০৪:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

তরুণ পাঠক, গ্রন্থাগার ও জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত : ০২:২৯:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • 479

আমরা সকলেই জানি, পাবলিক ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গ্রন্থাগার শিশুদের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের জন্য গ্রন্থাগার শুধু বই পড়ার জায়গাই নয়, বরং কল্পনা, সৃজনশীলতা ও জ্ঞানচর্চার এক প্রাণবন্ত কেন্দ্র। অনেক গ্রন্থাগারে শিশুদের আকৃষ্ট করতে নিয়মিত গল্পপাঠ, পাঠচক্র কিংবা বিশেষ পাঠ কার্যক্রম আয়োজন করা হয়। কোথাও কোথাও অভিভাবক ও শিশুদের জন্য যৌথ কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়, যা সবাইকে আনন্দের সঙ্গে শেখার সুযোগ দেয়। এ কারণেই গ্রন্থাগারগুলোর মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে সেগুলো পাঠকদের অনুপ্রাণিত ও আলোকিত করতে পারে।

একটি আদর্শ গ্রন্থাগারে শিশুদের জন্য নানা ধরনের বই সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন—ছবির বই, কমিক্স, কবিতা, বিজ্ঞানভিত্তিক গ্রন্থ, উপন্যাস কিংবা গ্রাফিক বই। পাশাপাশি গ্রন্থাগারের পরিবেশ হতে হবে বন্ধুসুলভ ও ব্যবহারকারী-বান্ধব। শিশুদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ঘরে বসেও নেওয়া যেতে পারে কিছু সৃজনশীল উদ্যোগ। নিজ হাতে বই তৈরি করার অভিজ্ঞতা শিশুদের জন্য দারুণ আনন্দদায়ক হতে পারে। রঙিন কাগজ, পেন্সিল, মার্কার কিংবা সুতা ব্যবহার করে গল্প বা ছবি দিয়ে বই তৈরি করলে তাদের কল্পনাশক্তি বাস্তব রূপ পায়। এতে একদিকে যেমন স্ক্রিন টাইম কমে, অন্যদিকে বইয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।

শিশুদের বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবকরা চাইলে ছোট পরিসরে বইপড়া ক্লাব বা শিশুদের বইমেলার আয়োজন করতে পারেন। সন্তানের প্রিয় বন্ধু ও তাদের অভিভাবকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সবাই মিলে বই নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। যখন শিশুরা অন্যদের মুখে প্রিয় বইয়ের প্রশংসা শোনে, তখন তারাও নতুন বই অন্বেষণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত মাসিক বা সাপ্তাহিক চালু রাখা হলে শিশুরা খুব দ্রুত বইয়ের পৃষ্ঠায় ডুবে যেতে শেখে।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

এ ছাড়া ঘরের মধ্যেই কিছু চাদর বা শাড়ি বেঁধে ছোট একটি পড়ার ঘর বা তাঁবু তৈরি করা যেতে পারে। এমন নিজস্ব পাঠকোণ শিশুদের জন্য শুধু আনন্দের জায়গা নয়, বরং বই ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর এক অন্তরঙ্গ পরিবেশ সৃষ্টি করে। তারা নিজেদের তৈরি করা এই জায়গা নিয়ে গর্ববোধ করে এবং সেখানে বই পড়তে আরও আগ্রহী হয়।

গ্রন্থাগারের আরামদায়ক পরিবেশে শিশুরা পাঠক ক্লাবে অংশ নিতে পারে, নতুন শব্দ শিখতে পারে, বন্ধুদের সঙ্গে প্রিয় গল্প নিয়ে মতবিনিময় করতে পারে এবং ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ আবিষ্কার করে। বইয়ের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তাদের সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং শেখার প্রতি আজীবন ভালোবাসা গড়ে তোলে। জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর পাঠ, বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে সমালোচনামূলকভাবে যুক্ত হওয়া এবং নিজস্ব মতামত গড়ে তুলে তা স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার সুযোগ।

জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অবহেলা, অব্যবস্থাপনা এবং দূরদর্শিতা ও সম্পদের অভাবে আমাদের দেশের অনেক গ্রন্থাগার ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এটি বাংলাদেশের উন্নত ভবিষ্যৎ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যের পরিপন্থী। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত গ্রন্থাগার সংস্কৃতি, যা পাঠাভ্যাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে উৎসাহিত করবে।

৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষ্যে আমাদের দাবি—সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় যেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রসহ দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারকে যথাযথভাবে সজ্জিত করে এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করে। এই দিবস যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং এর মধ্য দিয়ে একটি টেকসই, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের বাস্তব অঙ্গীকার প্রতিফলিত হোক।

লেখা : আফরিন সুলতানা, সিনিয়র সহকারী গ্রন্থাগারিক, ডঃ এস. আর. লস্কর লাইব্রেরি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

তরুণ পাঠক, গ্রন্থাগার ও জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস

প্রকাশিত : ০২:২৯:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

আমরা সকলেই জানি, পাবলিক ও শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গ্রন্থাগার শিশুদের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বিশেষ করে তরুণ পাঠকদের জন্য গ্রন্থাগার শুধু বই পড়ার জায়গাই নয়, বরং কল্পনা, সৃজনশীলতা ও জ্ঞানচর্চার এক প্রাণবন্ত কেন্দ্র। অনেক গ্রন্থাগারে শিশুদের আকৃষ্ট করতে নিয়মিত গল্পপাঠ, পাঠচক্র কিংবা বিশেষ পাঠ কার্যক্রম আয়োজন করা হয়। কোথাও কোথাও অভিভাবক ও শিশুদের জন্য যৌথ কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়, যা সবাইকে আনন্দের সঙ্গে শেখার সুযোগ দেয়। এ কারণেই গ্রন্থাগারগুলোর মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে সেগুলো পাঠকদের অনুপ্রাণিত ও আলোকিত করতে পারে।

একটি আদর্শ গ্রন্থাগারে শিশুদের জন্য নানা ধরনের বই সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন—ছবির বই, কমিক্স, কবিতা, বিজ্ঞানভিত্তিক গ্রন্থ, উপন্যাস কিংবা গ্রাফিক বই। পাশাপাশি গ্রন্থাগারের পরিবেশ হতে হবে বন্ধুসুলভ ও ব্যবহারকারী-বান্ধব। শিশুদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে ঘরে বসেও নেওয়া যেতে পারে কিছু সৃজনশীল উদ্যোগ। নিজ হাতে বই তৈরি করার অভিজ্ঞতা শিশুদের জন্য দারুণ আনন্দদায়ক হতে পারে। রঙিন কাগজ, পেন্সিল, মার্কার কিংবা সুতা ব্যবহার করে গল্প বা ছবি দিয়ে বই তৈরি করলে তাদের কল্পনাশক্তি বাস্তব রূপ পায়। এতে একদিকে যেমন স্ক্রিন টাইম কমে, অন্যদিকে বইয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।

শিশুদের বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবকরা চাইলে ছোট পরিসরে বইপড়া ক্লাব বা শিশুদের বইমেলার আয়োজন করতে পারেন। সন্তানের প্রিয় বন্ধু ও তাদের অভিভাবকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে সবাই মিলে বই নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। যখন শিশুরা অন্যদের মুখে প্রিয় বইয়ের প্রশংসা শোনে, তখন তারাও নতুন বই অন্বেষণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত মাসিক বা সাপ্তাহিক চালু রাখা হলে শিশুরা খুব দ্রুত বইয়ের পৃষ্ঠায় ডুবে যেতে শেখে।

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

এ ছাড়া ঘরের মধ্যেই কিছু চাদর বা শাড়ি বেঁধে ছোট একটি পড়ার ঘর বা তাঁবু তৈরি করা যেতে পারে। এমন নিজস্ব পাঠকোণ শিশুদের জন্য শুধু আনন্দের জায়গা নয়, বরং বই ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর এক অন্তরঙ্গ পরিবেশ সৃষ্টি করে। তারা নিজেদের তৈরি করা এই জায়গা নিয়ে গর্ববোধ করে এবং সেখানে বই পড়তে আরও আগ্রহী হয়।

গ্রন্থাগারের আরামদায়ক পরিবেশে শিশুরা পাঠক ক্লাবে অংশ নিতে পারে, নতুন শব্দ শিখতে পারে, বন্ধুদের সঙ্গে প্রিয় গল্প নিয়ে মতবিনিময় করতে পারে এবং ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ আবিষ্কার করে। বইয়ের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তাদের সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং শেখার প্রতি আজীবন ভালোবাসা গড়ে তোলে। জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর পাঠ, বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে সমালোচনামূলকভাবে যুক্ত হওয়া এবং নিজস্ব মতামত গড়ে তুলে তা স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার সুযোগ।

জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, অবহেলা, অব্যবস্থাপনা এবং দূরদর্শিতা ও সম্পদের অভাবে আমাদের দেশের অনেক গ্রন্থাগার ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এটি বাংলাদেশের উন্নত ভবিষ্যৎ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যের পরিপন্থী। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও প্রাণবন্ত গ্রন্থাগার সংস্কৃতি, যা পাঠাভ্যাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে উৎসাহিত করবে।

৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষ্যে আমাদের দাবি—সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় যেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রসহ দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি গ্রন্থাগারকে যথাযথভাবে সজ্জিত করে এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করে। এই দিবস যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং এর মধ্য দিয়ে একটি টেকসই, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের বাস্তব অঙ্গীকার প্রতিফলিত হোক।

লেখা : আফরিন সুলতানা, সিনিয়র সহকারী গ্রন্থাগারিক, ডঃ এস. আর. লস্কর লাইব্রেরি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ।