শেয়ারবাজারে পাঁচ বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব থেকে মালেক স্পিনিং মিলসের শেয়ার বিক্রির ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শেয়ার বিক্রির নির্দেশ কে দিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট আদেশপত্রের স্বাক্ষর ও নথি আসল কি না এবং বিক্রির অর্থ কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এ ঘটনায় সিটি ব্রোকারেজ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের ভূমিকাও তদন্ত করা হবে।
সম্প্রতি বিএসইসির বাজার গোয়েন্দা ও তদন্ত বিভাগ এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে। গঠিত তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল ইসলাম। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শেয়ার বিক্রির নির্দেশ কে দিয়েছিল
বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, সিটি ব্রোকারেজের দাবি, তারা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কাছ থেকে শেয়ার বিক্রির নির্দেশ পেয়েছিল। তবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ক্যাপিটাল এ ধরনের নির্দেশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, পাঁচ বিনিয়োগকারীর অভিযোগ, তাঁরা শেয়ার বিক্রির অনুমতি দেননি।
দুই প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের মধ্যে এ অসংগতি কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ করে, শেয়ার বিক্রির নির্দেশের প্রকৃত উৎস, অনুমোদন এবং লেনদেন সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখবে তদন্ত কমিটি।
আদেশপত্রের সত্যতা যাচাই হবে
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিতর্কিত শেয়ার বিক্রির আদেশপত্রের সত্যতা যাচাই করা হবে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের কাছে থাকা মূল আদেশপত্র পরীক্ষা করে দেখা হবে, কখন সেটি তৈরি হয়েছে, কে স্বাক্ষর করেছেন, তারিখ ও ক্রমিক নম্বর কী এবং কীভাবে তা সিটি ব্রোকারেজের কাছে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া সিটি ব্রোকারেজের জমা দেওয়া কপির সঙ্গে মূল নথির মিল রয়েছে কি না, তাও যাচাই করা হবে। আদেশপত্রগুলো নির্ধারিত সময়ে তৈরি হয়েছিল, নাকি পরে তৈরি, পরিবর্তন বা জাল করা হয়েছে কিংবা আগের তারিখ দেখিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় থাকবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হবে।
বিক্রির অর্থ কোথায় গেছে, খতিয়ে দেখবে কমিটি
শুধু শেয়ার বিক্রির নির্দেশ নয়, বিক্রির অর্থ কোথায় জমা হয়েছে এবং কীভাবে হিসাবের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে, তা-ও তদন্ত করবে বিএসইসি। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ক্যাপিটাল নির্দেশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও কী পরিস্থিতিতে শেয়ার নিষ্পত্তির জন্য সরবরাহ করেছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট লেনদেন, শেয়ার স্থানান্তর, নিষ্পত্তি, হিসাবের খতিয়ান এবং অর্থ সমন্বয়ের নথি পরীক্ষা করা হবে। বিক্রির অর্থ কোনো মার্জিন দায়ের বিপরীতে সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, সেটিও নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি পাঁচ বিনিয়োগকারীর শেয়ারে বিক্রির ওপর কোনো মেয়াদি নিষেধাজ্ঞা বা লক-ইন ছিল কি না, এসব শেয়ারের বিপরীতে মার্জিন ঋণ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং জামানত হিসেবে শেয়ার ব্যবহার ও বিক্রির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান মানা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হবে।
দায় নির্ধারণ হবে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা দেখে
তদন্তে সিটি ব্রোকারেজ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, সংশ্লিষ্ট ব্রোকার বা লেনদেনকারীদের পাশাপাশি দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকাও পরীক্ষা করা হবে। শেয়ার বিক্রির আদেশ তৈরি, অনুমোদন, পাঠানো ও কার্যকর করার প্রতিটি ধাপে কার কী দায়িত্ব ছিল, তা নির্ধারণ করবে তদন্ত কমিটি।
অননুমোদিত লেনদেন, যোগসাজশ, নথি জাল বা পরিবর্তন, অবহেলা কিংবা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রমাণ রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে।
শেয়ারবাজার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ১৭(ক) ধারায় এ তদন্ত পরিচালিত হবে। কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণ, আর্থিক প্রভাব পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে তদন্ত কমিটি।