পুঁজিবাজার সংস্কারের একগুচ্ছ গালভরা প্রতিশ্রুতি দিলেও খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এখন নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পর্যুদস্ত। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারের খোলনলচে বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিলেও তা এখন ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত হওয়ার শঙ্কায়। কারণ একটাই—তীব্র জনবল সংকট।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীতে আয়োজিত এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে স্বয়ং বিএসইসি চেয়ারম্যান নিজেই এই সীমাবদ্ধতার ‘অসহায়’ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
পদ আছে ৩৭০, কাজ করছেন ২৬০: বাকিরা কোথায়?
চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। বিএসইসির অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৩৭০টি হলেও বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ২৬০ জন। অর্থাৎ ১১০টি পদ শূন্য পড়ে আছে। অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে লোক নিয়োগের ক্ষমতা না থাকায় হাত-পা বাধা অবস্থায় ধুঁকছে এই সংবিধিবদ্ধ সংস্থাটি। প্রশ্ন উঠেছে, যখন বাজারে হাজার হাজার কোটি টাকার কারসাজি ধরার কথা, তখন মাত্র ২৬০ জন দিয়ে কীভাবে সম্ভব এই বিশাল সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ করা?
এক কর্মকর্তার ঘাড়ে ৭ তদন্ত: মানের কি হবে?
জনবল সংকটের কারণে বিএসইসির তদন্ত কার্যক্রম এখন লেজেগোবরে অবস্থায়। চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন যে:
- কমিশনের অধীনে গঠিত বিভিন্ন কমিটির মেয়াদ বারবার বাড়াতে হচ্ছে।
- একই কর্মকর্তাকে নিজের বিভাগের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪টি, এমনকি ৭টি পর্যন্ত তদন্ত কার্যক্রম একযোগে সামলাতে হচ্ছে।
- গত ৩০ এপ্রিল শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২১ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার ফলে প্রশাসনিক কাঠামোতে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে।
যদিও চেয়ারম্যান দাবি করেছেন যে তদন্তের মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হচ্ছে না, তবে একজন কর্মকর্তার পক্ষে একইসাথে ৭টি ফাইলে সুবিচার করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে।
সাংবাদিকদের হাতে ‘পুরস্কার’, বাজারের হাতে ‘আশ্বাস’
‘বিএসইসি ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিজম এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে ৯ জন সাংবাদিককে পুরস্কৃত করা হলেও বাজারের মূল সংকট নিরসনে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি চেয়ারম্যান। তিনি সাংবাদিকদের প্রশংসা করে বলেছেন, সঠিক তথ্যে অনিয়ম কমবে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন—তথ্য দেওয়ার কাজ সাংবাদিকদের হলেও, ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব তো কমিশনের। জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে এই ‘ব্যবস্থা নেওয়া’ আর কতদিন ঝুলে থাকবে?
বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল
বিএসইসি বলছে তারা বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার যে সম্ভব নয়, তা খোদ চেয়ারম্যানের বক্তব্যেই পরিষ্কার। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে আগামী অর্থবছরগুলোতে বাজারের ভিত্তি শক্তিশালী করার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেতে পারে।