Logo

‘প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, এখনই মাথার ওপর ক্ষেপণাস্ত্র পড়বে’

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ৫ মার্চ, ২০২৬
প্রিন্ট তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

‘রাত হলেই ভয়ংকর হয়ে ওঠে আকাশ। প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, এখনই হয়তো মাথার ওপর ক্ষেপণাস্ত্র পড়বে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আতঙ্কে রাতে ঘুমাতেও পারি না। গত শনিবার এই বন্দরে নোঙর করা আমাদের জাহাজ থেকে মাত্র ৫০০ গজের মধ্যেই একটি তেলের ডিপোতে ড্রোন হামলা করেছে ইরান। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছি আমরা।’ গতকাল বুধবার বিকেলে যুদ্ধদিনের অভিজ্ঞতা হোয়াটসঅ্যাপের আলাপচারিতায় এভাবেই তুলে ধরেন ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজের শীর্ষস্থানীয় এক নাবিক।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পণ্য এনে আটকা পড়েছে তাদের জাহাজ। শুধু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ নাবিক নন; ইরান ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে এমন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন হরমুজ প্রণালির আশপাশে থাকা চারটি জাহাজের ৪৪ বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু। এর মধ্যে বাংলাদেশি নাবিক থাকা একটি বিদেশি জাহাজ সরাসরি ড্রোন হামলার শিকার হয়ে ডুবেছে সাগরে।
এদিকে নাবিকদের মনোবল বাড়াতে নৌ মন্ত্রণালয়, শিপিং করপোরেশন, নৌ বাণিজ্য দপ্তর ও মার্চেন্ট মেরিন অ্যাসোসিয়েশন নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। শিপিং করপোরেশন ‘নিয়ন্ত্রণ কক্ষ’ খুলে তাদের পরিবারের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। বিএসসির মালিকানাধীন জাহাজে বাড়ানো হয়েছে প্রয়োজনীয় সহায়তা। পানি ও খাবারের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। খাবার বিল ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২ ডলার। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি স্থানে থাকা অন্য তিনটি জাহাজকে নিরাপত্তার স্বার্থে গতি কমানোসহ কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

মেরিন ট্রাফিক সূত্র জানায়, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের বন্দরগামী আরও জাহাজের মধ্যে কেএসআরএম গ্রুপের দুটি এবং মেঘনা গ্রুপের একটি জাহাজ রয়েছে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ইরান, ওমান পোর্টসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে অন্তত ২৫টি জাহাজে বাংলাদেশি নাবিক আছেন দেড় শতাধিক। তবে চরম ঝুঁকিতে আছেন চারটি জাহাজে থাকা ৪৪ নাবিক ও ক্রু।

মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন (অব.) আনাম চৌধুরী জানান, আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের নিয়ম মানলে ঝুঁকিতে থাকা এসব নাবিক এখন চাইলেই দেশে ফিরতে পারবেন না। বন্দরে জাহাজ নোঙর করে থাকলেও তারা যেতে পারবেন না অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে। ফিরতে পারবেন না পরিবারের কাছে। জাহাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা হলেই শুধু চুক্তির আগে দেশে ফিরতে পারবেন। হামলার শিকার হয়ে একটি জাহাজ ডুবে যাওয়ায় এরই মধ্যে সেটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এই জাহাজে থাকা ৪ নাবিককে এখন ওমানের হোটেলে রেখেছে জাহাজটির মালিকপক্ষ। অন্য তিনটি জাহাজের মধ্যে দুটি আছে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি স্থানে। এসব জাহাজে বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু আছেন ৯ জন। আর ৩১ নাবিক ও ক্রু থাকা শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজটি জেবেল আলি বন্দরে নোঙর করা আছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আগের দিন গত শনিবার আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছায় বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি। সংঘাত শুরু হওয়ায় দুদিন জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ রাখা হয়। গত সোমবার থেকে আবার পণ্য খালাস শুরু হয়েছে।

জেবেল আলি বন্দরে পণ্য খালাস করে এই জাহাজটির কুয়েত যাওয়ার কথা। এটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন সেই নাবিক। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পারস্য উপসাগর থেকে কীভাবে বের হবো, সেটা নিয়ে ভাবছি। যে কোনো সময় বড় বিপদ হাজির হতে পারে। তবু পরিবারের সদস্যদের অভয় দিচ্ছি। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ দূতাবাস, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।’
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর এম. মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছায়। জাহাজটি বর্তমানে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের ১০ নম্বর জেটিতে অবস্থান করছে। আমরা তাদের নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিয়েছি।’

একজন মারা গেলেও প্রাণে বেঁচেছেন ৪ জন
গত রোববার ওমান উপকূলে ‘ভি শিপস’ পরিচালিত তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘এমকেডি ভিওএম’-এ হামলায় একজন ক্রু নিহত হয়েছেন। এতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজটিতে থাকা চার বাংলাদেশি নাবিক অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। জাহাজটি ডুবতে শুরু করলে তারা লাইফবোটে সরে যান এবং পরে একটি চীনা জাহাজ তাদের উদ্ধার করে। ওই বাংলাদেশি নাবিকরা ওমানের একটি হোটেলে ছিলেন। গতকাল বুধবার রাতে ঢাকা ফিরেছেন তারা।

হরমুজ প্রণালির আশপাশে আটকা ৭৫০ জাহাজ
সামুদ্রিক ট্রাফিক তথ্য বলছে, হরমুজ প্রণালির দুই পাশে তেলবাহী ট্যাঙ্কারসহ ৭৫০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে। এসব জাহাজে অনেক বাংলাদেশি নাবিক ও কেবিন ক্রু কর্মরত। এই বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যে কোনো সময় ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সহজ লক্ষ্যে পরিণত হতে পারে। আটকা পড়া নাবিকদের পরিবার তাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬