নিজস্ব প্রতিবেদক: একাধিক আইন ভঙ্গ করে বহাল তবিয়তে আছে বিমা খাতের কোম্পানি এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। শুধু যে আইন ভঙ্গ করেছে তাই নয়, ধ্বংস হয়ে যাওয়া একাধিক ব্যাংকে কোম্পানিটির স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের এই অর্থ এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স আদৌ নগদায়ন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, ২০২০ ও ২০২১ সালের অবণ্টিত লভ্যাংশ ছয় লাখ ৩৮ হাজার ৯০১ টাকা এখনো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) জমা দেয়নি এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স। অথচ বিএসইসির নির্দেশনায় বলা আছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানির অর্থবছর বা হিসাব বছরের সমাপ্তি বা লভ্যাংশ ঘোষণার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (৩ বছর বা তার বেশি সময় ধরে অবণ্টিত থাকা লভ্যাংশ) সিএমএস ফান্ডে স্থানান্তর করতে হয়।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ৩ বছর বা তার বেশি সময় ধরে কোম্পানির কাছে থাকা অবণ্টিত লভ্যাংশ বিতরণ না করে বিএসইসির নির্দেশনা বা আইন অমান্য করা হয়েছে। তবে বিএসইসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আইন অমান্য করলেও এ ব্যাপারে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি।
এ ব্যাপারে কোম্পানি সচিব মো. মহিউদ্দিন খন্দকার দেশ সমাচারের এই প্রতিবেদককে বলেন, কোম্পানি অবণ্টিত লভ্যাংশ সিএমএস ফান্ডে জমা দেয়নি। বিষয়টি কমিশন দেখবে। আপনাকে এ ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারবো না।
এদিকে কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, বিদায়ী বছরে (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫) ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফান্ডে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখেনি কোম্পানি।
বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ফান্ডে কোম্পানির নিট মুনাফার একটা অংশ জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০১৩ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিগুলোকে এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে। কোম্পানির নিট মুনাফার মোট ৫ শতাংশ এই ফান্ডে জমা দিতে হয়। এই ৫ শতাংশ অংশের ৮০ শতাংশ কোম্পানির নিজস্ব ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে, ১০ শতাংশ কোম্পানির নিজস্ব শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডে এবং ১০ শতাংশ সরকারি ‘বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ তহবিলে জমা দিতে হয়। এই অর্থ অর্থবছর শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯ মাসের মধ্যে নির্ধারিত ফান্ডগুলোতে জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
কিন্তু এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স বিদায়ী বছরে তার নিট মুনাফার নির্ধারিত অংশ উল্লেখিত ফান্ডে জমা দেয়নি। এতে করে শ্রম আইন ভঙ্গ করেছে কোম্পানিটি, জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা এও বলেন, প্রতিনিয়ত একের পর এক আইন অমান্য করে কোম্পানিটি ব্যবসা পরিচালনা করছে। অথচ সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি বডি এ ব্যাপারে নির্বিকার। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি বডির উচিত এসব আইন ভঙ্গের দায়ে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এদিকে শুধু আইন ভঙ্গ করেই ক্ষান্ত হয়নি এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স। বিনিয়োগকারীদের অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বিনিয়োগ করে কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট অদক্ষতা ও অসততার পরিচয় দিয়েছে।
কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংকে বিমা কোম্পানিটির এফডিআর রয়েছে যথাক্রমে ৬ কোটি ৬৩ লাখ ২৬ হাজার ৩৭৮ টাকা, ৩ কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার ২৯৬ টাকা। এছাড়াও খেলাপি ঋণে জর্জরিত ইসলামি ব্যাংকে এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের এফডিআর রয়েছে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ৪২ হাজার ২৩৭ টাকা। এই তিন ব্যাংকে কোম্পানির মোট এফডিআর রয়েছে ১৭ কোটি ৩০ লাখ ২৯ হাজার ৯১১ টাকা।


খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই তিন ব্যাংকে বিশাল অঙ্কের এই বিনিয়োগ বা এফডিআর এখনো নগদান করতে পারেনি এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের এই অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।
এদিকে ২০২৪ সালে প্রিমিয়াম ও অন্যান্য বিষয়াদি থেকে কোম্পানির হাতে নগদ অর্থ এসেছে ৬৪ কোটি ৮০ লাখ ৭০ হাজার ১৯৬ টাকা । আর বিদায়ী বছরে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৬৪ কোটি তিন লাখ ১১ হাজার ১১০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখিত বিষয়ে নগদ অর্থ কম এসেছে ৭৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮৬ টাকা।

মো. মহিউদ্দিন খন্দকার দেশ সমাচারের এই প্রতিবেদককে বলেন, কোম্পানির ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টের ব্যাখ্যা আপনাকে কেন দেবো? যা বলার কমিশনকে বলবো।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের নেতা সাজ্জাদুল হক দেশ সমাচারকে বলেন, কমিশন, স্টক এক্সচেঞ্জগুলো শক্তিশালি ভুমিকা না নেওয়ার কারণে একের পর এক আইন অমান্য করে থাকে কোম্পানিগুলো। কমিশনের উচিত যেসমস্ত কোম্পানি আইন অমান্য করছে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ও বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের (এফবিএস) ভারপ্রাপ্ত ডিন আল-আমিন দেশ সমাচারকে বলেন, অনেক সময় লিকুইডিটি ক্রাইসিসের কারণে কোম্পানিগুলো তাদের অবণ্টিত লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) জমা দেয় না। আবার ইচ্ছাকৃতভাবেও অনেক কোম্পানি জমা দেয় না। তবে জমা না দিলে অবশ্যই বিএসইসির নির্দেশনা অমান্য করা হয়। এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্স জমা না দিয়ে থাকলে বিএসইসির নির্দেশনা অমান্য করেছে। তদন্ত করে কমিশনকে এ ব্যাপারে কোম্পানিটির ব্যাপারে ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম দেশ সমাচারকে বলেন, কমিশন এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের যাবতীয় বিষয় খতিয়ে দেখবে।
উল্লেখ্য, এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের পরিশোধিত মূলধন ৬৫ কোটি ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৩৪ দশমিক ৫১ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানা রয়েছে ৬০ শতাংশ। আজ (২৫ অক্টোবর) এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এক্সপ্রেস ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর ছিল ৩১ টাকা ২০ পয়সা।
অনলাইন ডেস্ক 



















