১২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

ইনডেক্স এগ্রো: আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিল, করেছে শ্রম আইন লঙ্ঘনও!

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত : ১২:২৭:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • 3

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিল লক্ষ্য করা গেছে। শুধু কি তাই? কোম্পানিটির বিক্রয় রাজস্ব, নিট মুনাফা কমলেও কাঁচামালের মজুদ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের দক্ষতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও কোম্পানিটি বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ লঙ্ঘন করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বিবিধ খাতের কোম্পানি ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ সদ্য বিদায়ী বছরের (৩০ জুন ২০২৬) নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ফিন্যান্সিয়াল পজিশনের আট নাম্বার নোটে সহযোগি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্য মুনাফার পরিমাণ উল্লেখ করেছে দুই কোটি ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৭৯ টাকা। আর ‘প্রফিট অ্যান্ড লস’ অংশে উল্লেখ করেছে এক কোটি ২১ লাখ ৭০ হাজার ৫৬৮ টাকা। অর্থাৎ একই বছরের একই আর্থিক প্রতিবেদনে সহযোগি প্রতিষ্ঠান থেকে ইনডেক্স এগ্রোর প্রাপ্য মুনাফা ভিন্ন ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইনডেক্স এগ্রোর পাশাপাশি নিরীক্ষক খান ওয়াহাব শফিক রহমান অ্যান্ড কো. এর সততা  ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

 

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে ইনডেক্স এগ্রোর বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ১২ শতাংশ। গত বছর (৩০ জুন ২০২৫) কোম্পানির বিক্রয় রাজস্ব হয়েছিল ৪৪১ কোটি দুই লাখ ৩৭ হাজার ২৫৯ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩৮৮ কোটি ৯২ লাখ ১৩ হাজার ৫৩৩ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ৫২ কোটি ১০ লাখ ২৩ হাজার ৭২৬ টাকা।

সদ্য বিদায়ী বছরে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা কমেছে ২০ শতাংশ। গত বছর পরিচালন মুনাফা হয়েছিল ৭৩ কোটি ৩৯ লাখ ৫৫ হাজার ৯৬০ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫৮ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ৯০৭ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা কমেছে ১৪ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৫৩ টাকা। ইনডেক্স এগ্রোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, গত বছর কোম্পানির নিট মুনাফা হয়েছিল ২৬ কোটি ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮৯ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৫ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা কমেছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ ২১ হাজার ৬১৪ টাকা।

এদিকে গত বছর মার্কেটিং প্রমোশন বাবদ ইনডেক্স এগ্রোর ব্যয় হয়েছে ৮৩ লাখ ৬১ হাজার ৩১৩ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৬৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে কোম্পানির ব্যয় বেড়েছে এক কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ১৯ টাকা।

শুধু যে মার্কেটিং প্রমোশন বাবদ ব্যয় বেড়েছে তাই নয়, ইনডেক্স এগ্রোর সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয়ও বেড়েছে। গত বছর সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৬২৭ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ২৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে এক কোটি ৭ লাখ ১৯ হাজার ৪৩৬ টাকা।

সাধারণ যেকোনো কোম্পানি তার পণ্যের বিক্রয় ও মুনাফা বৃদ্ধি করার জন্য মার্কেটিং প্রমোশন, সেলিং, ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় বৃদ্ধি করে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় ইনডেক্স এগ্রোর মার্কেটিং প্রমোশন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২১৯ শতাংশ। আর সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় বেড়েছে ১২ শতাংশ। অথচ ঠিক একই সময়ে কোম্পানির নিট মুনাফা কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিক্রয় রাজস্বও যথেষ্ট কমেছে।

আবু জাফর আলি বলেন,  কোম্পানির বিক্রয় ও বিপণন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মার্কেটিং প্রমোশন বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনডেক্স এগ্রো কর্তৃক নগদ বিক্রয় পলিসিতে সাময়ীক পরিবর্তন আনার ফলে এই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে; তবে আগামীতে ক্রমান্বয়ে তা স্বাভবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, সত্যিই কি কোম্পানিটির মার্কেটিং প্রমোশনের পাশাপাশি ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় বেড়েছে নাকি এখানে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের রয়েছে কোনো দুরভিসন্ধি? বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উচিত খুব দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে এ ব্যাপারে সঠিক চিত্র বের করা এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, বিক্রয় রাজস্ব, পরিচালন মুনাফা, নিট মুনাফা কমলেও ইনডেক্স এগ্রো কাঁচামাল মজুদের পরিমাণ বাড়িয়েছে ১৯ কোটি টাকার বেশি।

গত বছর কাঁচামালের মজুদ ছিল ২৬২ কোটি ৬০ লাখ এক হাজার ৩৫৯ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ ৭২ হাজার ১১২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ইনডেক্স এগ্রোর কাঁচামালের মজুদ বেড়েছে ১৯ কোটি ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৩ টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক কোম্পানি সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে আর্থিক প্রতিবেদনে কাঁচামালের মজুদ বেশি দেখিয়ে থাকে। বাস্তবে তার চেয়ে কম পরিমাণে কাঁচামালের মজুদ থাকে। অর্থাৎ আর্থিক প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা হয়, তার সাথে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক দেখা যায়।

তারা আরও বলেন, সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে ইনডেক্স এগ্রো আর্থিক প্রতিবেদনে কাঁচামালের মজুদ বেশি উল্লেখ করেছে কি-না তা, সরেজমিনে গিয়ে দেখা উচিত বিএসইসির।

এদিকে সাধারণত কোম্পানিগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- ইনডেক্স এগ্রো ২০২১ সালে তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু তালিকাভুক্ত পরবর্তী এখন পর্যন্ত কোনো বছরই কোম্পানিটি ব্যবসার সম্প্রসারণ বা ক্যাপিটাল ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস বাবদ ব্যয় করেনি, আর্থিক প্রতিবেদন থেকে তা জানা গেছে।

এ ব্যাপারে ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কোম্পানি সচিব আবু জাফর আলি লিখিত বক্তব্যে দেশ সমাচারকে জানান, কোম্পানি বর্তমানে তার বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা, সম্পদ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

আমাদের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার, কাঁচামালের মূল্য, অর্থায়ন ব্যয় এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন বিবেচনায় নেওয়া হয়। ক্যাপিটাল ওয়ার্ক ইন প্রগেস (সিডব্লিউআইপি) মূলত চলমান নির্মাণ, স্থাপনা বা নির্দিষ্ট মূলধনী প্রকল্পে ব্যয়কৃত অর্থকে নির্দেশ করে। কোনো নির্দিষ্ট বছরে সিডব্লিউআইপি-তে ব্যয় না থাকা মানেই কোম্পানি তার ব্যবসায়িক উন্নয়ন বা বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ থেকে বিরত রয়েছে—এমন নয়।

কোম্পানি বর্তমানে বিদ্যমান অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহার, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে। বাজার পরিস্থিতি ও বিনিয়োগের উপযুক্ত সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হতে পারে।

গ্রাহকদের কাছ থেকে বিক্রিত পণ্যের অর্থ আদায় করতে হিমশিম খাচ্ছে ইনডেক্স এগ্রো। বর্তমানে কোম্পানির মোট রিসিভেবলসের পরিমাণ ৮৯ কোটি ৫২ লাখ ২৬ হাজার ৮৫৮ টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘদিনের বকেয়া কিছু পাওনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, জানিয়েছে নিরীক্ষক।

ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফান্ডে ৮ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ৭৭৬ টাকা রয়েছে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই ফান্ডের বার্ষিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়নি বলে নিরীক্ষক জানিয়েছে।

এছাড়াও ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে যে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে তা ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়নি বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিস (বিলস) এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ দেশ সমাচারকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে এসমস্ত কোম্পানি শ্রম আইন লঙ্ঘন করছে। এছাড়াও শ্রমিকদের এ ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণেও শ্রম আইন লঙ্ঘন করে থাকে কিছু কোম্পানি। সরকারের উচিত যে কোম্পানি শ্রম আইন লঙ্ঘন করবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিস্বরুপ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি কাজী মো. নজরুল দেশ সমাচারকে বলেন, কোম্পানিগুলোর গরমিল আর্থিক প্রতিবেদনের কারণেইতো পুঁজিবাজার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে। কমিশন, স্টক এক্সচেঞ্জ এ ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। কারণ কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জের অনেক অসৎ কর্মকর্তাও এর সাথে জড়িত থাকে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। ইনডেক্স এগ্রোর আর্থিক প্রতিবেদনে যদি কোনো গরমিল থেকে থাকে তবে, অবশ্যই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নিয়ন্ত্রক সংস্থার।

তিনি আরও বলেন, যে কোম্পানির মুনাফা কমেছে, সে কিভাবে কাঁচামালের মজুদ বৃদ্ধি করে? সম্পদ বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে যদি কোম্পানিটি এ ধরনের কাজ করে থাকে তবে, অবশ্যই এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বিএসইসির।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ও বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের (এফবিএস) ভারপ্রাপ্ত ডিন আল-আমিন দেশ সমাচারকে বলেন, ইনডেক্স এগ্রোর আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিলের বিষয়টি কমিশনের খতিয়ে দেখা উচিত। পরবর্তীতে তদন্ত সাপেক্ষে ইনডেক্স এগ্রো ও নিরীক্ষককে এ ব্যাপারে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত কমিশনের।

বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম দেশ সমাচারকে বলেন, ইনডেক্স এগ্রোর যাবতীয় বিষয় আমরা খতিয়ে দেখবো।

উল্লেখ্য, ইনডেক্স এগ্রোর পরিশোধিত মূলধন ৪৯ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ১৮ দশমিক ৯১ শতাংশ, উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৫৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ২৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।

ইনডেক্স এগ্রো: আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিল, করেছে শ্রম আইন লঙ্ঘনও!

ইনডেক্স এগ্রো: আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিল, করেছে শ্রম আইন লঙ্ঘনও!

প্রকাশিত : ১২:২৭:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিল লক্ষ্য করা গেছে। শুধু কি তাই? কোম্পানিটির বিক্রয় রাজস্ব, নিট মুনাফা কমলেও কাঁচামালের মজুদ বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের দক্ষতা ও সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এছাড়াও কোম্পানিটি বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ লঙ্ঘন করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বিবিধ খাতের কোম্পানি ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ সদ্য বিদায়ী বছরের (৩০ জুন ২০২৬) নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ফিন্যান্সিয়াল পজিশনের আট নাম্বার নোটে সহযোগি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্য মুনাফার পরিমাণ উল্লেখ করেছে দুই কোটি ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৭৯ টাকা। আর ‘প্রফিট অ্যান্ড লস’ অংশে উল্লেখ করেছে এক কোটি ২১ লাখ ৭০ হাজার ৫৬৮ টাকা। অর্থাৎ একই বছরের একই আর্থিক প্রতিবেদনে সহযোগি প্রতিষ্ঠান থেকে ইনডেক্স এগ্রোর প্রাপ্য মুনাফা ভিন্ন ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইনডেক্স এগ্রোর পাশাপাশি নিরীক্ষক খান ওয়াহাব শফিক রহমান অ্যান্ড কো. এর সততা  ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

 

দেশ সমাচার এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী বছরে ইনডেক্স এগ্রোর বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ১২ শতাংশ। গত বছর (৩০ জুন ২০২৫) কোম্পানির বিক্রয় রাজস্ব হয়েছিল ৪৪১ কোটি দুই লাখ ৩৭ হাজার ২৫৯ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৩৮৮ কোটি ৯২ লাখ ১৩ হাজার ৫৩৩ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির বিক্রয় রাজস্ব কমেছে ৫২ কোটি ১০ লাখ ২৩ হাজার ৭২৬ টাকা।

সদ্য বিদায়ী বছরে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা কমেছে ২০ শতাংশ। গত বছর পরিচালন মুনাফা হয়েছিল ৭৩ কোটি ৩৯ লাখ ৫৫ হাজার ৯৬০ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৫৮ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ৯০৭ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা কমেছে ১৪ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৫৩ টাকা। ইনডেক্স এগ্রোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, গত বছর কোম্পানির নিট মুনাফা হয়েছিল ২৬ কোটি ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮৯ টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৯৭৫ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা কমেছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ ২১ হাজার ৬১৪ টাকা।

এদিকে গত বছর মার্কেটিং প্রমোশন বাবদ ইনডেক্স এগ্রোর ব্যয় হয়েছে ৮৩ লাখ ৬১ হাজার ৩১৩ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৬৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে কোম্পানির ব্যয় বেড়েছে এক কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ১৯ টাকা।

শুধু যে মার্কেটিং প্রমোশন বাবদ ব্যয় বেড়েছে তাই নয়, ইনডেক্স এগ্রোর সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয়ও বেড়েছে। গত বছর সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৬২৭ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ২৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে এক কোটি ৭ লাখ ১৯ হাজার ৪৩৬ টাকা।

সাধারণ যেকোনো কোম্পানি তার পণ্যের বিক্রয় ও মুনাফা বৃদ্ধি করার জন্য মার্কেটিং প্রমোশন, সেলিং, ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় বৃদ্ধি করে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, গত বছরের তুলনায় ইনডেক্স এগ্রোর মার্কেটিং প্রমোশন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২১৯ শতাংশ। আর সেলিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় বেড়েছে ১২ শতাংশ। অথচ ঠিক একই সময়ে কোম্পানির নিট মুনাফা কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিক্রয় রাজস্বও যথেষ্ট কমেছে।

আবু জাফর আলি বলেন,  কোম্পানির বিক্রয় ও বিপণন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মার্কেটিং প্রমোশন বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনডেক্স এগ্রো কর্তৃক নগদ বিক্রয় পলিসিতে সাময়ীক পরিবর্তন আনার ফলে এই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে; তবে আগামীতে ক্রমান্বয়ে তা স্বাভবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, সত্যিই কি কোম্পানিটির মার্কেটিং প্রমোশনের পাশাপাশি ডিস্ট্রিবিউশন ব্যয় বেড়েছে নাকি এখানে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের রয়েছে কোনো দুরভিসন্ধি? বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) উচিত খুব দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে এ ব্যাপারে সঠিক চিত্র বের করা এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

কোম্পানি সূত্রে আরও জানা গেছে, বিক্রয় রাজস্ব, পরিচালন মুনাফা, নিট মুনাফা কমলেও ইনডেক্স এগ্রো কাঁচামাল মজুদের পরিমাণ বাড়িয়েছে ১৯ কোটি টাকার বেশি।

গত বছর কাঁচামালের মজুদ ছিল ২৬২ কোটি ৬০ লাখ এক হাজার ৩৫৯ টাকা। আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ ৭২ হাজার ১১২ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ইনডেক্স এগ্রোর কাঁচামালের মজুদ বেড়েছে ১৯ কোটি ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৩ টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক কোম্পানি সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে আর্থিক প্রতিবেদনে কাঁচামালের মজুদ বেশি দেখিয়ে থাকে। বাস্তবে তার চেয়ে কম পরিমাণে কাঁচামালের মজুদ থাকে। অর্থাৎ আর্থিক প্রতিবেদনে যা উল্লেখ করা হয়, তার সাথে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক দেখা যায়।

তারা আরও বলেন, সম্পদের পরিমাণ বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে ইনডেক্স এগ্রো আর্থিক প্রতিবেদনে কাঁচামালের মজুদ বেশি উল্লেখ করেছে কি-না তা, সরেজমিনে গিয়ে দেখা উচিত বিএসইসির।

এদিকে সাধারণত কোম্পানিগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- ইনডেক্স এগ্রো ২০২১ সালে তালিকাভুক্ত হয়। কিন্তু তালিকাভুক্ত পরবর্তী এখন পর্যন্ত কোনো বছরই কোম্পানিটি ব্যবসার সম্প্রসারণ বা ক্যাপিটাল ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস বাবদ ব্যয় করেনি, আর্থিক প্রতিবেদন থেকে তা জানা গেছে।

এ ব্যাপারে ইনডেক্স এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কোম্পানি সচিব আবু জাফর আলি লিখিত বক্তব্যে দেশ সমাচারকে জানান, কোম্পানি বর্তমানে তার বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা, সম্পদ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

আমাদের উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার, কাঁচামালের মূল্য, অর্থায়ন ব্যয় এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য রিটার্ন বিবেচনায় নেওয়া হয়। ক্যাপিটাল ওয়ার্ক ইন প্রগেস (সিডব্লিউআইপি) মূলত চলমান নির্মাণ, স্থাপনা বা নির্দিষ্ট মূলধনী প্রকল্পে ব্যয়কৃত অর্থকে নির্দেশ করে। কোনো নির্দিষ্ট বছরে সিডব্লিউআইপি-তে ব্যয় না থাকা মানেই কোম্পানি তার ব্যবসায়িক উন্নয়ন বা বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ থেকে বিরত রয়েছে—এমন নয়।

কোম্পানি বর্তমানে বিদ্যমান অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহার, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে। বাজার পরিস্থিতি ও বিনিয়োগের উপযুক্ত সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সম্প্রসারণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হতে পারে।

গ্রাহকদের কাছ থেকে বিক্রিত পণ্যের অর্থ আদায় করতে হিমশিম খাচ্ছে ইনডেক্স এগ্রো। বর্তমানে কোম্পানির মোট রিসিভেবলসের পরিমাণ ৮৯ কোটি ৫২ লাখ ২৬ হাজার ৮৫৮ টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘদিনের বকেয়া কিছু পাওনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, জানিয়েছে নিরীক্ষক।

ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফান্ডে ৮ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ৭৭৬ টাকা রয়েছে বলে কোম্পানিটি জানিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই ফান্ডের বার্ষিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়নি বলে নিরীক্ষক জানিয়েছে।

এছাড়াও ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে যে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে তা ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়নি বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিস (বিলস) এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ দেশ সমাচারকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে এসমস্ত কোম্পানি শ্রম আইন লঙ্ঘন করছে। এছাড়াও শ্রমিকদের এ ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণেও শ্রম আইন লঙ্ঘন করে থাকে কিছু কোম্পানি। সরকারের উচিত যে কোম্পানি শ্রম আইন লঙ্ঘন করবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিস্বরুপ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি কাজী মো. নজরুল দেশ সমাচারকে বলেন, কোম্পানিগুলোর গরমিল আর্থিক প্রতিবেদনের কারণেইতো পুঁজিবাজার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে। কমিশন, স্টক এক্সচেঞ্জ এ ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। কারণ কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জের অনেক অসৎ কর্মকর্তাও এর সাথে জড়িত থাকে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। ইনডেক্স এগ্রোর আর্থিক প্রতিবেদনে যদি কোনো গরমিল থেকে থাকে তবে, অবশ্যই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নিয়ন্ত্রক সংস্থার।

তিনি আরও বলেন, যে কোম্পানির মুনাফা কমেছে, সে কিভাবে কাঁচামালের মজুদ বৃদ্ধি করে? সম্পদ বেশি দেখানোর উদ্দেশ্যে যদি কোম্পানিটি এ ধরনের কাজ করে থাকে তবে, অবশ্যই এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বিএসইসির।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ও বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের (এফবিএস) ভারপ্রাপ্ত ডিন আল-আমিন দেশ সমাচারকে বলেন, ইনডেক্স এগ্রোর আর্থিক প্রতিবেদনে গরমিলের বিষয়টি কমিশনের খতিয়ে দেখা উচিত। পরবর্তীতে তদন্ত সাপেক্ষে ইনডেক্স এগ্রো ও নিরীক্ষককে এ ব্যাপারে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত কমিশনের।

বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম দেশ সমাচারকে বলেন, ইনডেক্স এগ্রোর যাবতীয় বিষয় আমরা খতিয়ে দেখবো।

উল্লেখ্য, ইনডেক্স এগ্রোর পরিশোধিত মূলধন ৪৯ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ১৮ দশমিক ৯১ শতাংশ, উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৫৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ২৩ দশমিক ৩২ শতাংশ।