Logo

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৯ মাসের সর্বোচ্চ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
প্রিন্ট তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

এক সময় ব্যাপক সংকটে থাকা বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পরিস্থিতি অনেকটাই স্বস্তিকর অবস্থায় রেখে গেল অন্তর্বর্তী সরকার। গতকাল মঙ্গলবার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। গত ৩৯ মাসের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। সর্বশেষ ২০২২ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি রিজার্ভ কমে ৩৪ দশমিক ৩০ বিলিয়নে নেমেছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে রপ্তানি কমে যাওয়া ও আমদানি বাড়ার মধ্যেও কেবল রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এই প্রবণতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় অনেকে এখন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের ওপর চাপ বাড়তে পারে। ফলে ডলার বাজারে এখনকার মতো স্থিতিশীলতা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জ হবে। আবার বাংলাদেশের ভোগ্য পণ্যের বড় অংশ আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। ফলে ডলারের দর বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়ে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চরম অস্থিরতার মধ্যে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে উঠেছিল। তখন একদিকে ডলারের দর হুহু করে বাড়ছিল। আরেকদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ২৬ বিলিয়নের নিচে নেমে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে ২০২১ সালের আগস্টে। আন্তঃব্যাংকে তখন প্রতি ডলারের দর ছিল ৮৪ টাকা ২০ পয়সা। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভ কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভ নামে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে। এছাড়া প্রতি ডলার ৩৬ টাকা বেড়ে ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ওই সময়ে আমদানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ দেওয়ার পরও তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না সরকার। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে সুদহার অনেক বাড়লেও দেশে ৯ শতাংশ সুদের সর্বোচ্চ সীমার কারণে দেশ থেকে প্রচুর অর্থ পাচার হচ্ছিল বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ৪৯০ কোটি ডলার কিনে রিজার্ভে যোগ করেছে। রিজার্ভ আরও বাড়িয়ে আগামী জুনের মধ্যে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলে সেটা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) সর্বশেষ নভেম্বর-ডিসেম্বরের জন্য প্রায় ১৫৪ কোটি ডলার আমদানি দায় পরিশোধের পর রিজার্ভ কমে গত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে নামে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থ পাচারে কড়াকড়ি করা হয়। নতুন করে পাচারে কঠোরতার পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অর্থ পাচার ও নানা অনিয়মে প্রধান সন্দেহভাজন ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে আলাদা ১০টি যৌথ টিম গঠন করা হয়। এসব ব্যবসায়ীর বিষয়ে দেশের বাইরে ব্যবস্থা নিতে ১২টি ল’ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের ছেলের সম্পদ ক্রোক হয়েছে। সব মিলিয়ে হুন্ডি প্রবণতা কমে বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ২ হাজার ১২৪ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল এক হাজার ৭৪৫ কোটি ডলার। এর মানে সাড়ে ৭ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৭৯ কোটি ডলার; যা ২১ দশমিক ৭০ শতাংশ। গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিলো তিন হাজার ৩৩ কোটি ডলার যা বেশি ছিল ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সর্বশেষ মুদ্রানীতি ঘোষণা হয় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। ওই মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল করা এবং রিজার্ভ বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর গভর্নরের দায়িত্ব নেওয়া ড. আহসান এইচ মনসুর ১১ শতাংশের ওপরে থাকা মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। সর্বশেষ গত জানুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অবশ্য মূল্যস্ফীতি আরও কমে গত অক্টোবরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছিল। সেখান থেকে সর্বশেষ তিন মাস ধরে বেড়ে আবার এ পর্যায়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার এই তিন ক্ষেত্রে অনেকাংশে সফলতা দেখিয়েছে। তবে বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে আশানুরূপ কর্মসংস্থান হয়নি। ফলে রেমিট্যান্সে উচ্চপ্রবাহ ধরে রাখা, রপ্তানি আয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একইভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করেন আর্থিক খাত-সংশ্লিষ্টরা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬