Logo

কর, ঋণ ও জ্বালানির জন্য বিশেষ সুবিধার সুপারিশ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
প্রিন্ট তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে রপ্তানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনা দেওয়া যাবে না। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভর্তুকিনির্ভর কাঠামো থেকে সরে এসে উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের দিকে জোর দিতে হবে। চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য ও ওষুধের মতো রপ্তানি খাতে নগদ সহায়তার বদলে উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে কর, ঋণ এবং গ্যাস-বিদ্যুতে দিতে হবে। এসব সুপারিশ করেছে এ বিষয়ে সরকার গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি।
গত ফেব্রুয়ারিতে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রভাবে চামড়া ও চামড়াজাতপণ্য, পাটজাতপণ্য, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য এবং ওষুধ খাতের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে কী ধরনের বিকল্প সুবিধা দেওয়া যায়, তা পর্যালোচনায় আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেই কমিটি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ জমা দিয়েছে।

কমিটি বলেছে, চীনের ‘মেইড ইন চায়না’ এবং ইন্দোনেশিয়ার ‘মেকিং ইন্দোনেশিয়া ৪.০’ উদ্যোগ অনুসরণ করে মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তি আমদানি ও স্থানান্তর, নতুন পণ্যের উদ্ভাবনের বিপরীতে আর্থিক ভর্তুকি দেওয়া এবং গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ের বিপরীতে কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাস্তবতা ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে অন্য যেকোনো উপযুক্ত সুবিধা দিতে পদক্ষেপ নিতে গত ২০ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে ১৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, বাণিজ্য সচিব, শিল্প সচিব, কৃষি সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন।
এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিকল্প কী ধরনের সুবিধা দেওয়া যায় তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পর্যালোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।

চামড়াশিল্পে স্বল্প সুদের ঋণ ও শুল্ক কমানোর প্রস্তাব
চামড়া ও চামড়াজাতপণ্যের রপ্তানি বাড়াতে এ খাতে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণের সুপারিশ করে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি বলেছে, এ সুদহার ব্যাংক রেট প্লাস আড়াই শতাংশ হতে পারে। এছাড়া ট্যানারিশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক আমদানিতে ৩৫ শতাংশ হারে বিভিন্ন ধরনের শুল্ককর রয়েছে, যা কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে। এছাড়া এ শিল্পের জন্য এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা বর্তমানের ২৫ হাজার ডলার থেকে যৌক্তিক হারে বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে কমিটি।
কমিটি বলেছে, চামড়া ও চামড়াজাতপণ্যের কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে চামড়াশিল্পের জন্য একটি ‘কমন ফ্যাসিলিটি’ সেন্টার স্থাপন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার খরচ কমাতে কয়েকটি কারখানা মিলে ১০ হাজার বর্গফুটের ‘ক্রোম রিকভারি প্লান্ট’ স্থাপন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার সহযোগিতা করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়া যেতে পারে।

পাট কেনার ওপর উৎসে কর প্রত্যাহারের সুপারিশ
কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পাট কেনার ক্ষেত্রে ১ শতাংশ উৎসে করের কারণে পাটজাতপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এ কারণে এই কর প্রত্যাহার করতে সুপারিশ করেছে কমিটি। এটি প্রত্যাহার করা হলে কর আদায়ে তার নেতিবাচক প্রভাব খুব সামান্য হবে জানিয়ে কমিটি বলেছে, এতে পাটপণ্যের উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারকরা লাভবান হবেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত বাংলাদেশি পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করলেও প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচাপাট আমদানি করছে। কাঁচাপাট রপ্তানি নিরুৎসাহিত করতে রপ্তানির ওপর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শুল্কারোপ করা যেতে পারে। এতে ভারতে বাংলাদেশি পাটপণ্যের চাহিদা বাড়বে এবং শুল্ক আয়ও বাড়বে।

হিমাগারে কম মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুপারিশ
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফলন-পরবর্তী ক্ষতি কমানো এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন তাপমাত্রার হিমাগার সুবিধা স্থাপন করার ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে। এসব হিমাগার হয় সরকারি উদ্যোগে স্থাপন করতে হবে, না হয় স্বল্প সুদে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে। হিমাগারে কম মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যেতে পারে। এছাড়া অন্যান্য সুবিধার পাশাপাশি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষিপণ্য বিক্রিতেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া বিষয়টি সরকার ভেবে দেখতে পারে।

এপিআই পার্কের কাজ দ্রুত শেষ করার সুপারিশ
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওষুধশিল্পের জন্য রপ্তানিতে সহায়তাকারী প্রি–ফাইন্যান্সিং স্কিমের সীমা ৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকায় উন্নীত করা যেতে পারে। গ্যাস না থাকার কারণে ২০০৮ সালে কাজ শুরু করা মুন্সীগঞ্জের এপিআই পার্কের কারখানা উৎপাদন করতে পারছে না। এর কাজ দ্রুত শেষ করে গ্যাসসহ অন্যান্য সেবা সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করে কমিটি।
কমিটির মতে, এপিআই সরবরাহকারী উৎপাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতাভুক্ত করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আকার ২ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা করা যেতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াতে এ ধরনের স্কিম রয়েছে।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রত্যায়িত, কিন্তু এপিআই নমুনা পরীক্ষা করতে পারে না। এপিআই নমুনা পরীক্ষার জন্য আধুনিক ল্যাবরেটরি টেস্টিং সরঞ্জাম কেনার জন্য বাজেট সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করে কমিটি। এলডিসি উত্তরণের পর পেটেন্টকৃত ওষুধ বাংলাদেশ উৎপাদন করতে পারবে না। তাই এখন থেকেই ওষুধ গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬