শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক অবস্থায় একাধিক ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। এক বছরে কোম্পানিটির বকেয়া ও অমীমাংসিত বিমা দাবির দায় বেড়েছে সাড়ে চার গুণের বেশি। একই সময়ে মূল বিমা ব্যবসার মুনাফা কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ, কমেছে নিট প্রিমিয়াম আয়ও। অন্যদিকে, কোম্পানির এফডিআরের উল্লেখযোগ্য অংশ একটি ব্যাংকে রাখা হয়েছে। এসব বিষয়কে উচ্চ ঝুঁকির নিরীক্ষা ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নিরীক্ষক।
কোম্পানির ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছর শেষে বকেয়া ও পরিশোধের অপেক্ষায় থাকা বিমা দাবির আনুমানিক দায় দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। ২০২৪ সালের শেষে এ দায় ছিল ৫ কোটি ৭৬ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে দায় বেড়েছে প্রায় ২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা বা ৩৬১ শতাংশ।
নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমা দাবির দায় নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য বিচার-বিবেচনার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে দায় কম দেখানোর ঝুঁকিও রয়েছে। এ দায়ের হিসাব যথাযথভাবে নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা কোম্পানির মুনাফা ও নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
মূল বিমা ব্যবসার মুনাফায় বড় পতন
বকেয়া বিমা দাবির দায় বাড়ার পাশাপাশি কোম্পানিটির প্রিমিয়াম আয়েও দুর্বলতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে পূরবী জেনারেলের মোট প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৬৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। আগের বছর এ আয় ছিল ২৫ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। ফলে এক বছরে মোট প্রিমিয়াম আয় কমেছে প্রায় ৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
নিট প্রিমিয়াম আয়ের পতন আরও বেশি। ২০২৫ সালে এ আয় দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৪২ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে নিট প্রিমিয়াম আয় কমেছে প্রায় ১৪ দশমিক ৫২ শতাংশ।
মূল বিমা ব্যবসার মুনাফায়ও বড় ধাক্কা লেগেছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির আন্ডাররাইটিং মুনাফা হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে এ মুনাফা ছিল ৬ কোটি ১২ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে আন্ডাররাইটিং মুনাফা কমেছে প্রায় ৭৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে কোম্পানিটির বিনিয়োগ আয় হয়েছে ১০ কোটি ২২ লাখ টাকা। একই সময়ে নিট প্রিমিয়াম আয় ছিল প্রায় ১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং আন্ডাররাইটিং মুনাফা মাত্র ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ফলে মূল বিমা ব্যবসার মুনাফা কমে যাওয়ার বিপরীতে বিনিয়োগ আয় কোম্পানির সামগ্রিক আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
দায় বেড়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি
কোম্পানিটির মোট দায়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে মোট দায় দাঁড়িয়েছে ৯৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ৭৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এক বছরে দায় বেড়েছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। একই সময়ে মোট সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশ।
এদিকে, বিমা ব্যবসায় নিয়োজিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কাছে কোম্পানির পাওনা বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে এ ধরনের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ১৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সাধারণ বীমা করপোরেশনের কাছে পাওনা ৩৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং পুনর্বিমা ছাড়া অন্য বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা বা কো-ইন্স্যুরেন্সের কাছে পাওনা ১ কোটি ৪ লাখ টাকা।
‘অগ্রিম, আমানত, অগ্রিম ব্যয় ও পাওনা’ খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ আটকে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে এ খাতে ছিল ৪৯ কোটি ১১ লাখ টাকা, আগের বছর যা ছিল ৪১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে আয়কর বাবদ অগ্রিম ৩৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে প্রিমিয়াম পাওনা ১৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
এক ব্যাংকে এফডিআরের বড় অংশ
পূরবী জেনারেলের বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনাতেও ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক। ২০২৫ সালের শেষে কোম্পানিটির স্থায়ী আমানত বা এফডিআর ছিল ৭২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এর উল্লেখযোগ্য অংশ একটি তফসিলি ব্যাংকে রাখা হয়েছে বলে নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের বীমা কোম্পানির সম্পদ বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ বিধিমালার ৬ নম্বর বিধির আলোকে বিষয়টি তুলে ধরেছেন নিরীক্ষক। তবে বার্ষিক প্রতিবেদনে ব্যাংকটির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
এফডিআরকে উচ্চ ঝুঁকির নিরীক্ষা ক্ষেত্র হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, এফডিআর কোম্পানির আর্থিক সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ক্ষেত্রে অর্থের অস্তিত্ব, মূল্যায়ন, সুদ আয় এবং সম্ভাব্য মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি রয়েছে।
শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির বিনিয়োগেও লোকসান রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে শেয়ার কেনার ব্যয়মূল্য ছিল ১০ কোটি ৭২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। বিপরীতে বাজারমূল্য ছিল ৯ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ শেয়ার বিনিয়োগে প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার অনাদায়ি লোকসান ছিল।
এই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ রয়েছে সান্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে। কোম্পানিটির ২৪ লাখ ৪০ হাজার শেয়ারের ক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, আর বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। পূরবী জেনারেলের মোট শেয়ার বিনিয়োগের বাজারমূল্যের প্রায় ৫৬ দশমিক ২৪ শতাংশই ছিল সান্ধানী লাইফের শেয়ারে। অর্থাৎ একটি কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টিও নজরে এসেছে।
কর্মী-সুবিধার তহবিলেও ঘাটতি
কোম্পানির কর্মী-সুবিধা ও হিসাব সংরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক। কোম্পানির নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক মুনাফা অংশীদারত্ব তহবিলে দেওয়ার বিধান থাকলেও এ তহবিলের জন্য পর্যাপ্ত সহায়ক নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। তহবিলটি নিরীক্ষাও করা হয়নি। ফলে এ-সংক্রান্ত দায় ও আর্থিক বিবরণীর তথ্যের পূর্ণতা এবং নির্ভুলতা যাচাইয়ের জন্য পর্যাপ্ত নিরীক্ষা প্রমাণ পাননি নিরীক্ষক।
এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী কোম্পানিটি প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ড প্রতিষ্ঠা করেনি বলে নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কর্মী-সুবিধা থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য দায়ের বিপরীতেও আর্থিক বিবরণীতে কোনো সংস্থান রাখা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানে কোম্পানির বিনিয়োগ নিয়েও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন নিরীক্ষক। এসব বিনিয়োগ কোম্পানির মোট বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর উল্লেখযোগ্য অংশ। এ ক্ষেত্রে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বিধিবিধান প্রযোজ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে কোম্পানি সচিব সোহাগ তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে জানাবেন বলে জানিয়েছিলেন। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।