Logo

৩ বছর পর ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল দেশের রিজার্ভ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১ জানুয়ারি, ২০২৬
প্রিন্ট তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ডলার সংকটের কালো মেঘ কাটিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অবশেষে এক নতুন সূর্যোদয় দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আবারও ৩৩ বিলিয়ন ডলারের শক্তিশালী মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের সেই স্বর্ণালী সময়ের পর এই প্রথম রিজার্ভ এই অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছাতে সক্ষম হলো। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুসরণে গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে। গত মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই মজুতের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক প্রশান্তির বার্তা বয়ে এনেছে।

দেশের অর্থনীতির এই ঘুরে দাঁড়ানোর মূলে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের বিস্ময়কর প্রবাহ। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে প্রবাসীদের মাঝে বৈধ পথে টাকা পাঠানোর যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছিল, তার সুফল এখন জাতীয় অর্থনীতিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসেই দেশে ১৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। প্রবাসী আয়ের এই বিশাল জোগান একদিকে যেমন ডলারের বাজারকে শান্ত করেছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টকে করে তুলেছে আরও সমৃদ্ধ।

এই সাফল্যের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী এবং সুদূরপ্রসারী নীতি পরিবর্তনের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। এর আগে টাকার মান কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত বাজার থেকে ডলার বিক্রি করত, যা রিজার্ভের ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে এই আত্মঘাতী নীতি থেকে সরে এসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্টো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কেনা শুরু করে। চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত বাজার থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা সরাসরি রিজার্ভের ভিতকে আরও মজবুত করেছে। ডলারের অতিরিক্ত শক্তি কমিয়ে বাজারে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য আনাই ছিল এই নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য, যা এখন দৃশ্যত সফল।

বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মাসিক গড় আমদানি ব্যয় ৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে। সেই হিসেবে বর্তমানের এই ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে বাংলাদেশ এখন অনায়াসেই পাঁচ মাসেরও বেশি সময়ের আমদানি বিল মেটাতে সক্ষম। ২০২৪ সালের মে মাসে যখন দেশের ডলার মজুত ২৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল, তখন আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, বর্তমানের এই অর্জন সেই শঙ্কাকে পুরোপুরি ধুলিসাৎ করে দিয়েছে। আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমানের নিয়ন্ত্রিত গতি এবং রপ্তানি আয়ের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি এই স্বস্তিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি প্রদান করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয়ের এই যুগলবন্দী বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে একটি নতুন স্থিতিশীলতা দান করেছে। রিজার্ভের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকলে আগামীতে বিদেশি বিনিয়োগের হার যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের ক্রেডিট রেটিং বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এটি কেবল ডলারের সংকটই দূর করবে না, বরং দেশের ব্যবসায়ীদের এলসি খোলা এবং শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির পথকে আরও মসৃণ ও শঙ্কামুক্ত করবে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬