিশোধ করলেও ফিতরা আদায় হবে। আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য চালের ভিত্তিতে ফিতরা নির্ধারণ করা হলে তা আদায় করতে সকলের জন্য সহজবোধ্য হয়। কেননা খাদ্য হিসেবে এটি সবার কাছে পাওয়া যায়। ইমাম মালেক (র:) ও ইমাম শাফেয়ী (র:) অনুসারীগণ মনে করেন, মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে দেশের সাধারন খাদ্য থেকে তাদের ফিতরা প্রদান করা। আরেকটি মত হচ্ছে, যিনি যে মানের খাদ্যদ্রব্য ও আসবাবপত্র ব্যবহার করেন তাকে সে মানের ভিত্তিতেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা উচিত।

নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে মুসলমান নর-নারীর ওপর ঈদের দিন সকালে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব হয়। ঈদের নামাজের পর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার অনুমোদন নেই। কেননা এ ফিতরা আদায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হল ঈদের দিনে গরীবদের প্রয়োজন মিটানো। কাজেই তা আদায়ে বিলম্ব ঘটলে এর উদ্দেশ্য পূরণে ঘাটতি দেখা দেয়। যা একজন মুসলমান ও রোজাদারের জন্য কাম্য নয়। তবে, ঈদের নামাজের পর প্রদান করা হলে তাতে কোন গুণাহ হবে না। তবে কোনক্রমইে তা সুর্যাস্তের পর প্রদান করা উচিত নয়। সুর্যাস্তের পর পর্যন্ত বিলম্বিত করা হলে গুণাহ হবে। তবে তা আদায়ের বাধ্যবাধকতা থেকেই যাবে। বিলম্ব হলেও প্রদান করতে হবে। যথাযথ নিয়ম মেনে প্রত্যেক মুসলিমের সাদাকাতুল ফিতরা আদায় করা উচিত।

লেখক- এমফিল গবেষক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

আরো পড়ুন- ফিতরা দিবেন কি দিয়ে ?

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

সাদাকাতুল ফিতর কি এবং কেন?

প্রকাশিত : ১০:২৮:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ মে ২০২১

শায়খ মো: সাইফুল্লাহ :  মাহে রমজানের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হল ‘সাদাকাতুল ফিতর’। রমজান মাস শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের দিন অর্থাৎ শাওয়াল মাসের ১ তারিখে প্রত্যেক মুসলমান স্বেচ্ছাকৃতভাবে গরিবদের মধ্যে যে খাদ্য বন্টণ করে থাকে, ফিকাহবিদ ও মুহাদ্দিসগণ তাকে ‘যাকাতুল ফিতর’ নামে নামকরণ করেছেন।

হাদিস এবং অন্যান্য প্রামাণিক ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, রাসুলুল্লাহ সা. দ্বিতীয় হিজরীতে যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বেই যাকাতুল ফিতরের আদেশ জারি করেছেন। তিনি ফিতরার পরিমাণও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আবদুল্লাহ বিন ওমর রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকায়ে ফিতর হিসেবে এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব প্রত্যেক স্বাধীন ও পরাধীন (গোলাম) মুসলমানের উপর ফরজ করে দিয়েছেন। আর ‘সা’ হচ্ছে পরিমাপের একক (পাত্র বা ভান্ড), যাহা মোটামুটি ২.৫০ কেজি চালের সমান। তবে, ঘনত্ব ও ওজনের তারতম্য হেতু অন্যান্য শস্যদানার ওজনে এর কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।

খেজুর এবং যব ছাড়া অন্যান্য দ্রব্যও সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে দেওয়া যায়। আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, ‘আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা’ খাদ্য অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ যাবীব (কিসমিস) দিতাম’। নর-নারী, যুবা-বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। ইবনে ওমরের হাদিস থেকে নিশ্চিত যে, ‘স্বাধীন কিংবা দাস, যুবা কিংবা বৃদ্ধ, নারী কিংবা পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলমানকে এক সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব ‘ফিতরা’ বাবদ প্রদান করতে হবে। নিজের পক্ষে, স্ত্রী এবং তার উপর নির্ভরশীল সকলের পক্ষে, এমনকি তার উপর নির্ভরশীল পিতামাতার পক্ষে সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করতে হবে।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

রোজাদার ব্যক্তির চিত্তের পরিশোধনের অন্যতম উপায় হিসেবে তার উপর যাকাতুল ফিতর ধার্য করা হয়। এজন্য শেষ রমজানের দিন সুর্যাস্তের পরই তা প্রদেয় হয়। সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের নামাজের পূর্বেই সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত। এর ফলে গরীব-মিসকীনরা আনন্দচিত্তে অন্যান্য মুসলমান ভাইদের সাথে ঈদগাহে যেতে সক্ষম হয়। ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসুল সা. আদেশ দিয়েছেন, ‘মানুষ ঈদের জামায়াতে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করা হউক’। তবে রমজানের প্রথম দিকেও সাদাকাতুল ফিতর প্রদান অনুমোদনযোগ্য। যাদেরকে যাকাত দেয়া বৈধ, তাদেরকে সাদাকাতুল ফিতর প্রদান বৈধ।

এ বছর ফিতরার হার জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১০ টাকা, সর্বনিন্ম ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইসলামী শরীয়াহ মতে, গম, আটা, যব, কিশমিশ, খেজুর, পনির ইত্যাদি পন্যগুলোর যেকোন একটির দ্বারা ফিতরা প্রদান করা যায়। উন্নত মানের গম বা আটা দিয়ে ফিতরা আদায় করলে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ৭০ টাকা দিতে হবে। যব দিয়ে আদায় করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ২৮০ টাকা, কিশমিশ দিয়ে করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১ হাজার ৩২০ টাকা, খেজুর দিয়ে করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজার মূল্য ১ হাজার ৬৫০ টাকা, পনির দিয়ে করলে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা বাজার মূল্য ২ হাজার ৩১০ টাকা (সূত্র-ইফাবা)। মুসলমানেরা নিজ নিজ সামর্থ অনুযায়ী এসব পণ্যগুলোর যেকোন একটি পণ্য বা এর বাজার মূল্য দিয়ে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আদায় করতে পারবেন।

এসব পণ্যের স্থানীয় খুচরা বাজার মূল্যের তারতম্য রয়েছে। তাই, স্থানীয় মুল্যে পরিশোধ করলেও ফিতরা আদায় হবে। আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য চালের ভিত্তিতে ফিতরা নির্ধারণ করা হলে তা আদায় করতে সকলের জন্য সহজবোধ্য হয়। কেননা খাদ্য হিসেবে এটি সবার কাছে পাওয়া যায়। ইমাম মালেক (র:) ও ইমাম শাফেয়ী (র:) অনুসারীগণ মনে করেন, মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে দেশের সাধারন খাদ্য থেকে তাদের ফিতরা প্রদান করা। আরেকটি মত হচ্ছে, যিনি যে মানের খাদ্যদ্রব্য ও আসবাবপত্র ব্যবহার করেন তাকে সে মানের ভিত্তিতেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা উচিত।

নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হলে মুসলমান নর-নারীর ওপর ঈদের দিন সকালে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব হয়। ঈদের নামাজের পর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার অনুমোদন নেই। কেননা এ ফিতরা আদায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হল ঈদের দিনে গরীবদের প্রয়োজন মিটানো। কাজেই তা আদায়ে বিলম্ব ঘটলে এর উদ্দেশ্য পূরণে ঘাটতি দেখা দেয়। যা একজন মুসলমান ও রোজাদারের জন্য কাম্য নয়। তবে, ঈদের নামাজের পর প্রদান করা হলে তাতে কোন গুণাহ হবে না। তবে কোনক্রমইে তা সুর্যাস্তের পর প্রদান করা উচিত নয়। সুর্যাস্তের পর পর্যন্ত বিলম্বিত করা হলে গুণাহ হবে। তবে তা আদায়ের বাধ্যবাধকতা থেকেই যাবে। বিলম্ব হলেও প্রদান করতে হবে। যথাযথ নিয়ম মেনে প্রত্যেক মুসলিমের সাদাকাতুল ফিতরা আদায় করা উচিত।

লেখক- এমফিল গবেষক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।

আরো পড়ুন- ফিতরা দিবেন কি দিয়ে ?