চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি হলেও দেশের বাজারে সংকট কাটছে না। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিয়েও কোথাও কোথাও মিলছে না ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। এর মধ্যে দুই দিন দেশজুড়ে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ফলে চলমান সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এলপিজি সংকটের কারণ ও বাজার পরিস্থিতি জানতে জেলা প্রশাসকদের কাছে জরুরি তথ্য চেয়েছিল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। তবে নির্দেশনা দেওয়ার ১৩ দিন পরও মাঠপর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে
গত ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের বৈঠকে নিজ নিজ জেলার এলপিজির বাজার পরিস্থিতি নিয়ে নির্দিষ্ট ছকে জরুরি প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়। একই সঙ্গে বাজারমূল্য তদারকিতে জেলা প্রশাসনের চলমান কার্যক্রমের তথ্যও চাওয়া হয়। তবে বারবার তাগাদা দিয়েও এসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে বাজারে এলপিজির সরবরাহ নিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হিসাবে দেশে প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশ রান্নার কাজে, ১২ শতাংশ শিল্পে এবং ৮ শতাংশ অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও আমদানির পরিমাণ ছিল দেড় লাখ টনের বেশি। অর্থাৎ কাগজে-কলমে চাহিদার তুলনায় আমদানি কম নয়।
তারপরও বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি পাচ্ছেন না অনেক গ্রাহক। গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৫৩ টাকা নির্ধারণ করে। সে হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অথচ কোনো কোনো এলাকায় আড়াই হাজার টাকা দিয়েও সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও বাজার তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে ২৯টি এলপিজি কোম্পানি চালু থাকলেও সেপ্টেম্বরে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান আমদানি করেছে। জ্বালানি বিভাগের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র চারটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৬৮ শতাংশ।
আমদানিকারকদের দাবি, দেশে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি করছে বলেও অভিযোগ তাদের।
অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা উল্টো সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দাবি, কয়েকটি কোম্পানির হাতে এলপিজির বিপণন কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে এবং এর ফলে ভোক্তার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এর প্রতিবাদে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দেশজুড়ে এলপিজি সিলিন্ডারের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে সিলিন্ডারপ্রতি ১৫০ টাকা অথবা বিক্রয়মূল্যের ৭ শতাংশ কমিশন নির্ধারণ, চালানে প্রকৃত মূল্য উল্লেখ, ন্যায্য পরিবহন ভাড়া এবং সরবরাহে অক্ষম কোম্পানির সিলিন্ডার পুনরায় গ্যাস ভরার ব্যবস্থা করা।
চলমান সংকটের মধ্যে বিইআরসির বাজার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে কালোবাজারি, মজুতদারি ও অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু দাম নির্ধারণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। আমদানি থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার কার্যকর তদারকি এবং সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ব্যবসায়ীদের ঘোষিত কর্মসূচি কার্যকর হলে চলমান এলপিজি সংকটের মধ্যে ভোক্তাদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে।