নুর উদ্দিন, লক্ষ্মীপুরঃ রসনা বিলাস পান শব্দটির সাথে আধিকাল থেকে জড়িয়ে আছে এদেশের গ্রাম-বাংলা নানা ঐতিহ্য। ভোজন বিলাসী অধিকাংশ মানুষের সাথে পানের একটা মনের সর্ম্পক সে বহুকাল থেকে। সমাজের অধিকাংশ নানা পেশার মানুষেরা তাদের কাজের ফাঁকে পান খাওয়া যেন একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এসকল মানুষদের দৈনন্দিন নানা খাদ্যের তালিকায় পান একটা স্থান দখল করে নিয়েছে।

এছাড়া বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ নানারকম সামাজিক অনুষ্ঠানে পানের একটা আলাদা কদর তো আছেই। এদিকে পান চাষ একটি লাভজনক ফসল কিন্তু পানের বাজারে মূল্য কম থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার পান চাষীরা। পান চাষ লাভজনক ফসল হলেও খরচও মোটা অংকের, পান বরজের বিঘাপ্রতি জমিতে বছরে খরচ হয় ১/১.৫ লক্ষ টাকা। করোনার সময় থেকে পানের বাজারে ধস নেমেছে সেখান থেকে পান চাষীরা পান বিক্রি করে পান বরজের খরচ যোগাতে পারছেন না।

এদিকে পান বরজের খরচ দিন কে দিন বেড়েই চলেছে। পানের প্রধান খাদ্য খৈল যার মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি (৭৫কেজি), বস্তা ৩৫ শত থেকে ৪ হাজার টাকা, যার ১ বছর আগের মূল্য ছিলো ২/২.৫ হাজার টাকা। প্রতি বছর দুই থেকে তিন বার পান বরজে খৈল দিতে হয় শুধু তাই নয় মজুরি, বাঁশের শলা, বাঁশ, ক্যাশি বরজের চালে ছাউনির জন্য ব্যবহার করতে হয়, এসবের মূল্য দ্বিগুন হারে বেড়েছে কিন্তু বাড়েনি পানের মূল্য বরং পানির দামে বিক্রি হচ্ছে পান।

করোনা ভাইরাসের লকডাউন থেকে পানের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে পান চাষে চরম ক্ষতির কারনে চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকেরা। পূর্বে যে পানের (পোন) প্রতি ২৫০/৩০০ টাকায় বিক্রি হতো বর্তমান বাজারে ঐ পান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০/৬০ টাকায় ,আগে যে পান ৮০/১০০টাকা বিক্রি হত এখন সেই পান (পোন) প্রতি ২০/৩০ টাকা, ২৫/৩০ টাকার পান বর্তমান বাজার মূল্য ৫/১০ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার রায়পুর উপজেলার ১নং চর আবাবিল ইউনিয়ন। শতাধিক পরিবার এই এলাকায় পূর্ব পূরুষের পেশা পান চাষ ধরে রেখেছেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে নানা সমস্যায় কারণে তারা এখন চাষাবাদটি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। একসময় রায়পুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানের বরজ থাকলেও এখন প্রতিনিয়ম লোকসানের কারণে এই চাষাবাদ চেয়ে অনেকেই জীবনের চাকা ঘুরাতে গিয়ে ভিন্ন পেশায় ঝুঁকছেন।

পান চাষী আনোয়ার হোসেন জানান, গত বছর পান চাষে লাভবান হওয়ায় এবারও ৩২ শতাংশ জমিতে পান চাষ করি। তবে গাছে আশা অনুরূপ পান আসলেও স্বস্তি নেই। কারন পানের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট দাগ, পাতা কুচকে যাওয়া, পাতা ফুটো হয়ে যাওয়া জনিত সমস্যা। ধারনা করা হয়, এটা কোন ভাইরাসের আক্রমনে হয়ত এমন হচ্ছে। তার মতে অত্র অঞ্চলে অধিকাংশ পানের বরজে এখন এমন সমস্যা রয়েছে।

অন্যদিকে আগের বছরগুলোর তুলনায় এবার পানের দাম কম, তাই আয়-ব্যয়ের হিসাব কষে হতাশা ব্যক্ত করছে পান চাষীরা। অনেক পান চাষীরা ব্যাংক বা বিভিন্ন এনজিও কাছ থেকে লোন নিয়ে পান চাষ করে তারা এখন চরম বিপাকে পড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশির ভাগই পান বিক্রি হয় রায়পুর পান বাজার, হায়দারগন্জ বাজার , মিতালী বাজার সব কয়টি বাজারে পানের দাম তিন ভাগের এক ভাগ আর সেটি এখন পান চাষিদের দুশ্চিন্তার কারণ। পান বিক্রির টাকায় সংসার চালানো তো দুরের কথা বরজ চাষের খরচও উঠাতে পারছেন না। সংসার ও বরজ চাষের খরচ যোগাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে অন্য দিকে বরজের জোন মজুরি লাগাম হীন ভাবে বেড়েই চলেছে।

প্রতিদিন ৫/৬ঘন্টা বরজের কাজের মজুরি ৬০০/৮০০টাকা। তবে পানের দাম কম থাকলে পান চাষীরা পান চাষের আগ্রহ হারাবে এমনটি ধারনা করছেন এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এছাড়া সরকারি সহায়তার পাওয়ায় জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকার পান চাষীরা।

রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তাহমিনা খাতুন বলেন, রায়পুর উপজেলার সম্ভাবনার অর্থনৈতিক ফসল পান শিল্প। বিগত সময়ে রায়পুরে পান বরাজ করে, সফলতার মুখ দেখেছিল পান চাষিরা। আর তাই এবারও পান চাষের প্রতি তাদের প্রচুর আগ্রহ লক্ষ করা গেছে।

বর্তমানে বৃষ্টি এবং ভাইরাস জনিত রোগের কারনে আশা অনুরূপ পান না পাওয়ায় চাষিদের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে। তাই পান চাষীদের সমস্যা কাটিয়ে উঠার জন্য কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, আশাকরি খুব অল্প সময়ের মধ্যে আশা অনুরূপ পাবে রায়পুর উপজেলার পান চাষীরা।

অন্য কয়েকজন চাষী বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে পান চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও কৃষি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবসহ নানা কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে পান চাষের পরিমাণ। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি অপর দিকে প্রাকৃতিক দূর্যোগ। এসব কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাস্তবে আমাদের সহযোগিতা জন্যই কেউ এগিয়ে আসেনা। নানারকম বিপাকে পড়ে দিনদিন পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষীরা।