ভারত-পাকিস্তানের স্থল ও আকাশপথের যুদ্ধের প্রথম দিনে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সূচকে বড় ধরনের দরপতন নিশ্চিতভাবেই দুশ্চিন্তার। ভারত ও পাকিস্তানের শেয়ারবাজার এই যুদ্ধের কারণে মূলধন হারিয়েছে। বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক কমেছে আগের দিনের চেয়ে ১৫০ পয়েন্ট।
আতঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাবে বা লোকসান বেড়ে গেলে বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই ভাবনা থেকেই বেশি শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যাওয়ায় দামও কমে গেছে। এমনিতেই বাজার এখন কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শোচনীয় পরিস্থিতিতে আছে।
শেয়ারবাজার সূচকের ওঠানামা দেখে অর্থনীতির পারদ কোথায় গিয়ে থামবে আর কতটুকু চড়বে তার ধারণা করেন অনেকে। পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিবেশী পাক-ভারত যুদ্ধের দামামা মানুষের অর্থচিন্তাকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। জীবনযুদ্ধে পোড় খাওয়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এই আতঙ্ককে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখনো চলছে। পৃথিবীর অন্য দেশের অর্থনীতি যুদ্ধ শুরুর বছর পরেই তাদের ক্ষতি পুষিয়ে স্বাভাবিক ধারায় ফিরতে পারলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো সেই ক্ষতি বয়ে বেড়াচ্ছে। ডলার সংকট থেকে আমদানি সংকট, এর সূত্র ধরে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির বেসামাল চাপ এখনো সামাল দিতে পারেনি সরকার। গত কয়েক বছরে বেতন বা মজুরি থেকে মানুষের আয় না বাড়লেও পণ্যমূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষ অনেকটাই কোনঠাসা। দারিদ্র্যও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ খাদের কিনারে থাকা অর্থনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে—তার আগাম ধারণা পুরোটা দেওয়া না গেলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো নানা বিষয় আছে।
বৃহৎ অর্থনীতির প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়ার ফলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য অনেকটাই ভারত নির্ভর। এ দেশের শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্যেরও কম খরচের যোগানদাতা ভারত। কিন্তু যুদ্ধের ফলে যদি ভারতে পণ্যের যোগান কিংবা উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে তা একটা অশনিসংকেত বটে। যদিও ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি খুব বেশি নয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করে তুলা। এই তুলার সাথে বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্প ও তৈরি পোশাক রপ্তানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এর পরেই রয়েছে খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসহ নানা ধরনের পণ্য।
পরিসংখ্যান বলছে, -২৪ অর্থবছরে ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার, যা মোট আমদানির ১৪.৩ শতাংশ। ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হলেও দেশটি থেকে বাংলাদেশের আমদানি কমেনি, উল্টো বেড়েছে।
দেশের বাজারে ভারতের চালের নির্ভরতা বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে এই নির্ভরতা আরো দীর্ঘায়িত হবে। এমনিতেই চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের কৃষকরা ধান চাষ কমিয়ে দিয়ে ভুট্টা বা রসুন-পেঁয়াজের মতো অর্থকরী ফসল চাষের দিকে মনোযোগ বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি ভারত থেকে আমদানি বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে ক্ষতির শিকার হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি।
তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে কি বাংলাদেশে চাল, পেঁয়াজসহ অন্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে? সহজ বিকল্প পণ্যবাজার চীন বাংলাদেশকে কতটুকু সহযোগিতা করতে পারবে? ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ১৬.৬৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা ওই বছরের মোট আমদানির ২৬.৪ শতাংশ। আর পাকিস্তান থেকে আমদানি ছিল মাত্র ৬২৭.৮ মিলিয়ন ডলার, যা মোট আমদানির ১ শতাংশ। যদিও উদীয়মান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান বাংলাদেশর অন্যতম রপ্তানি গন্তব্যও বটে।
কিন্তু যুদ্ধের কারণে পাকিস্তান থেকে আমদানি-রপ্তানির ক্ষতি সামাল দেয়া গেলেও, ভারতের সাথে আমদানি-রপ্তানি সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা বাংলাদেশের স্বার্থেই খুব গুরুত্বপূর্ণ।
লিখেছেন : ইব্রাহিম পাঠান , ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব ।