পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২ শতাংশ উপার্জিত হয় পাট ও পাটপণ্য থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। পাট থেকে আহরিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে।
একসময় পাট ও পাটজাত পণ্যই ছিল বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত। কালক্রমে তা ফিকে হয়ে এসেছে। এর প্রধান কারণ গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার শিল্পের দ্রুত প্রসার ও পাটশিল্পের স্থবিরতা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে মোট বৈদেশিক আয়ে পাটের হিস্যা ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১.৮৮ শতাংশে। তবে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে অর্জিত নিরষ্কুশ আয় বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। ১৯৭২-৭৩ সালে এই খাত থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ছিল ৩১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৯০৯.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
তবে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে তা ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ওই বছর পাট খাতের মোট রপ্তানি আয় ছিল ১.১৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ০.৯২৫ বিলিয়ন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ০.৯০৯৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। একই সঙ্গে হ্রাস পায় পাটপণ্য রপ্তানির বস্তুগত পরিমাণ। দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাতের অবদান এভাবে ম্লান হয়ে আসা দেশের অর্থনীতির জন্য শঙ্কার কারণ।
প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে পাট খাতের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা সম্ভব না হলে মোট রপ্তানির বহুমুখিতায় বিপত্তি ঘটবে। সেই সঙ্গে গতিশীলতা হারাবে গ্রামীণ অর্থনীতি।
পাট রপ্তানিতে সুদিন ফিরবে কবেস্মরণাতীতকাল থেকেই বাংলাদেশে পাট চাষ হয়ে আসছে। প্রধানত দুই প্রকার পাট বাণিজ্যে ব্যবহৃত হয়। এই দুটি হলো করকরাস ক্যাপসুলারিজ (সাদা) ও করকরাস অলিটোরিয়াস (তোষা)। একসময় এ দেশে উৎপাদিত বেশির ভাগই ছিল সাদা পাট। এখন তোষা পাটের উৎপাদন বেশি। এ ছাড়া বাংলাদেশের সমস্যাবহুল মাটিতে কিছু নিম্নমানের পাট কেনাফ ও মেস্তা চাষ করা হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সেন্ট্রাল জুট কমিটির হিসাব মতে, ১৯৫৮ সালে এ দেশে সাদা পাটের অধীন জমির পরিমাণ ছিল শতকরা ৭৫.৪৮ ভাগ এবং তোষা ২৪.৫২ ভাগ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তোষা পাট শতকরা ৮৯ ভাগ, সাদা পাট চার ভাগ এবং মেস্তা ও কেনাফ সাত ভাগ জমিতে চাষ করা হয়। তোষা পাটের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ১৩.৬৪ বেল, সাদা পাটের উৎপাদন ৯.৭৩ বেল এবং মেস্তা ও কেনাফের গড় উৎপাদন ১০.০৬ বেল। সারা দেশে হেক্টরপ্রতি পাটের গড় উৎপাদন ১৩.২৪ বেল। উত্কৃষ্টতার দিক থেকে তোষা পাট বেশি মানসম্পন্ন। এর দৈর্ঘ্য, উজ্জ্বলতা, কোমলতা ও মসৃণতা বেশি। বাজারে এর দাম বেশি।
বর্তমানে আমাদের কৃষকদের বড় সমস্যা পাট পচানো। বর্ষার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাবে অনেক সময় ঠিকভাবে পাট জাগ দিতে পারেন না কৃষকরা। বিকল্প হিসেবে রিবন রেটিং বা পাটের ছালকরণ ও পচানো পদ্ধতির শরণাপন্ন হন অনেক কৃষক। তবে এ সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণের অভাব প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার মৌসুমের শুরুতে প্রয়োজনীয় পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়ার সমস্যা হচ্ছিল। তবে সম্প্রতিক পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে তা সহজ হয়েছে। পাটবীজের অপ্রতুলতা এ দেশে পাট চাষের আরেকটি সমস্যা। দেশে উৎপাদিত বীজে চাষ হয় প্রায় ২০ শতাংশ জমি। বাকি জমির চাষ হয় আমদানীকৃত বীজ দিয়ে, যার গুণগত মান সম্পর্কে অনেক সময় কোনো নিশ্চয়তা থাকে না ।
নব্বইয়ের দশকে এ দেশে পাটের চাষ হতো প্রায় ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। ক্রমেই তা নেমে আসে সাড়ে চার লাখ হেক্টরে। অতি সম্প্রতি তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ হেক্টরে। তা ছাড়া হেক্টরপ্রতি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এতে পাটের মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে বছরে কমবেশি ৮০ লাখ বেলে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাটের আবাদ হয়েছে সাত লাখ পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে। সম্ভাব্য মোট উৎপাদন দাঁড়াবে ৮৫ লাখ বেলে। এ বছর পাটের উৎপাদন ভালো হয়েছে। দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষকরা। প্রকারভেদে খামার প্রান্তে প্রতি মণ পাটের দাম পাওয়া যাচ্ছে তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকা। পক্ষান্তরে উৎপাদন খরচ দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা। প্রতি মণ পাটে কৃষকদের লাভ এবার গড়ে প্রায় এক হাজার টাকা।
পাটের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারিত হয় মূলত এফওবি নারায়ণগঞ্জ মূল্যের ভিত্তিতে। সে মোতাবেক এখন প্রতি মণ পাটের এফওবি মূল্য প্রকারভেদে চার হাজার ৩০০ থেকে পাঁচ হাজার ২০০ টাকা। এর প্রায় ৮০ শতাংশই পাচ্ছেন উৎপাদনকারী কৃষক। অভ্যন্তরীণ খরচ ও ব্যবসায়ীদের মুনাফা মিলে যাচ্ছে বাকি প্রায় ২০ শতাংশ। সেদিক বিবেচনায় এবার পাটের বাজার দক্ষ। তবে সমস্যা রয়েছে পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে। এতে রপ্তানি আয় কমছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাটি হচ্ছে পাটপণ্যে সীমিত মূল্য সংযোগ ও বহুধাকরণ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণেও পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে না। অন্যদিকে ভারতের অ্যান্টিডাম্পিং নীতির আরোপ ও শুল্ক বৃদ্ধির কারণে কাঁচা পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে। চোরাপথে অবৈধ রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি স্থলপথে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ভারত। আগে বেনাপোল, হিলি ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করা হতো ভারতে। এতে সময় কম লাগত এবং খরচ কম হতো। এখন মুম্বাইয়ের নাভা শেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে তা রপ্তানি করতে হবে। এতে সময় লাগবে বেশি। খরচ বাড়বে। বাংলাদেশ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫৭ কোটি ডলারের পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে ভারতে, যা মোট রপ্তানির ৩.৭৫ শতাংশ। এর মাত্র ১ শতাংশ রপ্তানি হতো সমুদ্রপথে। এখন পুরোটাই নোঙর করবে মুম্বাই সমুদ্রবন্দরে। এতে বাংলাদেশের পণ্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাবে।
দেশের অভ্যন্তরেও পাটপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা বিদ্যমান। এবারের বাজেটে কাঁচা পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে ০.৫ শতাংশ উেস কর আরোপ করা হয়েছে। নগদ সহায়তার ওপর প্রবর্তন করা হয়েছে ১০ শতাংশ কর। বহুমুখী পাটপণ্যের ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। সাধারণ পাটপণ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানি সহায়তা ৭ থেকে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ। পাটের সুতা রপ্তানিতে আগে ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হতো, এখন তা ৩ শতাংশে নামানো হয়েছে। এগুলো পাট রপ্তানিকে নিরুৎসাহ করবে।
আগামী দিনগুলোতে পাট খাতের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য পাটপণ্যের বহুধাকরণ নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানির গন্তব্য সম্প্রসারিত করতে হবে। ভারতের বিভিন্ন শুল্ক ও অশুল্ক বাধার বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প বাজার খোঁজার উদ্যোগ নিতে হবে। অভ্যন্তরীণভাবে পাটপণ্যের ওপর বিভিন্ন কর রহিত করতে হবে। পাটশিল্পের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন মেশিন স্থাপন করতে হবে। পাট খাতে বিনিয়োগ ও রপ্তানি সহায়তা বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকরা বলছেন, ভবিষ্যতে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বছরে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব। তবে সে সুদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
২০২১ সালে বিশ্বে পাটের মোট উৎপাদন ছিল ৩.৪৬ মিলিয়ন টন। ভারতের উৎপাদন ছিল ১.৭২ মিলিয়ন টন এবং বাংলাদেশের উৎপাদন ছিল ১.৬৮ মিলিয়ন টন। বাংলাদেশ ও ভারত মিলে বিশ্বের প্রায় ৯৮ শতাংশ পাট উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করছে। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে এখনো বাংলাদেশের আধিপত্য বিরাজমান। বিশ্বের মোট পাট রপ্তানির ৭৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ। তা ছাড়া ভারত ৪.৮ শতাংশ এবং তানজানিয়া, বেলজিয়াম, কেনিয়া ও মালয়েশিয়া মিলে ১৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কাঁচা পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শরিকানা ৯৭ শতাংশ এবং পাটজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে পাটের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর অনেক দেশে। এর কারণ পলিথিন ও সিনথেটিকের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী নিরুৎসাহ করছেন পরিবেশবাদীরা। পলিথিন ও সিনথেটিক দ্রব্য পচনশীল নয়। পরিবেশের জন্য এগুলো মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যদিকে পাট পরিবেশবান্ধব। তাই এর চাহিদা রয়েছে বিশ্বব্যাপী। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারেও পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে ১৯টি পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগ/থলে/বস্তা ব্যবহারের আইন প্রণয়ন করার কারণে। ভবিষ্যতে পাটের উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ও রপ্তানি আয় লাগাতার বৃদ্ধি পাবে—এই প্রত্যাশা।
লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ