Logo

বাংলাদেশের পাটপণ্যে ভারতের একের পর এক শুল্কের খড়গ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬
প্রিন্ট তারিখ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত পাট ও পাটজাত পণ্যে একের পর এক বাণিজ্য-প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে ভারত। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশি পাটপণ্যে টনপ্রতি ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপের পর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একই পণ্যে কাউন্টারভেইলিং ডিউটি (সিভিডি) এবং পাটপণ্যের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত পিইটি ফিল্মে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।

দুটি শুল্কই সর্বোচ্চ হারে কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট পাটপণ্যে টনপ্রতি অতিরিক্ত শুল্ক ৫৮৫ ডলারে পৌঁছাবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো পণ্যে একটি শুল্ক কার্যকর থাকলে নতুন শুল্কারোপ করা যায় না। ভারত মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশি পাটপণ্যে সর্বোচ্চ প্রতি টনে ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করে। জুনে শেষ হওয়া পর্যালোচনার ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর চার দিন পর ২৮ সেপ্টেম্বর ভারতের বাণিজ্য প্রতিকারবিষয়ক মহাপরিচালক (ডিজিটিআর) বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্যে পাঁচ বছরের জন্য সিভিডি আরোপের সুপারিশ করেন। বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তাবিত হার প্রতি টনে ১৪০.০৪ ডলার। পরদিন পাটপণ্যের প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত পিইটি ফিল্মে পাঁচ বছরের জন্য সর্বোচ্চ ২১৮ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের সুপারিশ করে ডিজিটিআর।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অ্যান্টি-ডাম্পিং ও সিভিডি একই সঙ্গে সর্বোচ্চ হারে কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট পাটপণ্যে টনপ্রতি অতিরিক্ত শুল্ক ৫৮৫ ডলারে পৌঁছাবে। এতে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পাতের সুতা, হেসিয়ান ও বস্তার দাম বেড়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে।

বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের সদস্য ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, ভারত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনেক নিয়ম মানছে না। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তারা একপেশে ও জবরদস্তিমূলক সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে।

তিনি মনে করেন, ভারত বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশকে চাপে রাখার চেষ্টা করতে পারে। তবে সিভিডির বিষয়টি এখনো সুপারিশের পর্যায়ে থাকায় বাণিজ্যিক আলোচনার মাধ্যমে সরকার বিষয়টি নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। অন্য দেশের উদারতার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন ব্যবসা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সিভিডি সর্বোচ্চ ১৪০ ডলার

ডিজিটিআরের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তদন্তে সহযোগিতা করা ২৪টি বাংলাদেশি পাটকলের জন্য পৃথক হারে সিভিডি আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। সাগর জুট স্পিনিং মিলস ও ওরিয়েন্টাল জুট মিলসের জন্য প্রতি টনে ১০১.৫৪ ডলার হারের সুপারিশ করা হয়েছে।

নমুনা হিসেবে বাছাই করা ছয়টি মিলকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে তাদের জন্য ১০১.৫৪ থেকে ১৩২.৩৬ ডলারের মধ্যে হার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাকি ১৮টি সহযোগী মিলের জন্য অভিন্ন হার ১১৬.৪৮ ডলার। আর তদন্তে সহযোগিতা না করা অন্যান্য বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের জন্য সর্বোচ্চ ১৪০.০৪ ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্তের আওতায় ছিল পাটের সুতা ও টুইন, বস্তা ও কাপড়, হেসিয়ান কাপড় ও ব্যাগ এবং অন্তত ৫০ শতাংশ পাট থাকা বহুমুখী পাটপণ্য। ভারতীয় পাটকলগুলোর সংগঠন আইজেএমএ ও এপি মেস্তা টোয়াইন মিলস অ্যাসোসিয়েশনের আবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। এতে ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ের তথ্য পরীক্ষা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ঘিরে ভারতের বিধিনিষেধ

বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ভারতের বাণিজ্য-প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নতুন নয়। ২০১৭ সালে পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপের মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক ধারার শুরু। পরে পাটজাত বিভিন্ন পণ্য এর আওতায় আসে এবং ২০২২ সালে আগের শুল্ক আরো পাঁচ বছরের জন্য বহাল রাখা হয়।

এরপর ২০২৫ সালে শুল্কের পাশাপাশি আমদানি-পথ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত। ৯ এপ্রিল বাংলাদেশের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়। ১৭ মে তৈরি পোশাকসহ কয়েক ধরনের বাংলাদেশি পণ্যের স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ করে নির্দিষ্ট সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়।

২৭ জুন পাট ও সংশ্লিষ্ট আঁশজাত পণ্যের আমদানিতেও বন্দর সীমাবদ্ধতা দেওয়া হয়। পরে আগস্টে পাটের বোনা কাপড়, সুতলি, দড়ি, পাটের তার, বস্তা ও ব্যাগের ক্ষেত্রেও স্থলবন্দর ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর সঙ্গে সেপ্টেম্বরে যুক্ত হয়েছে পাটপণ্যে নতুন অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক, সিভিডির সুপারিশ এবং পিইটি ফিল্মে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের প্রস্তাব।

আন্তর্জাতিক আইনে চ্যালেঞ্জের সুযোগ

একই পণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক কার্যকর থাকার পর আবার ভর্তুকির অভিযোগে সিভিডি আরোপের উদ্যোগকে ‘ডাবল রেমেডি’ বা দ্বৈত প্রতিকার হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ভর্তুকি ও প্রতিকারসংক্রান্ত চুক্তি এবং ভারতের কাস্টমস ট্যারিফ আইনের ৯বি ধারার আলোকে একই পরিস্থিতির জন্য অ্যান্টি-ডাম্পিং ও সিভিডি একসঙ্গে আরোপের ক্ষেত্রে আইনি প্রশ্ন রয়েছে।

এ বিষয়ে আইনগত ভিত্তি, ভর্তুকির হিসাব, ক্ষতির তথ্য এবং দ্বৈত প্রতিকারের বিষয় তুলে ধরে ডিজিটিআরের কাছে লিখিত আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ। তদন্ত বন্ধ করারও অনুরোধ করা হয়েছে।

অনিশ্চয়তায় পাটপণ্য রপ্তানি

বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের অন্যতম প্রধান বাজার ভারত। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের মোট পাটপণ্য রপ্তানির ২৪.৩ শতাংশ যায় ভারতে। এরপর তুরস্কে ২১.৪ শতাংশ এবং চীনে সাড়ে ১৭ শতাংশ। তিন দেশ মিলে বাংলাদেশের পাটপণ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের গন্তব্য।

ভারতের নতুন শুল্কের আওতায় থাকা পাটের সুতা ও টুইন বাংলাদেশের পাট খাতের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য। মোট পাট রপ্তানির প্রায় ৬২ শতাংশ আসে এই পণ্য থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৮.০২ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে পাট খাতের মোট রপ্তানি ৩৭.০৯ শতাংশ বেড়ে ১৬ কোটি ২৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। শুধু আগস্টে পাটের সুতা ও টুইন রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪২.৬৮ শতাংশ। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে পাট রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও ভারতের নতুন বাণিজ্য-প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশনের ব্যবস্থাপক (বিপণন) জাকির হোসেন খান জানান, বাংলাদেশের পাটপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার ভারত। পণ্যের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় ভারতের আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য নেন। তবে বাজার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষার কারণ দেখিয়ে ভারত ২০১৭ সালে প্রথম অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করে।

তিনি জানান, ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং ও সিভিডির কারণে বাংলাদেশের পাটকলগুলো আগে থেকেই সমস্যার মুখে পড়েছে। ২০২০ সালের ১ জুলাই রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধের ক্ষেত্রেও এসব শুল্ককে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে দেওয়া মূল্যছাড় বা প্রণোদনা কাঠামো সরকারকে নতুন করে পর্যালোচনা করতে হতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের বাইরে অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশের করণীয়

ভারতের এসব হঠকারী পদক্ষেপের মুখে বাংলাদেশের সামনে আইনি, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কয়েকটি পথ খোলা রয়েছে। এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছে। ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ চাইলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পর্যালোচনা করতে পারে।

একই সঙ্গে ডিজিটিআরের তদন্ত প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে শুল্ক কমানো বা ঠেকানোর চেষ্টা করা সম্ভব। পাশাপাশি বাংলাদেশের পাট খাতে দেওয়া রপ্তানি প্রণোদনা ও অন্যান্য সহায়তা ডব্লিউটিওর নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তাও পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

প্রয়োজনে ভারতের পণ্যের বিরুদ্ধেও বাণিজ্য-প্রতিকার তদন্তের সুযোগ রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি ইউরোপ, আফ্রিকা ও অন্যান্য বাজারে পাটপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ) ভারতের নতুন করে শুল্কারোপের উদ্যোগকে অযৌক্তিক বলে মনে করছে। সংগঠনটির সভাপতি তাপস প্রামাণিক জানান, কোনো পণ্যে একটি শুল্ক কার্যকর থাকার পর একই পণ্যে আবার কাউন্টারভেইলিং ডিউটি (সিভিডি) আরোপ করা যায় না। এ ধরনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে সরকারের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরা উচিত।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আতাউর রহমান খান সাংবাদিকদের বলেন, সিভিডির তদন্ত থেকে সরে আসতে লিখিতভাবে ভারত সরকারকে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তাদের কাজ চালিয়ে গেছে। দিল্লিতে দুদেশের পরবর্তী বৈঠকে পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ ও সিভিডি আরোপের উদ্যোগের বিষয়টি আলোচনা করবে বাংলাদেশ।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: শাহাদাত হোসেন
অফিস: ই- ১৭/৪, পল্টন চায়না টাউন, পল্টন ঢাকা- ১০০০
ফোন: +৮৮০১৭১০-২১০৬৫৭ | ই-মেইল: [email protected]
অনলাইন সংস্করণ: www.deshshamachar.com | © ২০২৬