Logo

রাম মন্দিরে দুর্নীতি ঘিরে ভারতে তোলপাড়

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬
প্রিন্ট তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

মুঘল স্থাপনা বাবরি মসজিদ ভেঙে গড়া হিন্দুত্ববাদীদের সাধের রামমন্দিরে এবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। অযোধ্যার এই মন্দিরে অনুদানের টাকা তছরুপেরও অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

এ ঘটনায় উত্তরপ্রদেশ সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) ইতোমধ্যেই বড়সড় গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে নগদ ও মূল্যবান সামগ্রী গোনার দায়িত্বে থাকা আটজনকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৭৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। মিলেছে কিছু বিদেশি মুদ্রাও। আগামীকাল ২৯ জুন পর্যন্ত তাদের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে অনুদান পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মের চরম লঙ্ঘন ধরা পড়েছে। অনুদান গোনার সময় কর্মীদের তল্লাশি করা হয়নি। সেখানে কোনো নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন ছিল না। সিসিটিভি ফুটেজ ১৮০ দিনের বদলে মাত্র ৪৫ দিন সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অনুদান বাক্সের চাবি ছিল রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিন্নু যাদবের কাছে। তিনি ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের প্রাক্তন গাড়িচালক। এটি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।

সূত্র জানায়, কর্মীদের পকেটবিহীন পোশাক পরার নিয়ম ছিল। কিন্তু তা মানা হয়নি। এসআইএস এজেন্সির কোনো নিরাপত্তারক্ষী ছিল না। এমনকি কোনো আচমকা তল্লাশিও চালানো হতো না। সিট জানিয়েছে, অনুদান গোনার দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত সুভাষ শ্রীবাস্তবকে নিয়ম ভেঙে নিয়োগ করা হয়েছিল। ট্রাস্টের অন্যতম শীর্ষ এক কর্মকর্তার সুপারিশে তার চাকরি হয়।

গত ৭ জুন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব প্রথম এই দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তার আগে প্রাক্তন এসপি বিধায়ক পবন পাণ্ডে বড়সড় দাবি করেছিলেন। তার মতে, সাড়ে সাত থেকে ২৭ কোটি টাকা তছরুপ হয়েছে। প্রথমে শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এই অভিযোগ উড়িয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, অভ্যন্তরীণ অডিটে সন্দেহজনক কিছু মেলেনি। তবে ১৩-১৪ জুন উত্তরপ্রদেশ সরকার তিন সদস্যের সিট গঠন করে। এরপর ২৫ জুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় এফআইআর দায়ের হয়। অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা, তিন্নু যাদব, মনীশ যাদবসহ আটজনের নাম রয়েছে এই এফআইআরে। এরপর গত শুক্রবার নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন চম্পত রাই এবং ট্রাস্টি অনিল মিশ্র।

গতকাল শনিবার মহারাষ্ট্রের ইয়াভাৎমাল-ওয়াশিম কেন্দ্রে একটি জনসভায় বিজেপির তীব্র সমালোচনা করেন শিবসেনা (উদ্ধব) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে। তিনি বলেন, বিজেপি হিন্দুদের আবেগের সঙ্গে খেলছে। তারা হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মন্দির লুট করার এই হিন্দুত্বকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ‘বিজেপি-মুক্ত রাম’ গড়ার ডাক দিয়েছেন। এজন্য প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেবে তার দল। দলবদল করা সংসদ সদস্য সঞ্জয় দেশমুখের সমালোচনা করে উদ্ধব ভোটারদের কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, তার কথাতেই মানুষ ওই ‘কাকতাড়ুয়া’কে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু সে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

কংগ্রেসও এই ইস্যুতে বিজেপি, আরএসএস এবং কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এই ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ ও ‘দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, সাধারণ মানুষ, গরিব নারী এবং শিশুদের জমানো টাকা এভাবে চুরি যাওয়াটা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এর পেছনে বড় চক্রান্তকারীদের হাত থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

কংগ্রেস নেতা পবন খেরা প্রশ্ন তুলেছেন, আরএসএস এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নজরদারিতে থাকা এই প্রকল্পে কীভাবে এমন দুর্নীতি হলো। তার অভিযোগ, ট্রাস্ট তৈরি হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ নৃপেন্দ্র মিশ্র ও চম্পত রাইদের নিয়ে। মহীপাল সিং নামের যে ব্যক্তি প্রথম চুরির কথা জানিয়েছিলেন, তাকে উল্টে সরিয়ে দেওয়া হয়। খেরা বলেন, ধর্মকে হাতিয়ার করে চুরি চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যারা চুরি করেছে, তারাই আসলে হিন্দু ধর্মের অবমাননা করেছে।

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং এ ঘটনায় চম্পত রাই এবং অনিল মিশ্রকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহীপাল সিং এবং দীননাথ বর্মার মতো সাক্ষীদের বয়ান রেকর্ড করা উচিত।

তার অভিযোগ, প্রায় সাড়ে ১২ কোটি পরিবারের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হলেও তার কোনো হিসাব নেই। বিজেপি, আরএসএস ও ভিএইচপি সনাতন ধর্মের ঐতিহ্য ধ্বংস করছে। এই সংগঠনগুলো মঠ ও মন্দির দখলের চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈ এফআইআর দায়ের করতে দেরি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, আসল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে। জ্যোতির্মঠের শঙ্করাচার্যও জানিয়েছেন, এফআইআরে মূল অভিযুক্তদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। তিনি বিজেপির হিন্দুত্বকে ‘নকল’ বলে কটাক্ষ করেছেন।

তবে বিরোধীদের এই আক্রমণের কড়া জবাব দিয়েছে বিজেপি। উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টিকে নিশানা করেছেন। তিনি অখিলেশ যাদবের দলকে ‘লাঠিয়াল গ্যাং’ বলে কটাক্ষ করেন। তার দাবি, এই দলগুলো বরাবরই রাম মন্দিরের বিরোধী। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তারা মিথ্যা ও বিষ ছড়াচ্ছে।

তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, সিট তদন্তের পর এফআইআর হয়েছে এবং গ্রেপ্তার শুরু হয়েছে। দোষীদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না।

সরকারি সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। সিট তাদের প্রাথমিক রিপোর্টে কড়া সুপারিশ করেছে। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরকার জানিয়েছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬