নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর এক আইন ভঙ্গ করছে ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পুঁজিবাজারের অভিভাবক বিএসইসি এ ব্যাপারে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএসইসির গাফিলতির কারণে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানি অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছে। তাদের মতে, ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স অন্যতম। কোম্পানিটি শ্রম আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি বিএসইসির বেশ কিছু রুলস অমান্য করেছে। নিরীক্ষককে এসব অনিয়মের বিপরীতে গা বাঁচানো জবাব দিয়ে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে কোম্পানিটি। এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
জানা গেছে, শ্রম আইন-২০০৬ অনুসারে নিট মুনাফার পাঁচ শতাংশ কোম্পানিকে ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে (ডব্লিউপিপিএফ) জমা দিতে হয়। কিন্তু অবাক করা বিষয়, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ সমাপ্ত বছরের জন্য ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে এই অর্থ জমা দেয়নি। এতে করে কোম্পানিটি শ্রম আইন ২০০৬-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে।
শ্রম আইন লঙ্ঘনের ব্যাপারে কোম্পানিটি নিরীক্ষককে জানিয়েছে, শ্রম আইন, ২০০৬-এর আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট এ বিষয়ে কমপ্ল্যায়েন্সগুলো যাচাই-বাছাই করছে। শ্রম আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরবর্তী আর্থিক বিবরণীতে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখা হবে।
এদিকে, ২০২৪ সালে ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স ১০ কোটি ৪৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিট মুনাফা করেছিল। সেখান থেকে পাঁচ শতাংশ অর্থাৎ ৫২ লাখ ২৯ হাজার টাকা ডব্লিউপিপি ফান্ডে জমা না দিয়ে শ্রম আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছে ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স, জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে নিরীক্ষক জানিয়েছে, বিদায়ী বছরে (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫) ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ১০ কার্যদিবসের মধ্যে ঘোষিত নগদ লভ্যাংশ (ক্যাশ ডিভিডেন্ড) একটি পৃথক ও নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু কোম্পানি তা পালনে সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বিএসইসির বিধিমালার গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে।
এ ব্যাপারে ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স নিরীক্ষককে জানায়, ভবিষ্যতে বিএসইসির বিধিমালা মেনে চলার জন্য কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, কমিশনের নিয়ম ভঙ্গ করা ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। কোম্পানি জানে এই নিয়ম ভঙ্গের জন্য তাদের কোনো শাস্তি হবে না। তাই যখন মোন চায় কোম্পানিটি নিয়ম ভঙ্গ করে।
এছাড়াও বিদায়ী বছরে গ্রাচুইটি বাবদ ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স কোনো প্রভিশন রাখেনি এবং কোম্পানিটি ‘আইএএস ১৯ এমপ্লয়ি বেনিফিটস- এর ৬৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন সম্পন্ন করেনি। এর ফলে, যে পরিমাণ প্রভিশন রাখা উচিত ছিল, নিরীক্ষক তা নির্ধারণ করতে পারেনি। এর ফলে কোম্পানির নিট প্রফিট বা মুনাফা বেশি দেখানো হয়েছে। একইভাবে দায় কম দেখানো হয়েছে বলে নিরীক্ষক জানিয়েছে।
আর এ ব্যাপারে কোম্পানিটি বরাবরের মতো গা বাঁচানো জবাব দিয়েছে। কোম্পানিটি নিরীক্ষককে জানিয়েছে, কোম্পানি যোগ্য কর্মীদের জন্য একটি গ্র্যাচুইটি স্কিম পরিচালনা করে; তবে, আলোচ্য সময়ে কোনো অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়ন করা হয়নি এবং এ-সংক্রান্ত কোনো প্রভিশনও রাখা হয়নি। এই বিষয়টি মূলত কোনো দায়বদ্ধতার অনুপস্থিতি নয়, বরং আইএএস ১৯ -এর আওতায় অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়নের অভাবজনিত। দায় নিরূপণ ও বিধিবিধান পরিপালন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কোম্পানি একজন স্বতন্ত্র অ্যাকচুয়ারিকে নিয়োগ করছে এবং প্রয়োজনীয় প্রভিশন পরবর্তী আর্থিক বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এদিকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ নিয়ে ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের ম্যানেজমেন্টের দক্ষতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, পুঁজিবাজারের বিভিন্ন কোম্পানি ও ফান্ডে ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০ কোটি ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ২৭৬ টাকা। আর বিদায়ী বছরে এই বিনিয়োগের মার্কেট ভ্যালুর পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ২৮ লাখ ৫১ হাজার ৪৪৫ টাকা। ফলে বিমা খাতের কোম্পানিটির আনরিয়েলাইজড লোকসান হয়েছে ৯ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ টাকা বা ৩৩ শতাংশ।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, কোম্পানিটি বিদায়ী বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা আনরিয়েলাইজড লোকসান করেছে। খেলাপি ঋণে জর্জরিত এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, বে লিজিং এর মতো শেয়ারে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ তছরুপ করেছে ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স। বিএসইসির উচিত কোম্পানিটির ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এসব ব্যাপারে, ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) (ভারপ্রাপ্ত) ইউসুফ শরিফ দেশ সমাচারকে বলেন, বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যে ডিএসই, সিএসই, বিএসইসি, আইডিআরএ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আমাদের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আর্থিক প্রতিবেদনের ২১০ ও ২১১ নাম্বার পেজে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও কর্মপরিকল্পনা প্রদান করেছে। আমরা পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদি আরও কোনো তথ্যের প্রয়োজন হয়, তবে আমরা তা সানন্দে দিতে সহায়তা করব।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্যপরিষদের সভাপতি কাজী মো. নজরুল দেশ সমাচারকে বলেন, ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স একের পর এক আইন ভঙ্গ করছে। তারপরেও সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ছে না। বিশেষ করে বিএসইসি কোম্পানিটির ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। নিরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে সংস্থাটি। এতে করে অন্যান্য কোম্পানিকে অনিয়ম করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি স্বার্থে ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্স বাজে কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীদের অর্থ তছরুপ করেছে। কোম্পানিটিকে শক্ত হাতে ধরা উচিত এবং তদন্ত করে বিমা খাতের কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত কমিশনের।
বিএসইসি’র মুখপাত্র আবুল কালাম দেশ সমাচারকে বলেন, ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের সামগ্রিক বিষয় খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বিএসইসি।
উল্লেখ্য, ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের পরিশোধিত মূলধন ৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ২৯ দশমিক ২৯ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ২৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৪৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর ছিল ৫৮ টাকা ৫০ পয়সা।
শিগগিরই ইস্টার্ণ ইন্স্যুরেন্সের সামগ্রিক অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশ করা হবে দ্বিতীয় পর্ব।
অনলাইন ডেস্ক 















