ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন এই পদক্ষেপকে মাদকবিরোধী অভিযান হিসেবে দাবি করছে, তবে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ এখন খোদ মার্কিন জ্বালানি বিশ্লেষকদের কণ্ঠেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মাদুরো বরাবরই দাবি করে আসছেন যে, ওয়াশিংটন তাঁর সরকার উৎখাত করে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ দখল করতে চায়। এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে প্রবেশ করবে।
জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক ও লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু লিপো মনে করেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয় যে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ মূলত তেলকেন্দ্রিক। আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি ইঙ্গিত দেন যে এই অভিযানের সবকিছুই আসলে তেলকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। মাদক পাচারের যে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র তুলছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন লিপো। তাঁর মতে, ভেনেজুয়েলা দিয়ে ঠিক কী পরিমাণ মাদক প্রবেশ করছে তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা রয়েছে এবং এই সংকটের মূলে কলম্বিয়া, মেক্সিকো কিংবা চীনের রাসায়নিক সরবরাহের ভূমিকা কতটা, তা-ও স্পষ্ট নয়।
এদিকে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের বর্তমান বাস্তব অবস্থা অত্যন্ত নাজুক বলে লিপো উল্লেখ করেছেন। প্রায় তিন দশক আগে দেশটিতে দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদন হতো, যা বর্তমানে এক মিলিয়নের নিচে নেমে এসেছে। অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের কারণে এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এমন এক অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে কে এই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করবে এবং ক্ষমতার অনিশ্চয়তার মধ্যে তা কতটুকু টেকসই হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে।
সামরিক অভিযানের এই ডামাডোলে সাধারণ মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বলে খবর প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। ভেনেজুয়েলার এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসদস্য উভয়ই রয়েছেন। কারাকাস বিমানবন্দরের পশ্চিমে দরিদ্র জনপদ ক্যাটিয়া লা মারে একটি তিনতলা আবাসিক ভবনে মার্কিন বিমান হামলায় ৮০ বছর বয়সী রোসা গঞ্জালেস ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্রাণ হারিয়েছেন।
এই হামলায় নিজের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্বল হারানো সাধারণ মানুষের হাহাকার এখন দেশটির আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছে। সর্বস্ব হারানো এসব মানুষের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যেমনটি নিহত রোসা গঞ্জালেসের ভাতিজা উইলমান গঞ্জালেস অসহায় কণ্ঠে প্রশ্ন করেছেন—বাড়ি হারানোর পর এখন তিনি কোথায় যাবেন, তা তাঁর জানা নেই।