পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (পিএসও) আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি (আইটিসি)–এর কিউ-ক্যাশ সিস্টেমে কারিগরি জটিলতার কারণে দেশের ৩৩টি ব্যাংকের এটিএম, সিআরএম ও কার্ডভিত্তিক লেনদেনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা বন্ধ রয়েছে। কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব ব্যাংকের কোটি গ্রাহক। বিশেষ করে মাসের শুরুতে বেতন-ভাতা পাওয়ার পর এটিএম থেকে টাকা তুলতে না পেরে অনেক গ্রাহককে শাখায় ছুটতে হয়েছে।
আইটিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কিউ-ক্যাশ সিস্টেমের আধুনিকায়ন ও ডেটা স্থানান্তরের কাজের কারণে ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত এসব সেবা বন্ধ থাকবে। তবে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের অভিযোগ, লেনদেন বন্ধের আগে তাদের যথাযথভাবে জানানো হয়নি। ফলে গ্রাহকদের কাছে ব্যাংকগুলোকেই জবাবদিহি করতে হচ্ছে।
বন্ধ থাকা সেবার মধ্যে রয়েছে এটিএম ও সিআরএম থেকে টাকা উত্তোলন, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন, তহবিল স্থানান্তর, ই-কমার্স এবং বাংলাপে-সংক্রান্ত আইবিএফটিএন, বাংলা কিউআর ও এনপিএসবি সেবা।
হঠাৎ করে এসব সেবা বন্ধ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি ও বিদেশগামী গ্রাহকরা, যারা দ্বৈত মুদ্রার ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে দেশের চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশও সমস্যায় পড়েছেন। মাসের শুরুতে বেতন ব্যাংক হিসাবে জমা হলেও এটিএম থেকে টাকা তুলতে না পেরে অনেকে শাখায় গিয়ে নগদ অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
ঘটনাটিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা। তাদের ভাষ্য, কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের এটিএম ও ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া নজিরবিহীন। এতে আইটিসির কারিগরি সমস্যার দায় ব্যাংকগুলোর ওপর পড়ছে এবং গ্রাহকদের কাছে ব্যাংকের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করেছেন কয়েকটি ব্যাংকের নির্বাহী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ব্যাংকের কোনো সেবা বন্ধ রাখতে হলে সেটি দুই-তিনদিন আগে গ্রাহকদের জানাতে হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের এটিএম বুথসহ ডিজিটাল লেনদেন বন্ধের বিষয়ে আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’ তিনি জানান, বিষয়টি তদন্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আইটিসি বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর। প্রতিষ্ঠানটির কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কে অন্তত ৩৩টি ব্যাংক যুক্ত রয়েছে। এসব ব্যাংকের প্রায় ছয় হাজার শাখা এ নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে বলে আইটিসির তথ্য। কিউ-ক্যাশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর এটিএম ও পিওএস টার্মিনাল পরিচালিত হয়।
আইটিসির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কে যুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ কৃষি, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে আইএফআইসি, যমুনা, উত্তরা, মার্কেন্টাইল, ট্রাস্ট, বাংলাদেশ কমার্স, ব্যাংক এশিয়া, মিডল্যান্ড, কমিউনিটি, ওয়ান, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, মেঘনা, মধুমতি, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, এনআরবিসি, শাহ্জালাল ইসলামী, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, এসবিএসি, স্ট্যান্ডার্ড, ইউনিয়ন, এনসিসি, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ও সিটিজেন্স ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে উরি ব্যাংক ও ব্যাংক আলফালাহ।
গত ৪ অক্টোবর রাত ১০টার পর গ্রাহকদের মোবাইলে পাঠানো বার্তায় বলা হয়, কিউ-ক্যাশ সিস্টেম স্থানান্তরের কারণে ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত এটিএম, সিআরএম, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, তহবিল স্থানান্তর, ই-কমার্স এবং বাংলাপে সেবা বন্ধ থাকবে।
তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, সেবা বন্ধ হওয়ার পরই তাদের মোবাইলে এ বার্তা পৌঁছেছে। কারওয়ান বাজারে এটিএম থেকে টাকা তুলতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া গ্রাহক সাইফুল আলম বলেন, রাতে জরুরি প্রয়োজনে টাকা তুলতে গিয়ে একাধিক ব্যাংকের বুথে চেষ্টা করেও টাকা পাননি। পরে মোবাইলে জানতে পারেন, ১০ অক্টোবর পর্যন্ত এটিএম সেবা বন্ধ থাকবে।
আইটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সাইফুদ্দিন মুনির বলেন, ‘বাংলা কিউআর কোডসহ আধুনিক পেমেন্ট সেবা যুক্ত করতে আমরা কিউ-ক্যাশ সিস্টেমের আধুনিকায়ন করছি। আগামী ২৮ তারিখ থেকে নতুন সফটওয়্যারে ডেটা স্থানান্তরের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিদ্যমান সফটওয়্যার অতিরিক্ত চাপ নিতে না পারায় রোববার রাতেই কাজ শুরু করতে হয়েছে।’
আগে থেকে না জানিয়ে এতগুলো ব্যাংকের লেনদেন বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিস্টেম আপগ্রেডেশনের বিষয়টি আমরা সব পক্ষকে জানিয়েছি। ৩ অক্টোবর প্রথমে এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশের নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়। এরপর ৪ অক্টোবর ব্যাংকগুলোর নেটওয়ার্ক স্থগিত করা হয়েছে। গ্রাহকদের আরও আগে বার্তা দিলে ভালো হতো। আশা করছি আগামী বৃহস্পতি-শুক্রবারের মধ্যে লেনদেন স্বাভাবিক করা যাবে।’
তবে ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, আইটিসির পক্ষ থেকে তাদের আগে থেকে কার্যকর কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি। একটি পেমেন্ট অবকাঠামোর কারিগরি জটিলতায় একসঙ্গে ৩৩টি ব্যাংকের এটিএম ও ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় শুধু গ্রাহকসেবা নয়, দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় ধরনের সিস্টেম পরিবর্তন বা রক্ষণাবেক্ষণের আগে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে ব্যাংক ও গ্রাহকদের অবহিত করা এবং বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
অনলাইন ডেস্ক 























