Logo

ডিজেল সংকটে রেল ঝুঁকিতে, থমকে যেতে পারে বন্দরের কার্যক্রম

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ৪ এপ্রিল, ২০২৬
প্রিন্ট তারিখ: ৮ অক্টোবর, ২০২৬

দেশজুড়ে বাড়তে থাকা জ্বালানি সংকটের প্রভাব এবার রেলওয়ের ওপর সরাসরি পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মাসে প্রায় ৫০ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও সরবরাহ ঘাটতির কারণে বর্তমান মজুত দিয়ে মাত্র ১৮-২২ দিন ট্রেন চালানো সম্ভব।

রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত মাসের ২৮ তারিখ পর্যন্ত তারা পেয়েছে প্রায় ৪০ লাখ লিটার ডিজেল। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের পর সরবরাহ পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, রেল চলাচল ব্যাহত হলে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রেল সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে দেশের বন্দর কার্যক্রমে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য রেলপথে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রকল্প এলাকায় পরিবহন করা হয়। রেল চলাচল বন্ধ হলে এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, পূর্বাঞ্চলে মাসে ২২-২৫ লাখ লিটার এবং পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২৫ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এর বড় একটি অংশ ব্যয় হয় মালবাহী ট্রেনে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সরবরাহ ব্যাহত হলে প্রথমেই বন্ধ হয়ে যাবে মালবাহী ট্রেন, যা সরাসরি বন্দর কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি করবে।

কেন রেল থামা মানেই ‘বন্দর থামা’

চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার চলাচলের বিশাল অংশই চলে রেলপথে। বিশেষ করে বন্দর থেকে মালামাল, শিল্প কারখানার কাঁচামাল, সার, খাদ্যশস্যÑসবই রেলের মাধ্যমে দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যায়। রেল থেমে গেলে সড়ক পরিবহনই ভরসা। কিন্তু সড়কপথে একই পরিমাণ পণ্য পরিবহন করতে যে পরিমাণ ট্রাক লাগবে, তা এক কথায় অসম্ভব।

বন্দর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, রেল বন্ধ হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বন্দরে কন্টেইনার জট তৈরি হবে। এতে জাহাজের অপেক্ষার সময় বাড়বে, বাড়বে ডেমারেজ খরচ, এমনকি আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো রুট কমিয়ে দিতে পারে, যা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় আঘাত।

ডিজেলনির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে রেল ডিজেলে কেন এতটা নির্ভরশীলÑএটি নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। রেলওয়ে বছরে যেটুকু ডিজেল পোড়ায়, তার বাজারমূল্য দাঁড়ায় ছয় হাজার ৬০০ থেকে ছয় হাজার ৯০০ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেলের ডিজেলের ওপর অতিনির্ভরতা দেশের পুরো লজিস্টিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। ডিজেল সংকট তীব্র হলে খাদ্যশস্য, শিল্পের কাঁচামাল, সার ও কয়লা পরিবহন ব্যাহত হয়ে সরাসরি প্রভাব পড়বে অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফীতিতে।

রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো রেলকে অগ্রাধিকার দিয়ে তেল সরবরাহ করে ঠিকই, তবে সামগ্রিক সংকট বাড়লেও রেল পর্যাপ্ত ডিজেল পাবেÑএমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, ডিজেলের মোট মাসিক চাহিদা ৫০ লাখ লিটার হলেও দেশের সামগ্রিক সরবরাহই এখন টলমল। ফলে রেলকে তার পূর্ণ বরাদ্দ দিতে হলে দেশের অন্যান্য পরিবহন খাত সংকটে পড়বে।

পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, তেল সংকটে রেল বন্ধ হলে, দেশের কী হবে সেটি সবাই জানে। তবে এখন পর্যন্ত আশার খবর হলো, আমরা চাহিদামতো তেল পাচ্ছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের এক কর্মকর্তা বলেন, রেলের ট্যাংক খালি হলে রেল নয়, প্রথমেই বন্দর থেমে যাবে। তখন সেটি আর শুধু রেলের সংকট থাকবে নাÑএটি জাতীয় অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হবে।

ডিজেলে চলছে ৩০০ ট্রেন

দেশে বর্তমানে ৩০০টির বেশি ট্রেন ডিজেলে চলছে, যার মধ্যে ঢাকামুখী আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে জ্বালানি খরচ সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে একেকটি ট্রেনের যাওয়া-আসায় গড়ে দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ২০০ লিটার ডিজেল লাগে। ট্রেনের ওজন, কোচ সংখ্যা, ইঞ্জিনের অবস্থা অনুযায়ী খরচ ওঠানামা করে; শীতে কম ও বর্ষায় বেশি হয়। প্রতিদিন প্রায় ৩০টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে, ফলে শুধু এই রুটেই মাসে ৬-৭ লাখ লিটার ডিজেল খরচ হয়।

চট্টগ্রাম-সিলেট রুটে খরচ তুলনামূলক কম হলেও পুরোনো লাইন ও কম গতির কারণে তা অনিয়ন্ত্রিত। সিলেট-ঢাকা রুটে একবার যাত্রায় লাগে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৮০০ লিটার। মাসে লাগে মোট এক লাখ ৬০ হাজার থেকে দুই লাখ লিটার। পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর রুটে দূরত্ব বেশি হলেও ট্রেন কম, তাই খরচ মাঝারি; রাজশাহী–ঢাকা রুটে একবার যাতায়াতে লাগে দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ লিটার এবং মাসে প্রায় তিন লাখ লিটার।

লোকোমোটিভভেদে জ্বালানি খরচে বড় পার্থক্য রয়েছে। পুরোনো ২৯০০ সিরিজের ইঞ্জিন দিনে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৬০০ লিটার ডিজেল খরচ করে, আর নতুন ৩০০০ সিরিজ বা জিই ইঞ্জিন একই দূরত্বে ১৮ থেকে ২২ শতাংশ কম জ্বালানি ব্যবহার করে, তবে এসব ইঞ্জিনের সংখ্যা সীমিত।

মালবাহী ট্রেন ডিজেল ব্যবহারের বড় অংশ খরচ করে। একেকটি ট্রেনে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার লিটার পর্যন্ত খরচ হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিভিন্ন প্রকল্প ও শিল্পাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের কারণে শুধু এই খাতেই মাসে ৮-১০ লাখ লিটার ডিজেল লাগে। সামগ্রিকভাবে পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল ও মালবাহী খাতে মোট প্রয়োজন প্রায় ৫০ লাখ লিটার।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান জানান, রেল প্রধানত পদ্মা, মেঘনা ও যুমনা থেকে তেল পেয়ে থাকে। পূর্বাঞ্চলে গড়ে মাসে ২২-২৫ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। ২৮ মার্চ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলে ১৯ লাখ লিটার ডিজেল পাওয়া গেছে। আরো ৬ লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হবে এই কয়েকদিনের মধ্যেই।

অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের যন্ত্রপ্রকৌশলী (সদর) শাহিন উল হক অপু জানান, তাদের মাসে ২৫ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। এখন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক তেল পাচ্ছেন তারা। তাদের যে তেল মজুত আছে এই তেল দিয়ে আরো ২২ দিন ট্রেন চালাতে পারবেন।

৫০ লাখ লিটার ডিজেলের বাজারমূল্য কত

বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১০–১১৫ টাকা ধরা হলে, রেলওয়ের মাসিক জ্বালানি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫৫০-৫৭৫ কোটি টাকা। বছরে এই ব্যয় ছয় হাজার ৬০০ থেকে ছয় হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা দেশের যে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ নিয়মিত অপারেশনাল জ্বালানি ব্যয়ের একটি।

রেলওয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ঘাটতিনির্ভর প্রতিষ্ঠান; বছরে ১৫-২০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি যাত্রী বা মালবাহী আয় দিয়ে পূরণ সম্ভব হয় না। ফলে ডিজেল ব্যয়ের বড় অংশ আসে সরকারি ভর্তুকি, বাজেট বরাদ্দ এবং পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির বিশেষ জ্বালানি বরাদ্দ থেকে। রেলের নিজস্ব আয়ে এই বিপুল ব্যয় বহন করা বাস্তবসম্মত নয়। যাত্রী ভাড়া কম রাখা, মালবাহী খাতে সীমিত আয়ের ধারা এবং লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণের উচ্চ ব্যয়Ñসব মিলিয়ে রেলের ডিজেল বিলই রেলের পুরো আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে ‘খেয়ে ফেলছে’।

রেলওয়ের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মোট অপারেশনাল ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ হলো লোকোমোটিভের ডিজেল, এরপর যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং বেতন-ভাতা। মোট ব্যয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই চলে যায় শুধু ডিজেল কেনায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলের ওপর অতিনির্ভরতা রেলের ঘাটতির প্রধান কারণ। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ইলেকট্রিক ট্রেনে রূপান্তর করে ব্যয় কমালেও বাংলাদেশ এখনো ডিজেলনির্ভর কাঠামোয় রয়েছে।

দেশে সামগ্রিক জ্বালানি সংকট থাকা সত্ত্বেও রেলওয়ে তুলনামূলকভাবে নিয়মিত সরবরাহ পাচ্ছে। কারণ, রেলকে জাতীয় কৌশলগত সেবা হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। খাদ্যশস্য, সার, কয়লা ও শিল্পপণ্য পরিবহনে রেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরবরাহ চেইন সচল রাখতে তেল কোম্পানিগুলো রেলকে অগ্রাধিকার দেয়।

পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) সবুক্তগীন বলেন, আর ৪-৫ দিন গেলেই তেলের অবস্থা বুঝা যাবে। এখন পর্যন্ত আমরা সরবরাহ পারছি।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: desh.shamachar@gmail.com
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬