বেমেয়াদি বন্ড

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি’র সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতভিন্নতা চলছে। এতে ইতিবাচাক কোনো প্রভাব দেখা যায়নি শেয়ারবাজারে। তফসিলি ব্যাংকের বেমেয়াদি বন্ড ইস্যুতে একমত হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বিএসইস।

দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভালোই চলছিলো কার্যক্রম। উভয় সংস্থায়ই একে অন্যের কাজে তৈরি করেছে নতুন এক সেতু বন্ধন। গেলো কিছুদিন ধরে চলমান মতভিন্নতার বিষয়টি সবার দৃষ্টিগোচর হয় যার প্রভাবও দেখা যায় শেয়ারবাজারে। এবার তফসিলি ব্যাংকের বেমেয়াদি বন্ড ইস্যুতে  একমত হয়েছে দুই সংস্থা। এবিষয়ে বাজার সংশ্লিষ্টরা শেয়ারবাজারে দেখছেন নতুন সম্ভাবনা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিএসইসির মধ্যে চলমান মতভিন্নতার অবসান ঘটবে। ধীরে ধীরে সকল বিষয়ের সমাধান হবে বলে মনে করেন তারা।

বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে চায় সরকার। এর মাধ্যমে দেশের বড় বড় প্রকল্পও বাস্তবায়ন করার স্বপ্ন দেখছেন দেশের শিল্প-উদ্যোক্তারা। একই সাথে বিনিয়োগকারীদের নতুন একটি পণ্যের ব্যবস্থা করে দিয়েছে বিএসইসি। বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করার জন্য তফসিলি ব্যাংকের বেমেয়াদি বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সুদ প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছিলো বিএসইসি।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করেছে বিএসইসি। বুধবার বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ব্যাংকের বেমেয়াদি বন্ডের সুদ প্রদানের বাধ্যবাধকতার শর্ত প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পক্ষ থেকে বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ কমিশন সভার মাধ্যমে শর্ত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। বিএসইসির এ সিদ্ধান্ত বুধবারই চিঠির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে অবহিত করা হয়েছে।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, তফসিলি ব্যাংকগুলোর টায়ার-১ মূলধন ভিত্তি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠি বিবেচনা করে কমিশন পারপেচুয়াল বন্ড ইস্যুকারী ব্যাংকগুলোকে ‘বন্ডহোল্ডারদের অর্থ পরিশোধ বা বিতরণ বাতিলের বিষয়টি সর্বদা ব্যাংকগুলোর বিবেচনাধীন থাকবে না’—এ শর্ত পরিপালনের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ জানানো হয়েছে বিএসইসির চিঠিতে।

কমিশনের এ চিঠির অনুলিপি পারপেচুয়াল বন্ডের অনুমোদন পাওয়া পূবালী, ওয়ান, প্রিমিয়ার, স্ট্যান্ডার্ড, এক্সিম, যমুনা, এমটিবি ও এবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ও বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে বেমেয়াদি বন্ডের বিনিয়োগের বিপরীতে সুদ প্রদান করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে শর্ত দিয়েছিল বিএসইসি। কিন্তু ব্যাংকগুলো ব্যাসেল-৩ পরিপালনে অতিরিক্ত টায়ার-১ মূলধন ভিত্তির জন্য পারপেচুয়াল বন্ড ইস্যু করে থাকে।

এক্ষেত্রে টায়ার-১ মূলধন ভিত্তির সংজ্ঞায় বাধ্যতামূলক সুদ পরিশোধসহ ঋণপত্রের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত নেই। ফলে সুদ পরিশোধসংক্রান্ত কমিশনের বাধ্যবাধকতা আরোপের ফলে পারপেচুয়াল বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগৃহীত তহবিলকে অতিরিক্ত টায়ার-১ মূলধন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে না বলে ব্যাংকগুলোকে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলো বিপাকে পড়ে। তবে সুদ প্রদানের বাধ্যবাধকতার শর্ত প্রত্যাহারের কারণে ব্যাংকগুলোর পারপেচুয়াল বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে টায়ার-১ মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার পথ সুগম হয়েছে।

  •  ৮ ব্যাংকের বেমেয়াদি বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে সুদ প্রদানের বাধ্যবাধকতার শর্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে তাদের মধ্যে পূবালী ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ৪৫০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ও ৫০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে।
  • ওয়ান ব্যাংক ২০০ কোটি টাকার বেমেয়াদি বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ১৮০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্টে ও ২০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে।
  • প্রিমিয়ার ব্যাংক বিএসইসির কাছ থেকে ২০০ কোটি টাকার বেমেয়াদি বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ১৮০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ও ২০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে।
  • স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংককে ৫০০ কোটি টাকার মুদারাবা বেমেয়াদি বন্ডের অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। এর মধ্যে ৪৫০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে আর ৫০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে।
  • এক্সিম ব্যাংক কমিশনের কাছ থেকে ৬০০ কোটি টাকার মুদারাবা বেমেয়াদি বন্ড ইস্যুর অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে ৫৪০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে এবং বাকি ৬০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে।
  • যমুনা ব্যাংককে ৪০০ কোটি টাকার বেমেয়াদি বন্ডের অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। এর মধ্যে ৩৬০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে আর বাকি ৪০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে।
  • মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংককে ৪০০ কোটি টাকার বেমেয়াদি বন্ডের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে আর বাকি ৪০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে।
  • এবি ব্যাংকের ৬০০ কোটি টাকার বেমেয়াদি বন্ড অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। এর মধ্যে ৫৪০ কোটি টাকা প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ও বাকি ৬০ কোটি টাকা পাবলিক অফারের মাধ্যমে ইস্যু করা হবে।