বাংলাদেশ পুঁজিবাজারের ইতিহাসে আরেকটি নজিরবিহীন এবং নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটে গেল। তীব্র বিতর্ক, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লাগাতার আন্দোলন এবং বাজারের ধারাবাহিক পতনের মুখে অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ এবং তার নেতৃত্বাধীন পুরো কমিশনার প্যানেল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ নেতৃত্বে যে পরিবর্তন এসেছিল, তা মাত্র কয়েক মাসের মাথায় আবারও ভেঙে পড়ল। এই চরম অস্থিরতার মধ্যেই বাজারের হাল ধরতে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন দেশের অত্যন্ত সুপরিচিত এবং অভিজ্ঞ করপোরেট ব্যক্তিত্ব মাসুদ খান। শীর্ষ পদের এই আকস্মিক রদবদলকে কেন্দ্র করে ধুঁকতে থাকা পুঁজিবাজারে একদিকে যেমন নতুন আশার আলো দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি রয়ে গেছে একঝাঁক কঠিন চ্যালেঞ্জ ও চরম সতর্কবার্তা, যা পুরো বাজার ব্যবস্থাকে একটি নতুন সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই আমূল পরিবর্তন মূলত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং অনাস্থারই সরাসরি বহিঃপ্রকাশ। বিদায়ী চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদের মেয়াদে বাজারের ধারাবাহিক পতন এবং কার্যকর নীতিমালার অভাব বিনিয়োগকারীদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, আগের কমিশন বাজারের তারল্য সংকট সমাধান বা কারসাজি চক্র দমনে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে পুরো কমিশনের পদত্যাগ বাজারকে একটি বার্তা দিল যে, বিনিয়োগকারীদের সেন্টিমেন্ট এবং আস্থা রক্ষা না করে পুঁজিবাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়। নেতৃত্বের এই পতন যেমন বাজারের একটি অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে, তেমনি এটি প্রমাণ করেছে যে বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবশ্যই জবাবদিহিমূলক এবং স্বাধীন হতে হবে।
নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ খানের আগমন বিনিয়োগকারীদের মনে একটি শক্তিশালী আশার বার্তা এবং নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। করপোরেট সুশাসন, আর্থিক খাতের গভীর সংস্কার এবং বহুজাতিক কোম্পানিতে দীর্ঘ কর্মজীবনের কারণে মাসুদ খানের বাজারে একটি পরিচ্ছন্ন ও হেভিওয়েট ভাবমূর্তি রয়েছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বাজারে যে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দেখে আসছিলেন, নতুন এই দক্ষ নেতৃত্বের হাত ধরে তা কঠোরভাবে দমন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তার মতো একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বের নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা বাজারের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে, যা দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে বাজারকে আবার ঊর্ধ্বমুখী করার প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।
তবে আশার এই জোয়ারের মাঝেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য রয়েছে চরম সতর্কবার্তা এবং অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় পা ফেলার নির্দেশনা। একজন ব্যক্তির পরিবর্তনেই রাতারাতি জাদুর মতো বাজারের সব ক্ষত নিরাময় হয়ে যাবে না বা সূচক হুহু করে বাড়বে না। বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম, জাঙ্ক শেয়ারের দাপট এবং তারল্যের যে তীব্র খরা বাজারে চলছে, তা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়ে বাজার বুঝতে এবং নতুন কৌশল সাজাতে কিছুটা সময় নেবে, যার কারণে সাময়িকভাবে নীতি নির্ধারণে ধীরগতি দেখা যেতে পারে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কারসাজি চক্র বা ফায়দা লুটাকারীরা বাজারকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। তাই হুজুগে মেতে, গুজবে কান দিয়ে বা কোনো নির্দিষ্ট শেয়ারের পেছনে অন্ধের মতো ছুটে হুটহাট বিনিয়োগ করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।
বাজারের বর্তমান গভীর সংকট কাটিয়ে তুলতে নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সামনে এখন পর্বতসম চ্যালেঞ্জ ও কঠিন অগ্নিপরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তার প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে বাজারে জরুরি ভিত্তিতে তারল্য সরবরাহ বাড়ানো এবং কৃত্রিমভাবে সূচক ধরে রাখার নোংরা খেলা বন্ধ করা। বিগত দিনে যেসব দুর্বল ও ভুয়া কোম্পানি বাজারে এসে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা লুটে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। একই সাথে, ভালো মৌল ভিত্তির সরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্ত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার আমূল সংস্কার করতে হবে। আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা এবং কারসাজির সাথে জড়িতদের রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনাই হবে নতুন চেয়ারম্যানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সামগ্রিক বাজার বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, নেতৃত্বের এই রদবদল বাংলাদেশ পুঁজিবাজারের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এবং নতুন মোড়। এই পরিবর্তনকে সফল করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারী—সব পক্ষকেই অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের এই মুহূর্তে চরম ধৈর্য ধারণ করে শুধুমাত্র ভালো লভ্যাংশ দেয় এবং সুশাসন বজায় রাখে এমন কোম্পানিতে বিনিয়োগ ধরে রাখতে হবে। নতুন নেতৃত্ব যদি কোনো ধরনের চাপের মুখে আপস না করে স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তবেই এই নেতৃত্ব পরিবর্তন পুঁজিবাজারের জন্য সত্যিকারের সুদিন এবং একটি টেকসই, বৈষম্যহীন ও শক্তিশালী বাজারের ভিত্তি তৈরি করবে।
দেশ সমাচার/ ইয়াসিন,
ইয়াসিন 
















