Logo

বন্যা আতঙ্কে তিস্তাপারের লাখ লাখ মানুষ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৫
প্রিন্ট তারিখ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

এবার বন্যা আতঙ্কে ভুগছেন তিস্তাপারের লাখ লাখ মানুষ। বন্যার মৌসুম এলেই তাদের নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়—কখন যে ভারত পানি ছেড়ে দিয়ে তাদের ভাসিয়ে দেয়। তিস্তার উজানে গজলডোবা ব্যারাজ নামক স্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার পানি ভারত তাদের খেয়াল-খুশিমতো নিয়ন্ত্রণ করেই যাচ্ছে । এই ঘটনা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং প্রতিবেশী দেশ ভারতের অমানবিক আচরণের প্রমাণ। শুকনো মৌসুমে ভারত তিস্তা নদীর ওপরের বাঁধগুলো বন্ধ করে রাখে, যার ফলে বাংলাদেশে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। আর বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে বন্যার সৃষ্টি করে। এই ‘বন্ধুত্বের’ নামে চলছে দীর্ঘদিন ধরে এই অমানবিক খেলা। ভারতের এই আচরণ শুধু বিষম ব্যবহারই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিরও চরম লঙ্ঘন।

এদিকে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ উত্তর জনপদের বৃহত্তর রংপুরসহ আশপাশের চার-পাঁচ জেলার অনাবাদি জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বাড়তি ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে নির্মিত হলেও সুষ্ঠু ব্যবহারের অভাবে এটি উত্তরের মানুষের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে।

প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৯০ সালে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের পিত্তিফাটা নামক স্থানে তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়। ১৯৯০ সালের ৫ আগস্ট এর উদ্বোধন করা হয়। এটি স্থানীয়দের কাছে ডালিয়া ব্রিজ নামেও পরিচিত। নির্মাণকালে প্রকল্পে ব্যারাজের পূর্ব ও পশ্চিম তীর রক্ষা বাঁধের কথা থাকলেও সে সময় শুধু পশ্চিম তীর রক্ষা বাঁধ নির্মিত হয়, কিন্তু পূর্ব তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।

তিস্তা ব্যারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ৬১৫ মিটার দীর্ঘ এ ব্যারাজে ৫২টি গেট রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি গেট তিস্তা নদীর মূলধারা প্রবাহের এবং বাকি আটটি সেচ প্রকল্পের জন্য তৈরি করা হয়। সেচ প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি সিল্ট ট্র্যাপ খনন করা হয়।

সূত্র জানায়, ব্যারাজের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ৫২ দশমিক ৪০ সেমি। স্বাভাবিক সময়ে পানিপ্রবাহ ২০ হাজার কিউসেক ধরা হলেও চার লাখ কিউসেক পর্যন্ত পানি ধারণক্ষমতা রয়েছে এ ব্যারাজের। তবে পানি এর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেলেও ব্যারাজ রক্ষার লক্ষ্যে লালমনিরহাট অংশে করা হয়েছে বাইপাস সড়ক।

অপরদিকে বাকি ৪৪টি গেট দিয়ে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি তিস্তার মূলধারায় প্রবাহিত হয়। কিন্তু পূর্ব তীর রক্ষা বাঁধ না থাকায় এ সময়ে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামসহ এ অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। নষ্ট হয়ে যায় বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য ও ফসল। একই রকম দুর্ভোগ বজায় থাকে শুষ্ক মৌসুমেও। এ সময় খরা আর তিস্তায় পানি না থাকায় মরুভূমিতে পরিণত হয় লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জেলার বৃহৎ এলাকা।

বিশেষ করে তিস্তার উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নামক স্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মানুষজন। তিস্তাকে বলা হয়ে থাকে উত্তর জনপদের জীবনরেখা। সেই তিস্তার বুকে ভারতীয় অংশে টইটম্বুর পানি থাকলেও একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে এর বাংলাদেশ অংশ শুষ্ক মৌসুমে মরা খালে পরিণত হয়। ফলে এ সময় এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য অস্তিত্ব সংকটের হুমকিতে পড়ে। আর এ নদীর জলরাশির ওপর জীবিকা নির্ভর করা লাখো মানুষের জীবন হয়ে পড়ে বিপন্ন।

পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুঁয়েমি, অনৈতিক ঢিলেমি আর হঠকারিতায় তিস্তাতীর ও এর আশেপাশের প্রকৃতি শুষ্ক মৌসুমে রুক্ষ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বর্ষায় ভারত বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য গজলডোবার সব গেট খুলে দেয়। তখন মূল গতিপথ বদলিয়ে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ভাঙে বসতভিটা বিলীন হয় ফসলি জমি। প্রতিবছর নিঃস্ব হতে থাকে হাজার হাজার পরিবার। আবার ঠিক শুষ্ক মৌসুমে প্রশস্ত তিস্তা শুকিয়ে যেন হয়ে যায় মরা খাল। এ সময় মাইলের পর মাইল ধু-ধু বালুচর পায়ে হেঁটে মূল ভূখণ্ডে আসতে হয় চরাঞ্চলের মানুষকে।

শুধু তা-ই নয়, মৎস্যজীবীরা তাদের বাপ-দাদার পুরোনো পেশা ছেড়ে দিনমজুরের কাজ নেয়, কিংবা গ্রাম ছেড়ে কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমায় । ছোট ছোট খেয়াঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে অচল হয়ে পড়ে, হারিয়ে যায় রঙিন পালের নৌকা আর সেই চিরচেনা ভাওয়াইয়ার সুর।

কৃষিকাজে সেচ স্বাভাবিক রাখতে যে পানি দরকার, নদীতে সেই পানি থাকে না। এমনকি নদীর অস্তিত্ব রক্ষার পানিটুকুও পাওয়া যায় না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় প্রয়োজনমতো পানি পাওয়া যায় না, আবার বর্ষা এলেই পানিতে ভেসে বেড়াতে হয় তিস্তাপারের মানুষকে।

এদিকে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলায় ১৭০ কিলোমিটার তিস্তা নদীর এই করুণ দশার জন্য ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার দায়ী বলে জানিয়েছেন তিস্তাপারের ভুক্তভোগী মানুষ।

প্রতিবছরই লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার ২৬টি ইউনিয়নের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বর্ষাকালে বন্যা, পানিবন্দি অবস্থা ও নদীভাঙনের মধ্যে টিকে থাকছে। অপরদিকে শুষ্ক মৌসুমে মরুময়তার সঙ্গে নিত্য লড়াই করতে হয় তাদের। শুধু নদী রক্ষা বাঁধ না থাকায় তিস্তা ব্যারাজের বৃহৎ সুফলের ছিটেফোঁটাও পাচ্ছে না এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও কৃষক।

তথ্যমতে, ব্যারাজ নির্মাণের ৩৪ বছরে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি তিস্তাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনাবাদি হয়েছে প্রায় দেড় লাখ হেক্টর আর বালুচরে পরিণত হয় এক লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি। এ সময়ে গৃহহারা হয়েছে প্রায় লাখো মানুষ।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬