Logo

জুলাই বিপ্লবঃ প্রত্যাশা-হতাশা

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ৫ আগস্ট, ২০২৫
প্রিন্ট তারিখ: ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

‘জুলাই বিপ্লব’ বর্তমান পৃথিবীর সভ্যতার পাতায় রক্ত বর্ণে লেখা শত শত তরুণ প্রাণের মূল্যে অর্জিত এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সভ্যতার ভিত কাঁপিয়ে ফ্যাসিস্ট বিরোধী গণতন্ত্রকামি আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা’র তীব্র আত্মবিশ্বাসে ভরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞার এক হ-ই-চ-ই বিজয়, বিদায় ফ্যাসিস্ট। ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে এই বিজয়- মানব সভ্যতার বিজয়, এই বিপ্লব- মানব সভ্যতার বিপ্লব, মানব সভ্যতার দুর্লভ অর্জন।

জুলাই বিপ্লবে (July Revolution Bangladesh) বাংলাদেশের আপামর জনতা দলমত নির্বিশেষে এক কাতারে ভয়ংকর নিষ্ঠুর ফ্যাসিস্টের রাইফেলের গর্জে ওঠা ব্যারেলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে সমগ্র পৃথিবীকে জানান দিয়েছে ‘স্বাধীনতার স্মরণ’। হাসিনা ও তার পোষ্যদের ক্ষমতার লোভরাজ্য আর তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভূদের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে চুরমার করে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তরে উড়িয়ে দিয়েছে শৃঙ্খল মুক্ত স্বাধীন পতাকা, এনেছে আরেক স্বাধীনতা, ‘৭১ এ লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রায় অস্তমিত সূর্যটাকে এনে দিয়েছেন নতুন ভোর।

দেশপ্রেমিক সকল মানুষ এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পলায়ন ঘটিয়েছে ফ্যাসিবাদের অনন্য উদাহরণ ১৬ বছরের ঘৃন্য এক নাম “হাসিনা শাসন” তথা হাসিনা-জয়-তাপস-নওফেলদের ভীষণ শক্তিশালী নেটওয়ার্কে সৃষ্ট সার্বভৌমত্ব বিলীনকারী আত্মীয়, সন্ত্রাসী এবং লুটেরা সর্বস্ব এক ফ্যাসিস্ট পার্লামেন্টের। এই “পরগাছা পার্লামেন্ট” নিজ দেশের স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে পরিচালিত হতো একটি নির্দিষ্ট ভিনদেশী Directed Prescription দ্বারা। এদের প্রত্যক্ষ মদদে দেশের ভেতরেই গজে উঠেছিল এক অন্য দেশ।

৩৬জুলাই(০৫ আগস্ট ২০২৪) ২০২৪ এ ছাত্রদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এক সফল বিপ্লবের ফলে একটি পুরো পার্লামেন্টসহ হাসিনা গভর্নমেন্টের ঐতিহাসিক নাক্কারজনক পলায়নের পরদিন ০৬ ই আগস্ট রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের ঘোষণায় ১২তম জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি(Dissolution) ঘটে। ০৮ আগস্ট গঠন হয় অন্তর্বর্তী সরকারের।

০৯ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশনের প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব (Doctrine of Necessity) রায়ে বৈধতা পায় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত করে ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বে ২২ জন উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ে ৭ জন বিশেষ সহকারী এবং প্রধান উপদেষ্টার অধীনে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার ৫ জন বিশেষ সহকারি নিয়ে সংগঠন তৈরি হয় অন্তর্বর্তী সরকারের। স্বাধীনচেতা আপামর জনগণ এই প্রতিশ্রুতিশীল সরকারের সামনে রাখে একটি পরিপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার এবং সন্ত্রাস ও দুর্নীতি মুক্ত স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মানের।

ক্ষমতা লিপ্সু স্বৈরাচারী হায়েনা-হাসিনা এবং তার দোসররা দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য ক্রমাগতভাবে চেষ্টা চালিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই, এখনো চালিয়েই যাচ্ছে সকল ধরনের অপচেষ্টা, অপকৌশল ও অপতৎপরতা। চেষ্টা করেছে বিভিন্ন ধরনের ক্যু (Coup) সংগঠিত করে Interim Government-কে উৎখাত করতে। যদিও স্বাধীনতাকামি মানুষ দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে বানচাল করে দিয়েছে তাদের সকল প্রচেষ্টাকে। তারা কখনো কখনো চেষ্টা করেছে সেনাবাহিনীকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার। ব্যর্থ হয়েছে তাদের জুডিশিয়াল ক্যু (Judicial Coup), ব্যুরোক্রেটিক ক্যু (Bureaucratic Coup), আনসার ক্যু (Ansar Coup), ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্যু (Industrial Coup), পুলিশবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা, শ্রমিক অসন্তোষ (Labours Unrest), দেশজুড়ে ইলেকট্রিসিটির কমপ্লিট শাটডাউন, সচিবালয় নিষ্ক্রিয়করণ কর্মসূচি, এবং নানা অজুহাতে তাদের শত শত অসহযোগ আন্দোলন। এখনো থেমে নেই তারা।

ফ্যাসিস্ট গভর্মেন্টের দীর্ঘ বুনিয়াদে তৈরি ও ফেলে যাওয়া মানুষরূপী আবর্জনা গুলো বসে আছে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে- কাজ করে যাচ্ছে রাষ্ট্রকে অকার্যকর করতে। যেমনটি পালিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে শেখ হাসিনা তার পুলিশ বাহিনীর প্রধানকে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটাকে এমন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে, যেন আগামী ২০ বছর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। সেটা অতীব অস্বাভাবিক, ১৬ বছরের অপশাসন বলে কথা। রাষ্ট্রের নিজ শরীরের ভেতরে বেড়ে ওঠা এই অবাঞ্ছিত জঞ্জাল গুলো এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আপদ ও ক্ষতি কারক ক্যান্সার তুল্য। এটা যেন অনেকটাই কুমারী মায়ের গর্ভে অনাকাঙ্ক্ষিত বেড়ে ওঠা প্রতিমুহূর্তের বেদনা।

এই অসহায় দেশ না পারছে এই অপাংক্তেয় গুলোকে ছুড়ে ফেলে দিতে, না পারছে ধারণ করতে। কোথায় নেই এরা? রয়েছে আনসার, পুলিশ, বিজিবি সহ সকল বাহিনীর ভিতরে, প্রশাসনের চূড়া থেকে সর্বনিম্ন গলিতে, ব্যাংক বীমা সহ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে, ব্যবসা-বাণিজ্য-বাজারে সিন্ডিকেট করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ধর্মে অধর্ম হয়ে, রাজনীতিতে অস্থিতিশীল হয়ে, দেশের বাহিরে আর সংবাদ মাধ্যম গুলোতেতো আছেই। বাংলাদেশের আপোষহীন মানুষ ওদেরকে পিতৃপরিচয়হীন জানলেও আপদ গুলো যেন ঠিকই জানে অবৈধ হলেও ওদের পিতা প্রতিবেশী। যদিও সর্বগ্রাসী প্রতিবেশী তার এই অবৈধ পয়দা গুলোকে প্রকাশ্য স্বীকৃতিতো দেয়ই না বরং সুবিধা হাতিয়ে নিয়ে বেমালুম ত্যাজ্য করতে প্রস্তুত থাকে সর্বদা।

ভিনদেশীদের ইন্ধনে সুসংগঠিত এই চক্রটি নিজেদের মধ্যে নিরাভরণ হলেও সমাজে এরা চলছে মুখোশ পরে। প্রতিক্রিয়াশীল গুলো প্রতি মুহূর্তে দেশের ভয়ংকর ক্ষতির প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। Fifth Columnist গুলোর রক্ত কঙ্কালে মিশে আছে দেশদ্রোহিতা, ফাঁসি নয় ওদের প্রাপ্য শুল।

এখন ওরা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থায় তাদের ফ্যাসিস্ট সারমেয়দের সহায়তা সহ আনসার, পুলিশ, বিজিবি এবং সেনাবাহিনীর একটি অংশ সাথে নিয়ে প্রশাসন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের আওয়ামী সুবিধাভোগী ও নেতা-কর্মীকেদেরকে নিয়ে একটি জয়েন্ট ক্যু (Joint Coup) করতে। এই ভয়ংকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে রক্তপাতে রক্ত সমুদ্র হয়ে যাবে, এটা তারা জানলেও অবিবেচক হাসিনা থামছে না এক মুহূর্তও। ওরা অগ্রসর হলে এদেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের মতো একইভাবে অদম্য ঢলের ন্যায় নেমে আসবে, জুলাই বিপ্লবের পরে ওদেরকে নিষ্কৃতি দিলেও এখন যে কুকুরের মত হত্যা করবে; এটা ওরা জানলেও বিদেশি প্রভুদের আঙ্গুলের ইশারায় এগিয়ে চলেছে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের।আমাদের হতাশ হওয়ার কিছুই নেই, তবে করনীয় অনেক কিছু অবশ্যই আছে। সর্বোপরি প্রয়োজন আছে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান, বাহিনী সকল, সকল দলমত এবং দেশ প্রেমিক জনতা সচেতন হয়ে একসাথে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বার্থে কাজ করা।

জুলাই বিপ্লবের আগে ওরা এখনকার চেয়ে সহস্র গুণ বেশি শক্তিশালী ও সংগঠিত ছিল। সর্বশক্তিমান স্রষ্টার দয়ায় এদেশের মানুষ ওদেরকে তুরি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে- এটা কোন শব্দের অলংকরণ নয়, মহাকাব্যের ভাষা নয় বরং চরম বাস্তবতা এবং ঐতিহাসিক সত্য। এটা ইতিহাসের এক Milestone, বিশ্ববাসীর কাছে এক অনন্য নিদর্শন হয়ে আছে A Decent Adamant Revolution হিসেবে।

জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণকে বিশ্ব দরবারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে নতুনভাবে এবং প্রকৃত চরিত্রে। কেননা বিপ্লব পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশ ও নাগরিকরা যে ধরনের উশৃংখল এবং অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায়, বাংলাদেশ তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। কার্যত বিপ্লবের অব্যবহিত পরে তিন থেকে চারদিন সরকার বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব না থাকলেও তখনও জনগণ দৃষ্টান্তমূলক সুশৃংখলভাবে ছিল। সেই চিত্র এ জাতির প্রতিটি নাগরিকের চরিত্রেরই প্রতিফলন। ওই সময় নগণ্য যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে সেগুলো মূলত পতিত ফ্যাসিস্টদের আর্তচিৎকারের ফল। যদিও তারা পরবর্তীতে তাদের প্রকৃত পুরনো সন্ত্রাসী চরিত্রে পুরো জাতির সামনে আবির্ভূত হয়েছে।

রাষ্ট্রদ্রোহী আওয়ামীলীগ নামক এই দলটি তাদের অবৈধ ক্ষমতা হারানোর পরে অতীতের নেক্কারজনক সকল অপকর্মের বিচারের ভয়ে পাগল হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র ধ্বংসের মতো তাদের কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি শেষ করার মত নয়, যেমনঃ শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা, রাষ্ট্র বিরোধী গোপন চুক্তি করা, রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণে অর্থ পাচার করা (শ্বেতপত্র অনুযায়ী প্রতিবছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে ১৫ বছরে প্রায় ২৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), ব্যাংক এবং অর্থব্যবস্থাকে দেউলিয়া করে ধ্বংস করা, বড় প্রজেক্ট এর নামে বড় দুর্নীতি করা(রূপপুর প্রকল্প, পদ্মা ব্রিজ ইত্যাদি), যুব সমাজের মধ্যে হতে দেশপ্রেম স্বত্বা ধ্বংস করা(আবরার সহ অনেক হত্যা), মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ও প্রচার মাধ্যমকে একদলীয়করণ করা, বৈদেশিক ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম ভারসাম্যহীনতা(২০২৩-২৪ সালে বানিজ্য ঘাটতি ৭৪৩ কোটি ডলার), দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও বাজার সিন্ডিকেট লালন, শেয়ার মার্কেট লুন্ঠন করে ধ্বংস করা, অস্থিরতা তৈরি করে পোশাক শিল্প সহ শিল্প কারখানা ও শিল্প বাণিজ্য ধ্বংস করা, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা(২০১৪ সালে ১৫৩ আসনের সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত, ২০১৮ সালে রাতে নির্বাচন), গণতন্ত্র ধ্বংস ও স্বৈরাচার কায়েম, সংবিধান পরিবর্তনে স্বেচ্ছাচারিতা (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল), দলীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ধর্ষণ এবং হত্যা, ২০০৯ সালে বিজিবি হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বিজিবি এবং সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করন, সকল ক্ষেত্রেই মিথ্যা তথ্য প্রচার করে জাতিকে বিভ্রান্ত রাখা, ইসলামী বুদ্ধিজীবীদের কে বিভিন্ন মিথ্যা অজুহাতে ফাঁসি দেয়া, আয়না ঘর তৈরি করে ভিন্নমত দমন, বিচার এবং শাসন ব্যবস্থা ধ্বংস করা, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী সমূহকে দলীয় অন্যায় কাজে ব্যবহার করা, পদোন্নতি প্রলোভনের মাধ্যমে প্রশাসনকে দলীয়করণ করা, জনসংখ্যার ৯০ ভাগের উপরে মুসলিম হলেও ইসলাম ধর্ম পালনে বাধা প্রদান করা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিষয় উপেক্ষা করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লোভে ভারতের স্বার্থে “রেল চুক্তি” সহ ভারতের সাথে বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্র বিরোধী গোপন চুক্তি করন, নিত্য নৈমিত্তিক ভাবে হত্যা এবং গুম সহ আরো অসংখ্য অন্যায় এবং অনিয়ম। সর্বোপরি আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার শাসন হয়ে উঠেছিল দেশের স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতের সাম্রাজ্যবাদী হীন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন মেশিন হিসেবে। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোন মতামত যা ভারতের বিপক্ষে যায় এমন সকল ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ সরকার বল প্রয়োগ করে যেকোনো ব্যক্তিকেই শেষ করে দিয়েছে, হোক সে কোন বাহিনীর সদস্য, ছাত্র, প্রশাসন কিংবা যেকোনো শ্রেণী পেশার। একটি স্বাধীনচেতা জাতিকে এভাবে নিষ্পেষিত করার ফলেই ভিতরে ভিতরে ফুসে ওঠা পুঞ্জিভূত আগুনের অগ্নি বিপ্লবীই- জুলাই বিপ্লব।

বিপ্লব পরবর্তী সময়ে সমগ্র জাতি উচ্চ আশা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তথা বিশ্ব বরেণ্য নোবেল বিজয়ী মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ডঃ ইউনুসের নিকট কিছু মৌলিক ও ন্যায্য চাহিদা বাস্তবায়নের প্রতীক্ষায় ছিল। যেমনঃ স্বল্পকালীন দক্ষ সরকার ব্যবস্থা, স্থিতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই বিপ্লব ও তৎপুর্ব সকল হত্যা ও গুমের বিচার, রাষ্ট্রীয় অর্থ পাচার ও লোপাটের তথ্য প্রকাশ ও বিচার, অবৈধ নির্বাচনের বিচার, রাষ্ট্রের স্বার্থ বিরোধী সকল চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ ও বাতিল করন, কোমলমতি তরুণ প্রজন্মকে আওয়ামী তথা “দেশবিরোধী-সন্ত্রাসী” মতাদর্শ হতে রক্ষা করা, প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের খসড়া প্রস্তুত করত সেটা বাস্তবায়নের ধাপ বা পর্যায় সমূহ জাতির সামনে প্রকাশ করে রাখা, জাতিকে যথাদ্রুত গণতান্ত্রিক প্রকৃয়ার ভিতর নিয়ে যাওয়া এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে জনগণের সরকারের নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করা।

নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় অন্তর্বর্তী সরকার কাঙ্খিত সকল বিষয়েই প্রশ্নবিদ্ধ এবং জাতির আশা পূরণে মোটেই সফলতা অর্জন করতে পারেনি, কার্যত জাতি এখন হতাশায় নিমজ্জিত, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতার মোহে পদস্খলিত হয়ে জাতির কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সংস্কারের ধুয়া তুলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা গণের প্রকাশিত মনোভাবে স্পষ্ট হয়েছে যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ নির্বাচন তাদের কাছে মুখ্য নয়, আর বিগত এক বছর সময় অন্তর্বর্তী সরকার জাতির জন্য বিশেষ কি কি কাজ করতে পেরেছে তাও জাতির কাছে স্পষ্ট নয়। তবে এটা স্পষ্ট যে গণতন্ত্র হত্যা করে হলেও তারা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায়ই থাকতে চায়। ফলাফল “তথৈবচ”।

এছাড়াও অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যায্য এবং অগ্রহণযোগ্য বিশেষ কিছু দুর্বলতা বিপ্লবীদের কে ব্যথিত করেছে এবং জাতিকে ফেলে দিয়েছে হতাশার গহীনে। যেমনঃ
বিপ্লব পরবর্তী উত্তরণ পরিকল্পনা না থাকা, বিপ্লব পরবর্তী অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা , রাষ্ট্রদ্রোহীতা দমনে দুর্বলতা, জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতি না থাকা, ক্যু রোধে কঠোরতা প্রদর্শন না করা, সারাদেশে চাঁদাবাজির ব্যাপক প্রশ্রয় প্রদান, বিপ্লব পরবর্তী সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বৃহত্তর দল বিএনপি-কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পরিকল্পিত ছক করা, দায়িত্বের পরিবর্তে দীর্ঘকাল ক্ষমতাধর হয়ে থাকার হীন প্রচেষ্টা।

জাতি নিঃসন্দেহে একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই সময় প্রয়োজন একটি নিঃস্বার্থ নেতৃত্বে- সরকার, সকল বাহিনী, প্রশাসন, জনগণ এবং সকল রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে জাতিকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়া। যথা দ্রুত সম্ভব একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করা। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার লক্ষ্যে সকল ধরনের পদক্ষেপে অবিচল থাকা। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের হুমকি পর্যালোচনা সাপেক্ষে দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত সামরিক শক্তিকে উন্নত করার আধুনিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। সর্বদা সজাগ থাকা ফ্যাসিস্টের জঞ্জাল গুলোর কার্যকলাপ সম্বন্ধে।

জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী বিভিন্ন অধ্যায়ে আমরা কুলাঙ্গার গুলোকে দেখেছি ও চিনেছি ওদের বিভিন্ন কার্যকলাপে, ওদেরকে দেখেছি প্রশাসনের স্থবিরতায়, সকল গোয়েন্দা বিভাগের নিষ্ক্রিয়তায়, সকল বাহিনীতে কিছু অস্থিরতায়, শিল্প কলকারখানায় বিশৃঙ্খলায়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেনা আর অচলাবস্থায়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা বিভ্রাটে, বিদেশ আর মিডিয়ায় অপপ্রচারে। আমরা এখন প্রতিমুহূর্তে সতর্ক থাকবো, প্রস্তুত থাকবো ওদেরকে যে কোন মূল্যে চরমভাবে প্রত্যাঘাত ও প্রতিহত করতে, Retailiate করতে, জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে ঐতিহাসিক উচিৎ শিক্ষা দিতে। এখনো ফ্যাসিস্টদের স্বার্থ রক্ষাকারীদের মধ্যকার সামান্য কিছু সদস্যের ছাটাই ও বিচার হয়েছে প্রশাসনে কর্মরত বিভিন্ন স্তরে, সামান্য ছাটাই হয়েছে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের, পালিয়ে গেছে বিভিন্ন বাহিনীতে থাকা ফ্যাসিস্টের ইন্ধনে চলা কিছু দোসর। কোন কোন বাহিনীতে হয়তো বিচার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সেনাবাহিনী নিশ্চয়ই প্রস্তুত আছে দেশ ও জনগণকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে, জনগণের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ওদেরকে চিরদিনের জন্য ধুলোয় মিশিয়ে দিতে, বিপ্লব পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকল কার্যকলাপের যথাযথ বিচার সম্পন্ন করতে সহায়তার নিমিত্তে। সর্বোতভাবে সেনাবাহিনীও নিশ্চয়ই সতর্ক আছে কুচক্রী গুলোর ফাঁদে না পরতে। কারণ ওরা সেনাবাহিনীর একটি অংশকে আলাদা করে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাবহার করতে তৎপর রয়েছে।

সকল মহল সাথে সেনাবাহিনীর কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের মতামতেও প্রকাশ পায় যে, সেনাবাহিনীর Senior Officer-দের বড় এবং শক্তিশালী একটা অংশ এখনো ফ্যাসিস্টদের আজ্ঞাবাহ হিসেবে কাজ করছে যা পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়াগুলো জানান দিয়ে যাচ্ছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহ। যারা বিভিন্ন ডিভিশনের এবং ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছে বলেই তথ্য পাওয়া যায়। সেনাপ্রধান নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে কাজ করবেন এবং দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনীকে ফ্যাসিস্ট এবং তাদের বিদেশি প্রভুদের ছায়ামুক্ত রাখবেন । প্রয়োজন রয়েছে ফ্যাসিস্টের দোসর দালালদের পঁচা অংশ কেটে ফেলার, সেটাও তিনি নিশ্চয়ই করবেন যথাশীঘ্রই। সামরিক বাহিনীর দিকে জাতি সদা তাকিয়ে আছে।

ইউনুস গভর্নমেন্ট নিশ্চয়ই বিষয়টি যথাযথ আমলে নিয়ে গুরুত্বের সাথে কার্যকর ব্যবস্থা নিবেন এবং জাতি-কেও সতর্ক করবেন। কেউ কোনভাবেই যেন কুচক্রী মহলের দুর্ভিসন্ধির শিকার না হন।
ইউনুস গভর্নমেন্ট এব্যপারে কুটনৈতিক সহায়তা গ্রহণ অব্যহত রাখা এবং আরো জোরদার করলে প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্ত নস্যাত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের উচিৎ হবে সকল গোয়েন্দা সংস্থা গুলোকে সরকারি বিস্তারিত নির্দেশে সচেতন করা এবং নিয়মিতভাবে সবিস্তারে তাদের রিপোর্ট গ্রহণ করা।

সকল বাহিনী, প্রশাসন এবং প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা গুলোকে সতর্ক রাখা। সবচেয়ে বড়,জনপ্রিয় এবং জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক জনগণের শক্তির স্থান বিএনপি নিশ্চয়ই মাঠ পর্যায়ে সকল স্তরের জনগণকে নিয়ে সদা সক্রিয় থাকবে ফ্যাসিস্টদের দোসর দালালদের প্রতিহত করতে। দেশের স্বার্থে বিএনপি এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই সকল দল-মহলকে একসাথে নিয়ে হায়েনা-হাসিনার বিদেশি রক্তের অবাঞ্ছিত পয়দা রাষ্ট্রদ্রোহী (দুঃখ প্রকাশ করছি কিছু ‘শব্দ’ ব্যবহারের জন্য-তবে রাষ্ট্রদ্রোহীদের জন্য এর চেয়ে ভালো শব্দ পাইনি) গুলোকে যেকোন মূল্যে প্রতিহত করবে। একই সাথে বিএনপি নিশ্চয়ই সবচেয়ে বেশি নজর রাখবে নিজের দলের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম রোধে এবং দলের সকল স্তরে উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী ও যোগ্যতা সম্পন্ন নেতৃত্ব বাছাইতে দৃষ্টান্তমূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ও কঠোর অবস্থানের।কেননা হীন-স্বার্থ-পূর্ণ দুর্বল নেতৃত্ব, চাঁদাবাজি এবং অন্তর্কোন্দল বিএনপিকে কার্যত জনগণ হতে ক্রমাগতভাবে বিচ্ছিন্ন করা সহ ভীষণ ভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে সেই সাথে জনগণকে তীব্র ভাবে হতাশ করছে। অন্যান্য দলগুলোরও রয়েছে একই রকম যথাযথ দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্বশীলতা।

সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় সকল সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান এবং সকল স্তরের জনগণের অংশীদারত্বের ব্যপক প্রসারই পারে রাষ্ট্র বিরোধী সকল সন্ত্রাস, অপতৎপরতা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতা রুখে দিতে, দেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে, যথাদ্রুত দেশকে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে নিতে তথা নির্বাচিত সরকারের কাছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হস্তান্তর করতে এবং দেশ ও বিশ্ববাসীর কাছে জুলাই বিপ্লবকে সফল করতে। জুলাই বিপ্লবের আত্মোৎসর্গকারী সর্বোচ্চ মর্যাদার বীর শহীদগণ, ত্যাগী-পঙ্গুত্ব বহনকারী সকল বীর, সরাসরি কিংবা আত্মিকভাবে সম্পৃক্ত সকলের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
জুলাই বিপ্লব সফল হোক।

লেখকঃ এম.আই.টি এজে

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬