Logo

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে এবার যুক্ত হলো নারায়ণগঞ্জ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
প্রিন্ট তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬

ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। বরং নতুন করে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা। বিক্ষোভের পাশাপাশি সড়ক, মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগও অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগে পাঁচটি মামলা হয়েছে। এই মামলায় ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়ক দীর্ঘক্ষণ অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকরা। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরাও ঢাকা-কাঁচপুর মহাসড়কও অবরোধ করেন। গাজীপুরে পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর ও একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। আগুন দেওয়া হয়েছে একটি কাভার্ড ভ্যানসহ আরেকটি গাড়িতে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের এই আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে কার্যক্রম কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ডিসেম্বরকে সামনে রেখে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে বলে সরকারের একাধিক মন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমেদ গতকাল বলেছেন, এই আন্দোলনে কিছু শিল্প মালিক, সাবেক এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রীদেরও ইন্ধন রয়েছে। পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া কথা ফেসবুকে স্বীকার করায় রাজীব চন্দ্র দাস নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ।

পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন-ভাঙচুরের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। গত রবিবার দুপুরে ঐ ভাঙচুর ও আগুনের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গতকাল সোমবার এসব মামলা করে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, পাঁচটি মামলার প্রতিটিতে অজ্ঞাতনামা ১ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে গতকাল সকালে বিচ্ছিন্নভাবে সড়কে নামার চেষ্টা করেছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার একটি গলি দিয়ে শ্রমিকেরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের কয়েকটি শেল ছোড়া হয়। পরে শ্রমিকরা সেখান থেকে সরে যান। এছাড়া সকালে রূপনগর এলাকা থেকে শ্রমিকেরা বিচ্ছিন্নভাবে মিরপুর ২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রশিকা মোড়ের দিকে আসতে থাকেন। তারা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয়। মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের টানা দুই দিনের বিক্ষোভ-সংঘর্ষের পর গতকাল সকাল থেকে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সকাল থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা যায়। গোলচত্বরে পুলিশের দাঙ্গা দমনের যান, জলকামানসহ বিভিন্ন যান প্রস্তুত রাখা হয়। মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের পরিস্থিতি ও পুলিশের সতর্ক অবস্থান নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম প্রিভেনশন-উত্তর) মহিদুল ইসলাম।

মহিদুল ইসলাম বলেন, মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। গত রবিবারের সংঘর্ষ ও পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত, তা শনাক্তে তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ পুলিশের বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় শুধু শ্রমিকেরাই জড়িত ছিলেন, এমন নয়। তদন্তে শ্রমিকদের পাশাপাশি অন্য অপরাধীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শ্রমিক অসন্তোষে বন্ধ ৬৭০ কারখানা-বিজিএমইএ
আন্দোলনের মুখে দেশের প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলে চরম শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এবং শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বের হয়ে যাওয়ায় রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ এবং সাভার-আশুলিয়া-জিরানী অঞ্চলের ৬৭০টি পোশাককারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কাজ না করেই কারখানা থেকে বাসায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিক। গতকাল বিজিএমইএ এ তথ্য জানিয়েছে।

তাদের তথ্য অনুযায়ী বেলা সাড়ে ১১টার হিসাব অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলে মোট ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে ১ হাজার ৪৬৪টি খোলা ছিল। শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে। সেখানকার ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টির শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বের হয়ে যান। ফলে এ দুই এলাকায় কাজ না করে ফিরে গেছেন ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭২ জন শ্রমিক। একই চিত্র সাভার-আশুলিয়া ও জিরানী এলাকাতেও। সেখানে ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ২২৩টি কারখানায় কাজ বন্ধ রয়েছে এবং কাজ না করে ফিরে গেছেন ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫০ জন শ্রমিক। এছাড়া রাজধানী মিরপুরে ৩২০টি কারখানার মধ্যে ৬৫টির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে কাজ না পেয়ে বাড়ি ফেরেন ৫৩ হাজার ৪৫০ জন শ্রমিক।

অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের ছাড় নয় —ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি
গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রমিক আন্দোলনের নামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান। গতকাল সোমবার বিকালে সাভারের বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। নাশকতাকারীদের শনাক্ত করতে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে। গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী যে দলেরই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন শ্রমিকদের কাজে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পুলিশ। কেউ বিভ্রান্ত বা চাপ সৃষ্টি করলে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। পাশাপাশি কারখানা মালিকদের প্রতিষ্ঠান চালু রাখার আহ্বান জানিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাসও দেন তিনি। তিনি আরো বলেন, ঢাকা জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, এপিবিএন ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন। সিসিটিভি ও বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আশুলিয়ায় শ্রমিক-পুলিশের সংঘর্ষ
শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে গতকাল সোমবারও দিনভর উত্তপ্ত ছিল সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষে শিল্প পুলিশের এক সহকারী পুলিশ সুপারসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। নরসিংহপুরে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় নাশকতার অভিযোগে কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে নিশ্চিন্তপুরের নিউ এইজ কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়ে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তারা বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে জড়ো হন। পরে আশপাশের বিভিন্ন কারখানার সামনেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শ্রমিকরা হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। একপর্যায়ে তারা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করলে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। বেলা ১১টার দিকে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করলে শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদ, পথচারী ও শ্রমিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে আটকের ঘটনায় তারা নিন্দা জানাচ্ছেন।

আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম বলেন, কারখানায় ভাঙচুর ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে তিন জনকে আটক করা হয়েছে।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড সাড়ে ৫ ঘণ্টা অবরোধ
আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনের রেশ এবার নারায়ণগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়েছে। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সোমবার রাস্তায় নেমে আসে নগরের বিভিন্ন গার্মেন্টে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক। বেলা ১১টা থেকে শ্রমিকরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করে। ফলে লিংক রোডে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। লিংক রোডের শিবু মার্কেটে অবস্থিত ওভারপাসও শ্রমিকদের দখলে চলে যায়। ফলে সড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। এতে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ পায়ে হেঁটেই রওনা হন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। সড়ক অবরোধের সাড়ে ৫ ঘণ্টা পর বিকাল সাড়ে ৪টায় শ্রমিকরা রাস্তা থেকে সরে গেলে সড়কে যান চলাচল শুরু হয়।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে এ আন্দোলনে ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকার মেট্রো নিটিং, পলমল গার্মেন্ট, আবির ফ্যাশন, আজাদ-রিফাত ডাইংসহ কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা অংশ নিয়েছেন। শিবু মার্কেট এলাকায় অর্ধশত গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আন্দোলনরত শ্রমিকরা লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকার বিভিন্ন অংশে টায়ার জ্বালিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ঐ সময় বেশ কিছু শ্রমিকের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী বলেন, বিকাল সাড়ে ৪টায় শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে পুনরায় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

গাজীপুরে সংঘাত, আগুন
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি ও কালিয়াকৈর (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান, গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। সোমবার সকাল থেকে মহানগরীর নাওজোর, কোনাবাড়ী, ভোগড়া বাইপাস, চৌধুরী বাড়িসহ কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, মৌচাক, সফিপুর ও পল্লীবিদ্যুত্ এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন।

সকাল থেকেই কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক ও পল্লীবিদ্যুত্ এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে কোনাবাড়ী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নিলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা অর্ধশতাধিক যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর করে। বেলা ১২টার দিকে ভোগড়া বাইপাসসহ কয়েকটি স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। নগরীর নাওজোর এলাকায় ফ্লাইওভারের ওপর পশ্চিমপাশে পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে ও জেলা পুলিশের একটি পিকআপে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে সালনা ও ছয়দানা মালেকের বাড়ি এলাকায় পুলিশের ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এছাড়া সফিপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের নিক্ষেপ করা ইটের আঘাতে এক বিজিবি সদস্য আহত হয়েছেন। নাওজোর এলাকায় সময় টিভির রিপোর্টার মেহেদী হাসান ও ক্যামেরাপার্সন আহত হয়েছেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর কাশিমপুর থানা পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করে আন্দোলনকারীরা।

এদিকে, আন্দোলনরত কয়েক জন শ্রমিক অভিযোগ করেন, বহিরাগতরা শ্রমিকদের আন্দোলনে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে। প্রকৃত শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করছেন। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সোমবার সকাল ৮টা থেকে কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও পল্লীবিদ্যুত্ এলাকার বিভিন্ন কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

অপর দিকে মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে বাধা এবং কলকারখানায় ভাঙচুর এড়াতে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা কালিয়াকৈর, সফিপুর, মৌচাক, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, ভোগড়া বাইপাস, নাওজোর ও চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় অবস্থান নেন এবং ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে মিছিল করেন। সকালে গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মেয়র মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নগরীর নাওজোর এলাকায় অবস্থান নিয়ে শ্রমিকদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। তিনি শ্রমিকদের কালকারখানা ও যানবাহন ভাঙচুর থেকে বিরত থাকার আহবান জানান। এছাড়া নগরীর কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারের নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মীরা মহাসড়কে মিছিল ও সমাবেশ করেছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্পরতায় সকাল ১০টার দিকে বিভিন্ন স্থানে অবরোধকারীদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়। তবে কিছু এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল।

মির্জাপুরে এসআইয়ের মোটরসাইকেলে আগুন
আমাদের মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা মীর আনোয়ার হোসেন টুটুল জানান, গাজীপুর মহানগরীর আদালতে একটি মামলার সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার পথে আন্দোলনকারী পোশাকশ্রমিকদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শাকাওয়াত হোসেন ইমতিয়াজ। হামলাকারীরা তার মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছেন। স্থানীয় লোকজন গুরুতর অবস্থাতায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে এবং পরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে তার চিকিত্সার ব্যবস্থা করেন। সোমবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে শিল্পাঞ্চল গাজীপুর জেলার কোনাবাড়ীর বাইমাইল সাইনবোর্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে।

বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে কোনাবাড়ীর বাইমাইল সাইনরোর্ড এলাকায় পৌঁছালে আন্দোলনরত গার্মেন্টস কর্মীরা তার ওপর হামলা চালায় এবং মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি পাশের একটি দোকানে আশ্রয় নিতে গেলে সেখানেও আন্দোলনকারীদের কয়েক জন তাকে মারধর করে। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কোনাবাড়ীর একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মির্জাপুর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে তিনি শঙ্কামুক্ত। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬