দেশ সমাচার ডেস্ক : দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল অনেক। অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে বিষয়টি মিলিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ থাকলেও শেয়ারবাজারে সরকারি চাকরিজীবীদের বিনিয়োগ করতে আইনি কোনো বাধা নেই।

তবে, তারা যে পরিমাণ বিনিয়োগ করবেন তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করার পাশাপাশি আয়কর রিটার্নেও তা উল্লেখ করে দিতে হবে- এরকম সুপারিশ করেছে শেয়ারবাজার সম্পর্কিত একটি কমিটি।

শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে তাদেরও মন্তব্য একই। তারা জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবেন না, এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই।

তারা চাইলে শেয়ারবাজারে নিজেদের নামে বিও অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। সেখানে নিয়মিত লেনদেনও করতে পারবেন। এছাড়া পরিবারের সদস্যদের নামেও বিনিয়োগে কোনো বাধা নেই।

বাংলাদেশের সাবেক মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মাসুদ আহমেদ মনে করেন, আইনে বাধা না থাকায় যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাইলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। এবিষয়ে জানতে চাইলে গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন, ‘কেউ যদি কর্মঘণ্টার ক্ষতি না করে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে যুক্ত হয়, তাহলে এখানে ক্ষতির কিছু নেই।

এটা বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ভালো। বিচক্ষণ এবং দক্ষ বিনিয়োগকারী বাড়লে শেয়ারবাজার আরও সমৃদ্ধ হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের চেয়ে বিচক্ষণ এবং দক্ষ। তারা যদি শেয়ারবাজার বিনিয়োগ করেন, তাহলে ভালো ফলই মিলবে।

শেয়ারবাজারে সরকারি চাকরিজীবীদের বিনিয়োগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকসহ তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবেন না, এমন কোনো আইন আছে বলে আমার জানা নেই।

তারা নির্দ্বিধায় বিনিয়োগ করতে পারবেন। তবে তাদের মূল কাজ ক্ষতিগ্রস্ত করে বিনিয়োগের পেছনে সময় দেওয়ার সুযোগ নেই। এটা নৈতিকতাও সমর্থন করে না। ’অধ্যাপক মাহমুদ মনে করেন, ‘পুঁজিবাজারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিনিয়োগের অংকটা কম নয়।

বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে তাদের। তারা যদি বাজার থেকে কোনো কারণে চলে যায় তাহলে গোটা বাজারেই এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তাই এটি নিয়ে যে বা যারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম বলেন, ‘কমিশন থেকে আমরা সকল পর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানাচ্ছি। সরকারি কর্মকর্তা আর সাধারণ জনগণ যে-ই হোক আমাদের কাছে সবাই-ই বিনিয়োগকারী হিসেবে বিবেচিত। আমাদের কাছে যেকোনো বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ করতে কোনো বাধা নেই।’

নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘যদি কারো প্রাতিষ্ঠানিক বাধা থাকে তাহলে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। আমাদের থেকে কোনো বাধা নেই। সরকারি যারা চাকুরিজীবী আছেন তারা চাইলে বিনিয়োগ করতেই পারেন। আমরা সকল স্তরের বিনিয়োগকারীকেই আহ্বান জানাচ্ছি। সেক্ষেত্রে কারোর বিনিয়োগে কোনো বাধা নেই। সবাই-ই বিনিয়োগ করতে পারবে।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশিদ লালী বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে কোনো বাধা নেই। এটা অনুমোদিত। সচিবালয়, ডিফেন্স, পুলিশসহ যারাই আছেন সবাই বিনিয়োগ করতে পারবে। সবার একটা ফিউচার আছে। বিনিয়োগ না করলে উনার ফিউচার কী হবে। সেহেতু সরকার বুঝেই এটাকে অনুমতি দিয়েছে।’

আহমেদ রশিদ লালী বলেন, ‘খুব সম্ভবত ২০১২ সালের দিকে সরকারি কর্মকর্তারা যে বিনিয়োগ করতে পারবে এই নির্দেশনাটা তুলে দেয়ার একটা পায়তারা করেছিলো। তারপর প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছিল এটা বাতিল করা যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আর এটা বাতিল হয় নি। তাই আমি বলব উনারা পুঁজিবাজারে আরো বেশি বেশি বিনিয়োগ করবে। শুধু পুঁজিবাজারই নই সরকারি চাকরিজীবীরা এফডিআর করবে, সঞ্চয়পত্র করবে সকল ধরনের বিনিয়োগ উনারা করবে।’

উনারা তো অন্য কোনো ব্যবসা করতে পারে না। উনারা আলু পেঁয়াজের ব্যবসা করতে পারে না। তাহলে উনারা করবে কী? তাই উনারা অবশ্যই বিনিয়োগ করবে এবং আমি জোর দিয়ে বলব যেন আরো বেশি বিনিয়োগ করে এবং আমার এতে কোনো দ্বিমত নেই বলে জানান ডিএসইর সাবেক এ ভাইস প্রেসিডেন্ট।

পুঁজিবাজারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করেছিলেন সরকার। সেটি প্রায় নয় বছর আগে। অবশ্য কয়েক ঘণ্টার পরেই মৌখিকভাবে সেটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

২০১২ সালের ১৮ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব আবদুস সোবহান সিকদারের সই করা ওই পরিপত্রে বলা হয়, ‘ফাটকা কারবারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিনিয়োগ বিধিবহির্ভূত। অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের ব্যবসায় তারা বিনিয়োগ করতে পারেন না।’

ওই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর পরই পুঁজিবাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। তখন ধসের বৃত্তেই ঘোরপাক খাচ্ছিল পুঁজিবাজার। হঠাৎ প্রজ্ঞাপনে সেই ধস আরও প্রবল হয়। ক্ষতি মোকাবিলায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের পুঁজিবাজারের লেনদেনও বন্ধ রাখা হয়। পরে মৌখিক আদেশে প্রজ্ঞাপনটি প্রত্যাহারের বিষয়টি জানায় তথ্য অধিদপ্তর।

২০১০ সালে পুঁজিবাজারের বড় ধসের কারণ খতিয়ে দেখতে সরকার যে কমিটি করেছিল তার প্রধান ছিলেন খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১১ সালে প্রতিবেদন দিয়েছিল। প্রতিবেদনে ২৫টি সুপারিশের একটিতে বলা হয়, ‘এইসি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল, বাংলাদেশ ব্যাংক ও তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শেয়ার লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।

তবে তারা শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারবেন। চাকরিবিধিতে নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্তকরণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। কর্মকর্তারা নিজ নামে, স্ত্রী, সন্তান, ভাইবোন, পিতা-মাতার নামে অথবা বেনামে শেয়ার লেনদেন করবেন না। সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত কর্মকর্তারা শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারবেন কিন্তু প্লেসমেন্ট নিতে পারবেন না এবং তারা লেনদেনও করতে পারবেন না। বিনিয়োগের জন্য বিও অ্যাকাউন্ট থাকবে এবং বিও অ্যাকাউন্ট নম্বরসহ কত টাকা শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়েছে তা নিজ নিজ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে।’