Logo

ভারত থেকে আনা চালে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান, বিতরণ স্থগিত

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
প্রিন্ট তারিখ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

ভারত থেকে আমদানি করা চালের নমুনায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান আফলাটক্সিন-এর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর, অবশিষ্ট ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম ও ঢাকার সরকারি গুদামে সংরক্ষিত চালের নমুনা পরীক্ষায় এই বিপজ্জনক আফলাটক্সিন এর সন্ধান মেলে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এড়াতে চালানের বাকি চাল অধিকতর পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান জানান, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হলে চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। তবে পরীক্ষায় যে পরিমাণ উপাদান পাওয়া গেছে, তা সহনীয় মাত্রার মধ্যে রয়েছে।

তিনি আরও জানান, আফলাটক্সিনের মাত্রা সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপোর (সিএসডি) চালের স্তূপ থেকে তিন সদস্যের ব্রি প্রতিনিধিদল নমুনা সংগ্রহ করে।

পরীক্ষায় হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামে রাখা চালের নমুনায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এরপর ওই চালান থেকে গ্রহণ করা ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ স্থগিত করে খাদ্য অধিদপ্তর।

হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান জানান, খাদ্য কর্মকর্তারা এই চালের লট দুবার পরীক্ষা করেছেন। পাশাপাশি ডিপো কর্তৃপক্ষকে চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফল এখনো ডিপোতে পৌঁছায়নি।

চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিবও চাল বিতরণ বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

প্রাথমিক পরীক্ষায় খাওয়ার উপযোগী ঘোষণা

আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার দরে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি করা হয়েছিল। ওই চুক্তির অংশ হিসেবে চাল সরবরাহ করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল।

চূড়ান্ত চালানের প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন চাল নিয়ে ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ জাহাজটি গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে চালের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়।

প্রাথমিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে চালগুলো মানুষের খাওয়ার উপযোগী বলে জানানো হয়েছিল। এরপর ২৪ ও ২৫ জুলাই চাল খালাসের অনুমতি দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরে চালগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের বিভিন্ন সরকারি গুদামে পাঠানো হয়। গুদামে পৌঁছানোর পর চালের একটি অংশের মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কর্মকর্তারা। তাদের কেউ কেউ চালের মান অত্যন্ত নিম্ন বলে উল্লেখ করেন এবং কিছু চাল খাওয়ার প্রায় অনুপযোগী বলে জানান।

নিম্নমানের অভিযোগে বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠানো হয়। বাকি ৯ হাজার ৫শ টন চাল গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে খাদ্য অধিদপ্তর চালের মান নিয়ে নতুন করে পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খান পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চাল বিতরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

আফলাটক্সিন শনাক্তের দাবি মানতে নারাজ সরবরাহকারী

চালে আফলাটক্সিন পাওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাংলাদেশের খাদ্য কর্মকর্তা ও সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগ্রহ করা নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই পরীক্ষায় চাল চুক্তির নির্ধারিত মান পূরণ করেছে বলে জানানো হয়।

ই-মেইলে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা করা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলেও তাদের জানানো হয়েছিল। নিজেদের দাবির পক্ষে তারা সংযুক্ত এসজিএস প্রতিবেদনের পাঁচ ও ছয় নম্বর পৃষ্ঠার কথা উল্লেখ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির আরও দাবি, চালের মান বজায় রাখতে তারা যথাযথ কার্যপ্রণালি অনুসরণ করেছে। চাল বিতরণ স্থগিতের আগে এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো অভিযোগও আসেনি।

অন্যদিকে সরবরাহকারীর শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করেছেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, ‘এমনটা চলতে থাকলে কোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ দেখাবে না, যা দেশকে বিপাকে ফেলবে।’

এদিকে চালের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে সংগ্রহ করা নমুনাগুলো পুরো চালানের প্রকৃত মান তুলে ধরতে পেরেছিল কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এখন পর্যন্ত চালের নমুনায় শনাক্ত হওয়া আফলাটক্সিনের সুনির্দিষ্ট মাত্রা প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে চিহ্নিত চালের বিষয়ে পরবর্তী করণীয় কী হবে, কিংবা অন্যান্য সরকারি গুদামে সংরক্ষিত চালের নমুনাও নতুন করে পরীক্ষা করা হবে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬