(প্রার্থনার ছবি: ইনক অফ ফেইথ)

ড. যুবাইর মোহাম্মদ এহসানুল হক

কিছু দিন আগে পশ্চিম তীরের জেনিনে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক শিরিন আবু আকলে ইসরাইলি স্নাইপারের গুলিতে নিহত হন। শিরিন খ্রিস্টান ছিলেন। কিন্তু শিরিনের সহকর্মী আল-জাজিরার সংবাদপাঠক/পাঠিকাগণ তার নাম বলার সাথে সাথে রাহিমাহাল্লাহ উচ্চারণ করছেন। ফলে পুরনো একটি ইস্যু নতুন করে জেগে উঠল: অমুসলিমের জন্য কি দোয়া করা যায়?

২০০৫ সালেও একবার এই বিতর্ক ওঠেছিল। রোমান ক্যাথলিক পোপ দ্বিতীয় জন পল মারা গেলে শায়খ ইউসুফ আল-কারযাভী তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি মানবতার যে কল্যাণ করেছেন এবং যে ভালো কাজ রেখে গেছেন সে অনুপাতে আল্লাহ যেন তাকে প্রতিদান দেন, রহম করেন।’ তখন অনেক আলিম এমন দোয়ার সমালোচনা করেছিলেন, সমালোচকদের মাঝে সালাফী-ননসালাফী সকল পক্ষের আলিম ছিলেন।

আমাদের পরিবেশে এই প্রশ্ন অবান্তর মনে হয়। আমাদের চারপাশে অমুসলিম দেখতেই পাই না। কিন্তু যারা অমুসলিমপ্রধান সমাজে বসবাস করেন, তাদের সামাজিকতার জন্য এটি একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন। এ বিষয়ে কিছু সাদামাটা সোজাসাপটা কথা বলি।
জীবিত অমুসলিমের জন্য দোয়া-
১। অমুসলিমের হেদায়াতের জন্য দোয়া করা যায়।
২। তার পার্থিব কল্যাণের জন্য (যেমন সুস্থতার জন্য) দোয়া করা যায়।
৩। অমুসলিমের ভালো কাজের ফল যেন সে দুনিয়ায় পায়, এমন দোয়া করা যায়।

মৃত অমুসলিমের জন্য কি দুআ করা যায়?

১। মৃত অমুসলিমের জন্য জাহান্নাম হতে মুক্তিলাভ ও জান্নাতপ্রাপ্তির জন্য দুআ করা হারাম। পবিত্র কুরআনের আয়াতে তা সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে। ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করা ক্ষমা করবেন না, তবে এর চেয়ে লঘু পাপ ক্ষমা করবেন, যাকে চান।’ (সূরা নিসা ১১৬)। কোন কোন আলিমের মতে কাফিরের জন্য জাহান্নাম হতে মুক্তি ও জান্নাতপ্রাপ্তির জন্য দোয়া করা কুফরি। অন্যরা বলেন, এটি হারাম।

২। জাহান্নাম হতে মুক্তির দোয়া ব্যতীত মৃত অমুসলিমের জন্য অন্য কোন দোয়া করা যাবে কি? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে সূরা নিসার পূর্বোক্ত ১১৬ আয়াতের শরণাপন্ন হওয়া যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, শির্কের পাপ ব্যতীত অন্য পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। অর্থাৎ শির্ক-এর চেয়ে লঘুতর পাপ ক্ষমা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যাকে ইচ্ছা’। ‘যাকে’ শব্দটি আম বা ব্যাপক, যা মুসলিম অমুসলিম সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে। তাহলে তাত্ত্বিকভাবে এটা বলা যায়, অমুসলিমের লঘুপাপ ক্ষমার জন্য দোয়া করা যায়, জান্নাতলাভ বা জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য নয়। অন্যভাবে বলা যায়, এ দোয়ার অর্থ হল, ওই অমুসলিমের লঘুতর পাপ ক্ষমার ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছার বাস্তবায়নের জন্য দোয়া করা।

প্রশ্ন হলো নিশ্চিত জাহান্নামিদের (অমুসলিমদের) লঘুপাপ ক্ষমার জন্য দোয়া করে লাভ কি? উত্তরে বলা যায়, জাহান্নামের অনেক স্তর আছে, যেমন আছে জান্নাতের। স্তরভেদে জাহান্নামের শাস্তির তীব্রতা কমবেশি হয়। তাহলে এই আশায় দোয়া করা যে, আল্লাহ যেন জাহান্নামে তার শাস্তির মাত্রা কমিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা)-এর দোয়ায় আবু তালিবের শাস্তি হ্রাসের বিষয়টিকে এক্ষেত্রে দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যায়: هو في ضحضاح من نار، ولولا أنا لكان في الدرك الأسفل من النار ‘তিনি থাকবেন অল্প আগুনে, আমি না হলে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকতেন।‘ আরো বর্ণিত হয়েছে, لعله تنفعه شفاعتي يوم القيامة ‘আশা করা যায়, আমার শাফা‘আত তাঁর উপকারে আসবে।’

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহি) শাফায়াতকে দোয়া বলেই গণ্য করেছেন। এ হাদীস হতে দু’টি ইঙ্গিত গ্রহণ করা যায়। অমুসলিমের সৎকর্ম পরকালে জাহান্নাম হতে মুক্তিতে কাজে না আসলেও তার আযাব লঘুকরণে সহায়ক হতে পারে। অমুসলিমদের জাহান্নাম হতে মুক্তির জন্য দোয়া করা জায়েজ না হলেও শাস্তি লঘু করার জন্য দেয়া করা যায়। অন্য কথায় তার ব্যাপারে আল্লাহর ক্ষমার ইচ্ছা বাস্তবায়নের দোয়া করা যায়।

সূরা তাওবার ১১৩ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা অমুসলিমদের/মুশরিকদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে নিষেধ করেছেন। এ আয়াতের নিষেধাজ্ঞা শির্কের পাপ ক্ষমা করার জন্য দোয়ার ওপর প্রযোজ্য, যেমনটি বলেছেন অনেক তাফসীরকার। আল্লাহ তা‘আলা ভাল জানেন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়