ডিজিটাল পরিবর্তনের সাথে সাথে জ্ঞানের যে ব্যাপ্তি ঘটছে প্রতিনিয়ত, তার মধ্যে ওপেন এক্সেস প্রকাশনা একাডেমিক প্রকাশনার সবচেয়ে যুগোপযোগী বিপ্লবীক পরিবর্তনগুলির মধ্যে একটি, যা গবেষক, শিক্ষার্থী এবং যে কেউ, কোন সীমাবদ্ধতা ছাড়াই একাডেমিক জার্নাল নিবন্ধ সহ যেকোনো ধরনের প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধ, প্রবন্ধ, রচনা, কনফারেন্স পেপার, থিসিস, বইয়ের অংশবিশেষ, বিভিন্ন চিত্রসহ জ্ঞান—বিজ্ঞানে ব্যবহৃত তথ্যসমূহ, সাহিত্যে বিনামূল্যে বিশেষ প্রবেশাধিকার অধিকার বোঝায়। গতানুগতিকপদ্ধতির বিপরীতে, ওপেন এক্সেস ব্যবহারকারীদের আর্থিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়া পুস্তক পড়তে, ডাউনলোড করতে এবং শেয়ার করে নিতে সক্ষম। ওপেন এক্সেস (SPARC) এসপিএআরসি নীতির অধীনে প্রকাশনা কেবল একাডেমিক সম্প্রদায়ের জন্যই নয়, বরং বৃহত্তর সমাজের জন্যও একটি আশীর্বাদ। ১৯৯০—২০০০ দশকে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের উন্মুক্ত প্রবেশ বৃদ্ধি পেলে, ওপেন এক্সেস আন্দোলন জনপ্রিয়তা পায়।
ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধিনে ওপেন এক্সেস প্রবেশাধিকার প্রক্রিয়া ও প্রকৃতি নির্ধারিত হয়, সাথে কপিরাইটের জন্য উন্মুক্ত লাইসেন্স প্রয়োগ করে অনুলিপি বা পুনঃব্যবহারে বাধা হ্রাস বা সরিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত ওপেন এক্সেস ব্যবহার দুইভাবে হয়ে থাকে গ্র্যাটিস নামে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার বিনামূল্যে অনলাইনে যেকোনো নিবন্ধের ব্যবহার, আর লিবরে বলতে বোঝায় বিনেমূল্যে অনলাইনে তথ্য প্রবেশ ও ব্যবহারের বিশেষ অধিকার। ২০০৩ সালে বার্লিন ঘোষণা অনুসারে লিবরে, দুইভাবে লেখকরা তাদের নিবন্ধ-প্রবন্ধে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার প্রদান করা হয়, গ্রীন ওপেন এক্সেস বা সবুজ উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার পদ্ধতিতে লেখক নিজেই তার রচনা ওপেন এক্সেস সংশ্লিস্ট ওয়েবে সংরক্ষণ করতে পারবেন। এছাড়াও গোল্ড ওপেন এক্সেসের মাধ্যমে ওপেন এক্সেস জার্নালে লেখা প্রকাশ করা যাবে। বাংলাদেশে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার, উন্মুক্ত তথ্য ও উন্মুক্ত শিক্ষার প্রসারের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করার স্বপ্ন ওপেন এক্সেস বাংলাদেশ ২০১৭ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু করে। ওপেন এক্সেস বাংলাদেশের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষিত ও গবেষণামূলক সমাজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকারকে জনপ্রিয় করে তোলা।
ওপেন এক্সেস প্রকাশনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্র্ণ সুবিধা হল, সমসাময়িক বিশ্বের তথ্য প্রবেশাধিকার। আগে একাডেমিক পুস্তক প্রবেশাধিকার শুধুমাত্র সেই সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং গবেষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল যারা ব্যয়বহুল জার্নাল সাবস্ক্রিপশন নিতে সক্ষম হত, ফলে যাদের সাবস্ক্রিপশন ফি তুলনামূলকভাবে কম, বিশেষ করে নিন্মআয়ের দেশগুলিতে, তাদের মধ্যে একটি ডিজিটাল বিভাজন তৈরি হয়েছিল। ওপেন এক্সেস এই আর্থিক বাধা কমাতে সাহায্য করছে কারণ যেকেউ ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে গবেষণায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসা এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ওপেন এক্সেস প্রকাশনা আর্থিকভাবে সীমাবদ্ধ গবেষকদের সহজেই উন্নয়নের সাথে তাল মেলাতে সাহায্য করছে। তাছাড়া গবেষকদের আরও বৈশ্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি, সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে তাদের প্রকাশনা এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারী দেখিয়েছে যে দ্রুত গতিতে গবেষণা ভাগ করে নেওয়ার জন্য ওপেন এক্সেস কতটা জরুরি।
ওপেন এক্সেস প্রকাশনা কেবল গবেষকদেরই সাহায্য করে তাই নয়, বরং সুবিধাগুলি আরও অনেক সুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি শিক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে মানসম্পন্ন শিক্ষা উপকরণের ক্ষেত্রে। পাঠ্যপুস্তক এবং একাডেমিক জার্নালগুলি প্রায়শই ব্যয়বহুল, ফলে শিক্ষার্থীদের তাদের বিষয়গুলির গভীর অধ্যয়ন ব্যাহত হয়। মানসম্পন্ন একাডেমিক তথ্য উপাত্ত বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার নীতি, ওপেন এক্সেস এই সমস্যার সমাধানে ব্যাপকভাবে অবদান রাখে, বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীদের সুযোগ সমান করে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিও লাভবান হয়, এটি গ্রন্থাগারগুলিকে তহবিল সঠিকভাবে বরাদ্দকে সক্ষম করে তুলছে। জার্নাল সাবস্ক্রাইব করতে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ করার পরিবর্তে, তারা অন্যান্য শিক্ষাগত সম্পদ, গবেষণা পরিকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পরিষেবাগুলিতে আরও বিনিয়োগ করতে পারে। ওপেন এক্সেস তৈরি করার জন্য প্রায় ডজনখানেক প্যাকেজ বা সফটওয়্যার রয়েছে, যেগুলা একাডেমিক তথ্য-উপাত্তগুলা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজ বা সফটওয়্যারগুলো হল ইপ্রিন্টস (সাউথাম্পটন ইউনিভার্সিটি), ডিস্পেস (এমআইটি), সিডিএসওয়্যার (সিইআরএন) এবং ফেডোরা (কর্নেল এবং ইউ অব ভার্জিনিয়া) ও ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে অনুষদ এবং প্রশাসনিক সমর্থন প্রয়োজন যেখানে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এটি প্রয়োগে করে সফল হচ্ছে। এইভাবে, ওপেন এক্সেস একটি একাডেমিক ইকোসিস্টেমের স্থায়িত্বে অবদান রাখছে।

ওপেন এক্সেস সুস্পষ্ট সুবিধা থাকা সত্ত্বেও, এ পদ্ধতির কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে, অধিকাংশের ওপেন এক্সেস জার্নালগুলির আর্থিক স্থায়িত্বের সাথে সাথে, নিবন্ধ প্রক্রিয়াকরণ ফি (এপিসি) নিয়ে থাকে, যেহেতু স্বল্পআয় ও উন্নয়নশীল দেশের বেশিরভাগই লেখকের জন্য ব্যয়বহুল। এটি বিকল্প অর্থায়ন মডেল যেমন প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন, সরকারি অর্থায়ন, বা বৈশ্বিক সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টার আহ্বান জানানো, যাতে করে ওপেন এক্সেস একটি টেকসই মডেল হিসাবে টিকে থাকে। অতিরিক্ত উদ্বেগের বিষয় হল, তথাকথিত প্রিডেটরি জার্নালের উত্থান, যারা ওপেন এক্সেসকে শোষণ করে লেখকদের কাছ থেকে প্রকাশনার জন্য অর্থ নেয়, অথচ নাম মাত্র সামান্য বা কোন পিয়ার রিভিউ বা সম্পাদকীয় পরিষেবা প্রদান করে থাকে। এটি ওপেন এক্সেস প্রকাশনার গুণমান এবং সততা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে। এইভাবে, স্বচ্ছতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তিশালী পিয়ার রিভিউকে সমর্থন করা প্রয়োজন যদি ওপেন এক্সেস জার্নালের প্রতি আস্থা রাখতে হয় !
ওপেন এক্সেস প্রকাশনা বৈশ্বিক একাডেমিক ও গবেষণা সম্প্রদায়ের জন্য একটি আশীর্বাদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। উন্মুক্ততার দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে জ্ঞানকে অবাধ বিচরণ ও মুক্তকরণ, উদ্ভাবনকে গতিশীল এবং শিক্ষাগত বৈষম্য দূর করে যদিও ওপেন এক্সেস জার্নালের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং গুণমান নিশ্চিত করা দরকার। ওপেন এক্সেসের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান, তবুও সুবিধাগুলি অনেক বেশি। আমরা সবাই একটি উন্মুক্ত এবং সংহতি বিশ্বের দিকে অগ্রসর হব, যেখানে ওপেন এক্সেস তথ্য ও জ্ঞানকে সর্বজনীনকরণ এবং গবেষক, শিক্ষার্থী, নীতিনির্ধারক এবং জনসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। বিশেষভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী জাতীয় কমিটির সহায়তায় ওপেন এক্সেস বাংলাদেশ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা অব্যাহত রাখবে।
লিখেছেন : আফরিন সুলতানা
সিনিয়র সহকারি লাইব্রেরিয়ান
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
ও
মো. আব্দুল লতিফ
সহকারি লাইব্রেরিয়ান
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
অনলাইন ডেস্ক 

























