০৪:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

জাতিসংঘের বাইরের কোনো নির্দেশনা নেব না: খলিলুর রহমান

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংস্থার বাইরে কোনো সরকার বা অন্য কোনো উৎসের নির্দেশনা গ্রহণ করবেন না বলে দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘের সনদ, সাধারণ পরিষদের সভাপতির আচরণবিধি এবং সংস্থার স্বার্থকে সামনে রেখেই তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় এ অঙ্গীকার করেন খলিলুর রহমান। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে তাঁর এক বছরের দায়িত্বকাল। ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে চলবে আগামী বছরের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

শপথবাক্যে খলিলুর রহমান বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কার্যাবলি পূর্ণ আনুগত্য, বিচক্ষণতা, বিবেক ও সততার সঙ্গে পালন করবেন। জাতিসংঘের সনদ ও সভাপতির আচরণবিধির আলোকে শুধু জাতিসংঘের স্বার্থেই এসব দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সংস্থার বাইরের কোনো সরকার বা অন্য কোনো উৎসের কাছে নির্দেশনা চাইবেন না কিংবা গ্রহণ করবেন না।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

দায়িত্ব গ্রহণের আগে ও পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন তা নজিরবিহীনভাবে পরীক্ষার মুখে পড়েছে। তবে সংকটের পাশাপাশি নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে তিনি ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন।

নতুন সভাপতি জানান, তাঁর এক বছরের মেয়াদে সংলাপ, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমঝোতার জায়গা খুঁজে বের করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সমানভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তাঁকে যারা ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি—সবার জন্যই তিনি একইভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। মতপার্থক্য থাকলেও যেখানে অভিন্ন অবস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে, সেখানে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

জাতিসংঘের প্রতি মানুষের ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা পুনর্গঠনকে তাঁর সভাপতিত্বের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন খলিলুর রহমান। তিনি জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ও উপযোগী করে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সংস্কারের মাধ্যমে এমন একটি কার্যকর বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলো আবারও জাতিসংঘের ওপর আস্থা রেখে যৌথভাবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে পারে।

জাতিসংঘের সংস্কারের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের সনদ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ নিশ্চিত করতেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের কাছে ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক মহাসচিব নির্বাচন-সংক্রান্ত চলমান প্রক্রিয়ার দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন।

রোহিঙ্গা সংকটও খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের সংকট আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা এবং তাদের বিষয়ে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে তিনি ভূমিকা রাখার প্রত্যয় জানিয়েছেন। জাতিসংঘে তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সংকটাপন্ন ও রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো আলোচনায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

চার দশক পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে আবারও কোনো বাংলাদেশি দায়িত্ব নিলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এ দায়িত্ব পালন করেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। এবার খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এ মর্যাদাপূর্ণ পদে বাংলাদেশ প্রতিনিধিত্ব পেল।

গত ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পান ৯১ ভোট। মোট ১৯০টি ভোট পড়েছিল এবং কোনো ভোট বাতিল বা বিরত ছিল না। জাতিসংঘের আঞ্চলিক ঘূর্ণনব্যবস্থা অনুযায়ী এবার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সভাপতির পদ নির্ধারিত ছিল।

খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ এমন এক সময়ে হলো, যখন যুদ্ধ-সংঘাত, মানবিক সংকট, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি নিয়ে জাতিসংঘকে একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে তাঁর এক বছরের সভাপতিত্বে সাধারণ পরিষদের কার্যকারিতা বাড়ানো, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করাই বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতিসংঘের বাইরের কোনো নির্দেশনা নেব না: খলিলুর রহমান

প্রকাশিত : ১২:৫৮:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংস্থার বাইরে কোনো সরকার বা অন্য কোনো উৎসের নির্দেশনা গ্রহণ করবেন না বলে দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘের সনদ, সাধারণ পরিষদের সভাপতির আচরণবিধি এবং সংস্থার স্বার্থকে সামনে রেখেই তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় এ অঙ্গীকার করেন খলিলুর রহমান। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে তাঁর এক বছরের দায়িত্বকাল। ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে চলবে আগামী বছরের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

শপথবাক্যে খলিলুর রহমান বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কার্যাবলি পূর্ণ আনুগত্য, বিচক্ষণতা, বিবেক ও সততার সঙ্গে পালন করবেন। জাতিসংঘের সনদ ও সভাপতির আচরণবিধির আলোকে শুধু জাতিসংঘের স্বার্থেই এসব দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সংস্থার বাইরের কোনো সরকার বা অন্য কোনো উৎসের কাছে নির্দেশনা চাইবেন না কিংবা গ্রহণ করবেন না।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

দায়িত্ব গ্রহণের আগে ও পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘ ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন তা নজিরবিহীনভাবে পরীক্ষার মুখে পড়েছে। তবে সংকটের পাশাপাশি নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশকে তিনি ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন।

নতুন সভাপতি জানান, তাঁর এক বছরের মেয়াদে সংলাপ, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমঝোতার জায়গা খুঁজে বের করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সমানভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, তাঁকে যারা ভোট দিয়েছেন এবং যারা দেননি—সবার জন্যই তিনি একইভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। মতপার্থক্য থাকলেও যেখানে অভিন্ন অবস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে, সেখানে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

জাতিসংঘের প্রতি মানুষের ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা পুনর্গঠনকে তাঁর সভাপতিত্বের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন খলিলুর রহমান। তিনি জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ও উপযোগী করে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সংস্কারের মাধ্যমে এমন একটি কার্যকর বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলো আবারও জাতিসংঘের ওপর আস্থা রেখে যৌথভাবে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করতে পারে।

জাতিসংঘের সংস্কারের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের সনদ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ নিশ্চিত করতেও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানের কাছে ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক মহাসচিব নির্বাচন-সংক্রান্ত চলমান প্রক্রিয়ার দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন।

রোহিঙ্গা সংকটও খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের সংকট আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা এবং তাদের বিষয়ে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারে তিনি ভূমিকা রাখার প্রত্যয় জানিয়েছেন। জাতিসংঘে তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সংকটাপন্ন ও রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর বিষয়গুলো আলোচনায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

চার দশক পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে আবারও কোনো বাংলাদেশি দায়িত্ব নিলেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এ দায়িত্ব পালন করেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। এবার খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এ মর্যাদাপূর্ণ পদে বাংলাদেশ প্রতিনিধিত্ব পেল।

গত ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পান ৯১ ভোট। মোট ১৯০টি ভোট পড়েছিল এবং কোনো ভোট বাতিল বা বিরত ছিল না। জাতিসংঘের আঞ্চলিক ঘূর্ণনব্যবস্থা অনুযায়ী এবার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সভাপতির পদ নির্ধারিত ছিল।

খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ এমন এক সময়ে হলো, যখন যুদ্ধ-সংঘাত, মানবিক সংকট, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বৈষম্য এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি নিয়ে জাতিসংঘকে একাধিক জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ফলে তাঁর এক বছরের সভাপতিত্বে সাধারণ পরিষদের কার্যকারিতা বাড়ানো, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতাকে আরও কার্যকর করাই বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।