শেয়ারবাজারের মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দেশের অন্যতম শীর্ষ সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে তাদের পরিচালিত ছয়টি ফান্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বা নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে কমিশন।
বিএসইসির দীর্ঘ অনুসন্ধানে এলআর গ্লোবালের বিরুদ্ধে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, বিনিয়োগ বিধিমালার লঙ্ঘন এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংস্থাটির অধীনে থাকা ডিবিএইচ ফার্স্ট, গ্রিন ডেল্টা, এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক, এলআর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড-১, এনসিসিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড-১ এবং এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, এই প্রতিষ্ঠানে প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা হিসেবে রিয়াজ ইসলাম এবং উপদেষ্টা হিসেবে তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও সাংবাদিক রেজাউর রহমান সোহাগ যুক্ত ছিলেন।
কমিশনের তদন্তে দেখা যায়, এলআর গ্লোবাল তাদের পরিচালিত ফান্ডগুলোর অর্থ দিয়ে ‘কোয়েস্ট বিডিসি পিএলসি’ (সাবেক পদ্মা প্রিন্টার্স)-এর বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনে। স্থবির ও লোকসানি এই কোম্পানির শেয়ার যেখানে বাজারে মাত্র ১৩ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছিল, সেখানে এলআর গ্লোবাল প্রায় ২৮৯ টাকা দরে বিপুল প্রিমিয়াম দিয়ে তা ক্রয় করে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে সাধারণ ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে এবং বিধিমালা ২০০১-এর একাধিক ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
বিএসইসি আরও একটি দ্বৈত নীতির প্রমাণ পেয়েছে। এলআর গ্লোবাল যেখানে সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলোর জন্য ১৫.৮৮ টাকা দরে শেয়ার কেনে, সেখানে তাদের নিজস্ব সহযোগী প্রতিষ্ঠান এলআরজি ভেঞ্চার লিমিটেড একই শেয়ার মাত্র ১০ টাকায় সংগ্রহ করে। এতে সহযোগী প্রতিষ্ঠান লাভবান হলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হন। এছাড়া একক কোনো কোম্পানির ১৫ শতাংশের বেশি শেয়ার অধিগ্রহণের বিধিনিষেধও তোয়াক্কা করেনি প্রতিষ্ঠানটি।
আইন অমান্য করে এআইবিএল ফার্স্ট ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ডের পক্ষ থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরিফ আহসানকে কোয়েস্ট বিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ তিনি তখন অন্য একটি সিকিউরিটিজ হাউসের সিইও হিসেবে কর্মরত ছিলেন, যা বিএসইসির বিধিমালা ১৩-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়া ট্রাস্টি বা কমিশনের অনুমতি ছাড়াই সরাসরি অন্য কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হওয়াকে সম্পদ ব্যবস্থাপকের এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২২ সাল থেকে কোয়েস্ট বিডিসিতে বিনিয়োগ করা বিশাল অঙ্কের অর্থ থেকে কোনো মুনাফা আসেনি। ওটিসি মার্কেটের তালিকাভুক্ত এই শেয়ারগুলো বিক্রির সুযোগও সীমিত, ফলে ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের মেয়াদ শেষে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এরই মধ্যে গত বছরের ২১ অক্টোবর এক আদেশে অনিয়মের দায়ে রিয়াজ ইসলাম এবং বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট কাজে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া রিয়াজ ইসলামসহ পাঁচ পরিচালক ও ট্রাস্টিকে ১০৯ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএসইসি মনে করছে, এলআর গ্লোবাল সততা ও জবাবদিহিতায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, তাই জনস্বার্থে তাদের অপসারণ জরুরি হয়ে পড়েছিল।