০৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

লোকসান, প্রভিশন ঘাটতি ও দুর্বল মূলধন: চ্যালেঞ্জে আইএফআইসি ব্যাংক

  • ইয়াসিন
  • প্রকাশিত : ১১:২৫:১০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
  • 188

আইএফআইসি ব্যাংকের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন যেন এক মহাবিপর্যয়ের দলিল। ব্যাংক খাতের চরম অব্যবস্থাপনা আর খামখেয়ালিপনার চূড়ান্ত চিত্র ফুটে উঠেছে এই প্রতিবেদনে। বিশাল অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি, তীব্র মূলধন সংকট আর হাজার কোটির লোকসানে ব্যাংকটির দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম। খোদ বহিঃনিরীক্ষক তাদের প্রতিবেদনে ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদ যুক্ত করে বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের এই চরম বিপজ্জনক অবস্থার দিকে আঙুল তুলতে বাধ্য হয়েছেন।

ব্যাংকটির ঋণ ও অগ্রিমের সুরক্ষায় রক্ষিত সাধারণ প্রভিশন নিয়ে রীতিমতো নয়ছয় করা হয়েছে। যেখানে অশ্রেণিকৃত এবং বিশেষ উল্লেখযোগ্য হিসাবসহ মোট ২ হাজার ৭০১ কোটি ৬২ লাখ টাকা সাধারণ প্রভিশন রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, সেখানে রাখা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এক খাতেই ঘাটতি প্রায় ৬৯৬ কোটি টাকা। অফ-ব্যালেন্স শিট এক্সপোজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতেও প্রায় ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ঘাটতি আড়াল করা যায়নি। সবচেয়ে বড় জালিয়াতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা এফডিআরের প্রভিশনে। যেখানে ৩১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা রাখার কথা, সেখানে প্রায় অর্ধেক টাকা গায়েব করে রাখা হয়েছে মাত্র ১৬৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এখানেও স্পষ্ট ৩০০ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি।

মূলধন পর্যাপ্ততার দিক থেকে আইএফআইসি ব্যাংক এখন আইসিইউতে। ঝুঁকি-সমন্বিত সম্পদের বিপরীতে যেখানে ন্যূনতম ৫ হাজার ৮৬৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা মূলধন থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে ব্যাংকটির মোট নিয়ন্ত্রক মূলধন পড়ে রয়েছে মাত্র ১ balance হাজার ৪৭৮ কোটি ২৭ লাখ টাকায়। ৪ হাজার ৭৯৮ কোটি ২২ লাখ টাকার এই আকাশচুম্বী মূলধন ঘাটতি প্রমাণ করে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি কতটা নড়বড়ে। মাত্র এক বছরে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে ধসে ১ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যাংকের আসল মেরুদণ্ড অর্থাৎ কমন ইকুইটি টিয়ার-১ অনুপাত ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে তলানিতে নেমে ঠেকেছে মাত্র ০ দশমিক ৪২ শতাংশে।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখলে যে কোনো বিনিয়োগকারীর চোখ কপালে উঠবে। ২০২৫ সালে পরিচালন আয় যেখানে ৩ হাজার ২২৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, সেখানে সুদ ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ মোট পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৯৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। প্রভিশন সংরক্ষণের আগেই ব্যাংকটি ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকার নিট লোকসান গুনেছে। অথচ আগের বছরও ব্যাংকটি ৫৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকার মুনাফায় ছিল। এই নজিরবিহীন লোকসানের ধাক্কায় ২০২৪ সালের ২১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার উদ্বৃত্ত সঞ্চিত মুনাফা রাতারাতি উধাও হয়ে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৩৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকার বিশাল ঋণাত্মক গর্তে পতিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটি বা বিনিয়োগের অস্তিত্ব এখন চরম হুমকির মুখে।

আইএফআইসি ব্যাংকের এই সামগ্রিক দেউলিয়া দশা ধামাচাপা দিতে শেষ মুহূর্তে ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল এক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এবি ব্যাংকের আমানতসহ অন্যান্য খাতের ২ হাজার ১৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকার প্রভিশন তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বয় না করে স্থগিত রাখার এক অদ্ভুত ও অনৈতিক সুযোগ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই লাইফ সাপোর্ট বা বিশেষ ছাড়ের ওপর ভর করেই ব্যাংকটি কোনোমতে তাদের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করে জোড়াতালির হিসাব দেখিয়েছে। তবে এই আইনি মারপ্যাঁচ ও বিশেষ সুবিধা দিয়ে ব্যাংকের আসল ক্ষত লুকানো অসম্ভব। ভবিষ্যৎ প্রভিশন সংরক্ষণ এবং এই বিশাল মূলধন ঘাটতি পূরণ করে ব্যাংকটিকে টেনে তোলা প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ, যা আমানতকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

লোকসান, প্রভিশন ঘাটতি ও দুর্বল মূলধন: চ্যালেঞ্জে আইএফআইসি ব্যাংক

প্রকাশিত : ১১:২৫:১০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬

আইএফআইসি ব্যাংকের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন যেন এক মহাবিপর্যয়ের দলিল। ব্যাংক খাতের চরম অব্যবস্থাপনা আর খামখেয়ালিপনার চূড়ান্ত চিত্র ফুটে উঠেছে এই প্রতিবেদনে। বিশাল অঙ্কের প্রভিশন ঘাটতি, তীব্র মূলধন সংকট আর হাজার কোটির লোকসানে ব্যাংকটির দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম। খোদ বহিঃনিরীক্ষক তাদের প্রতিবেদনে ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদ যুক্ত করে বিনিয়োগকারী ও অংশীজনদের এই চরম বিপজ্জনক অবস্থার দিকে আঙুল তুলতে বাধ্য হয়েছেন।

ব্যাংকটির ঋণ ও অগ্রিমের সুরক্ষায় রক্ষিত সাধারণ প্রভিশন নিয়ে রীতিমতো নয়ছয় করা হয়েছে। যেখানে অশ্রেণিকৃত এবং বিশেষ উল্লেখযোগ্য হিসাবসহ মোট ২ হাজার ৭০১ কোটি ৬২ লাখ টাকা সাধারণ প্রভিশন রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, সেখানে রাখা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এক খাতেই ঘাটতি প্রায় ৬৯৬ কোটি টাকা। অফ-ব্যালেন্স শিট এক্সপোজারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাতেও প্রায় ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকার ঘাটতি আড়াল করা যায়নি। সবচেয়ে বড় জালিয়াতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখা এফডিআরের প্রভিশনে। যেখানে ৩১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা রাখার কথা, সেখানে প্রায় অর্ধেক টাকা গায়েব করে রাখা হয়েছে মাত্র ১৬৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এখানেও স্পষ্ট ৩০০ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি।

মূলধন পর্যাপ্ততার দিক থেকে আইএফআইসি ব্যাংক এখন আইসিইউতে। ঝুঁকি-সমন্বিত সম্পদের বিপরীতে যেখানে ন্যূনতম ৫ হাজার ৮৬৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা মূলধন থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে ব্যাংকটির মোট নিয়ন্ত্রক মূলধন পড়ে রয়েছে মাত্র ১ balance হাজার ৪৭৮ কোটি ২৭ লাখ টাকায়। ৪ হাজার ৭৯৮ কোটি ২২ লাখ টাকার এই আকাশচুম্বী মূলধন ঘাটতি প্রমাণ করে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি কতটা নড়বড়ে। মাত্র এক বছরে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে ধসে ১ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে এসেছে। ব্যাংকের আসল মেরুদণ্ড অর্থাৎ কমন ইকুইটি টিয়ার-১ অনুপাত ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে তলানিতে নেমে ঠেকেছে মাত্র ০ দশমিক ৪২ শতাংশে।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখলে যে কোনো বিনিয়োগকারীর চোখ কপালে উঠবে। ২০২৫ সালে পরিচালন আয় যেখানে ৩ হাজার ২২৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, সেখানে সুদ ও প্রশাসনিক ব্যয়সহ মোট পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৯৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। প্রভিশন সংরক্ষণের আগেই ব্যাংকটি ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকার নিট লোকসান গুনেছে। অথচ আগের বছরও ব্যাংকটি ৫৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকার মুনাফায় ছিল। এই নজিরবিহীন লোকসানের ধাক্কায় ২০২৪ সালের ২১ কোটি ৫৮ লাখ টাকার উদ্বৃত্ত সঞ্চিত মুনাফা রাতারাতি উধাও হয়ে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৩৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকার বিশাল ঋণাত্মক গর্তে পতিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটি বা বিনিয়োগের অস্তিত্ব এখন চরম হুমকির মুখে।

আইএফআইসি ব্যাংকের এই সামগ্রিক দেউলিয়া দশা ধামাচাপা দিতে শেষ মুহূর্তে ত্রাণকর্তা হিসেবে হাজির হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল এক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এবি ব্যাংকের আমানতসহ অন্যান্য খাতের ২ হাজার ১৫৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকার প্রভিশন তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বয় না করে স্থগিত রাখার এক অদ্ভুত ও অনৈতিক সুযোগ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই লাইফ সাপোর্ট বা বিশেষ ছাড়ের ওপর ভর করেই ব্যাংকটি কোনোমতে তাদের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করে জোড়াতালির হিসাব দেখিয়েছে। তবে এই আইনি মারপ্যাঁচ ও বিশেষ সুবিধা দিয়ে ব্যাংকের আসল ক্ষত লুকানো অসম্ভব। ভবিষ্যৎ প্রভিশন সংরক্ষণ এবং এই বিশাল মূলধন ঘাটতি পূরণ করে ব্যাংকটিকে টেনে তোলা প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ, যা আমানতকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।