বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফেরার ইঙ্গিত মিললেও সামগ্রিক পুনরুদ্ধার ধারা এখনও ফেরেনি- এমন সতর্ক বার্তা দিয়েছে গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)। খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সংস্থাটি বলছে, এ অঙ্ক বেড়ে ৯ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ভুল করলে উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমবে। ফলে দেশ উচ্চ সুদ, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদে আঁটকে যাওয়ার শঙ্কা আছে।
বৃহস্পতিবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) কার্যালয়ে মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুষ্ঠান ও সেমিনারে উপস্থাপিত প্রতিবেদন ও বক্তাদের বক্তব্যে এমন পর্যবেক্ষণ ও শঙ্কার কথা উঠে এসেছে। রাজধানীর বনানীতে পিআরআই কার্যালয়ে সেমিনারের যৌথ আয়োজক ছিল পিআরআই-এর সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যানালাইসিস (সিএমইএ) ও অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিফ্যাট। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্যবসায়ী নেতা আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ। সভাপতিত্ব করেন পিআরআই-এর চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান।
পিআরআই-এর মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ উন্নতি এবং মূল্যস্ফীতি কমার ফলে অর্থনীতিতে সাময়িক স্বস্তি ফিরেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ অনীহা, ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক আস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে।
২৫ বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চে উন্নীত হওয়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা, কার্যকর ঋণ পুনর্গঠন কাঠামো ও দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ জরুরি বলে মত দেওয়া হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সরকার জ্বালানির দাম বাড়িয়েও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। ২০২২ সালের পর জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। আমরা (ব্যবসায়ী) চিৎকার করলেও সরকার শুনছে না। এ ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, শক্তিশালী নীতি কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল, দক্ষতা উন্নয়ন, কার্যকর এনবিআর এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার বলেন, মে থেকে বাড়তে থাকা রিয়েল ইফেকটিভ এক্সচেঞ্জ রেট রপ্তানিনির্ভর খাতের জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আর ডলার কিনে টাকার মান কমাতে পারছে না। তাই আমদানি শিথিল করাই বাস্তবসম্মত পথ বলে মত দেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা কখনও এত বড় সংকটে পড়েনি। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ আরও বেশি। প্রকৃত খেলাপি ঋণ বেড়ে ৯ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে বলে আশঙ্কা আছে।
উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতে ঋণ সংকটের ঝুঁকি তৈরি করে এবং বিনিয়োগকে দুর্বল করে। অন্তত ১৬টি ব্যাংক নতুন করে ঋণ দিতে পারছে না। ঋণ প্রবৃদ্ধি কমায় বিনিয়োগ কমছে, বেকারত্ব বাড়ছে এবং উন্নয়ন মন্থর হচ্ছে। এটা সামাল দিতে যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে বাংলাদেশ উচ্চ সুদ, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি,নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন পিআরআই প্রধান অর্থনীতিবিদ।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, করনীতি আমলা নয়, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের নির্ধারণ করা উচিত।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. একেএম আতিউর রহমান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান না হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত আকার কখনও জানা যেত না।
ড. শাদাত বলেন, সৎ করদাতারা শাস্তি পাচ্ছেন বলে অর্থনীতির ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক রয়ে গেছে।
অনলাইন ডেস্ক 






















