সুবর্ণজয়ন্তীতে তাজিংডং বিজয়

মোঃ আশরাফুল আলম

তাজিংডং অবস্থিত বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমাক্রী পাংশা ইউনিয়নে সাইচল পর্বতসারিতে। এটি রুমা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে হলেও থানচি থেকে যাওয়া অনেকটা সুবিধাজনক। তাজিংডং পর্বতের উচ্চতা ১ হাজার ২৮০ মিটার বা ৪,২০০ ফুট তবে অনেকের মতে এর উচ্চতা আরও কম।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে টানা তিনদিন ছুটি পাওয়া যাবে ভেবে বেশ আগে থেকেই পরিকল্পনা করি তাজিংডং বিজয় করার জন্য। এছাড়াও অন্য আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল, আমার ইউটিউউব চ্যানেল ‘গো উইথ আশরাফুল আলম’র জন্য কন্টেন্ট বানানো। যেই ভাবা সেই কাজ। ১৫ ডিসেম্বর, বুধবার অফিসের পাঠ চুকিয়ে রাতের বাসে রওনা দিই বান্দরবনের উদ্দেশ্য কিন্তু কপাল খারাপ! তিনদিনের টানা ছুটিতে রাস্তার বেশ জ্যামের কবলে পড়ে যাই। সকাল ছয়টার মধ্যে বান্দরবন পৌঁছানোর কথা থাকলেও পৌঁছায় দুপুর দেড়টায়। এর মধ্যে আবার একবার গাড়ি নস্ট হয়ে গিয়ে বেশ যন্ত্রনা পোহাতে হয়েছিল।

দুপুরের খাবার খেয়ে পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথে থানচি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নামে। সব গুছিয়ে যখন রওনা দিব তখন রাত আটটা বাজে। সামনে আমাদের প্রায় আট ঘন্টা ট্রেকিং করতে হবে যেটা আমাদের জন্য তখন প্রায় অসম্ভব ছিল কারন আগেরদিন অফিস করে সারারাত বাস এবং চান্দের গাড়ির জার্নি করে আমরা বেশ ক্লান্ত। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম নতুন হওয়া তমাতুংগির রাস্তা ধরে ১৩ কিলোমিটার যাব চান্দের গাড়িতে এতে করে আমাদের চার ঘণ্টা ট্রেকিং কমবে।

আমরা আমাদের টিম লিডার টিজিবি’র মামুন ভাইয়ের নেতৃত্বে এগিয়ে গেলাম। ১৩ কিলো নেমে যখন ট্রেকিং শুরু করলাম তখন বেশ ভালোই লাগছিল। চারিদিকে চাঁদের আলোর মাঝে আমরা একদল তরুন তরুনী প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম। বেশ কিছুক্ষন হাটার পর দেখা পেলাম আদিবাসীদের গ্রাম কাইটং পাড়ার। সেখানে বেশ খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে আবারো যাত্রা শুরু করলাম।

হঠাৎ সামনে প্রায় ৭০ ডিগ্রি খাড়া পাহাড় দেখে চোখ কপালে উঠল! এখন এটা পাড়ি দিতে হবে যেটা আবার প্রায় ২০০ ফিট লম্বা। খাড়া পাহাড় বেয়ে যখন উঠছিলাম তখন মনে হচ্ছিল কেন যে আসতে গেলাম! আর কখনই এভাবে ট্রেকিং করতে বের হব না কিন্তু উঠার পর যখন একটু বিশ্রামের জন্য থেমেছিলাম তখন মনে হয়েছিল প্রকৃতি এত সুন্দর, এত সুন্দর যেটা আসলে পাহাড়ে না আসলে কখনই অনুভব করতাম না। এ জন্যই মনে হয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তার কবিতায় লিখেছিলেন – ‘অনেকদিন থেকেই আমার একটা পাহাড় কেনার শখ, কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না, যদি তার দেখা পেতাম, দামের জন্য আটকাতো না’।

বেশ খানিকটা চড়াই উতরাই পেরিয়ে রাত বারোটা বেজে বিশ মিনিটে তাজিংডংয়ের বেজ ক্যাম্পখ্যাত ‘শেরকর পাড়া’য় পৌঁছালাম আমরা। এরপর শান্তির আহার কেননা আসার পথে শুধু মাত্র খেজুর এবং বাদামই ছিল সম্বল। অবশ্য এর বেশী খাওয়া যেত না, খেলে হাটতে অনেক কস্ট করতে হত। রাতের খাবার সেরে চাঁদের আলোয় ক্যাম্প ফায়ারের সামনে গিটার হাতে আমাদের দলের সদস্যরা যখন গান বাজনা করেছিল তখন সেটা হয়ে উঠেছিল জীবনের অন্যতম সেরা একটি রাত।

সকাল ১১:৩৮, ১৭ ডিসেম্বর ২০২১। বাংলাদেশের অফিসিয়ালি সর্বোচ্চ চূড়া তাজিংডং বিজয় করতে পেরেছি তবে এর আগে অবশ্য শেরকর পাড়া থেকে ঘণ্টা দুয়েক ট্রেকিং করে আসতে হয়েছে। তাজিংডংয়ের চুড়ায় উঠে যে অনুভূতি হয়েছিল সেটা কখনো কাউকে বলে বোঝানো যাবে না! ভিতর থেকে শুধু মনে হচ্ছিল কিছু একটা জয় করে ফেলেছি। আরও বারবার মনে পড়ছিল চাইলেই যে কোন কিছু জয় করে ফেলা সম্ভব। আসলে আমাদের দৈন্দদিন জীবনে এমন অনেক ব্যাপার থাকে যেগুলো নিয়ে আমরা বেশ চিন্তায় পড়ি কিন্তু তাজিংডং জয় করার পর আমার কাছে মনে হয়েছে শুধু মনোবল অটুট থাকলেই যেকোন কিছু জয় করা সম্ভব। আর মনোবল চাঙ্গা করতে হলে এইরকম ট্রেকিং মাঝে মধ্যে করেতেই হবে!

তাজিংডং বিজয়ের পর আশরাফুল আলম । ছবি: সংগৃহীত

তাজিংডং বিজয় করার পর এই দিনটাও আমরা শেরকর পাড়ায় থেকে যাই। আদিবাসীদের ঘরে থেকে তাদের জুম চাষের লাল চাল, আলুর ভর্তা এবং পাহাড়ী খাবার খেয়ে তাদের জীবনটাকে কাছে থেকে বোজার চেষ্টা করি। এই পাড়ার মানুষজন আমাদের কাছে খাবার এবং খাকার জন্য নিয়েছিল নামমাত্র মূল্য যেটা সব মিলিয়ে দিনে জনপ্রতি পাঁচশত টাকার মত তবে লম্বা ছুটির কারনে বান্দরবন থেকে থানছি যাওয়া আসার চান্দের গাড়ি যেখানে আট/নয় হাজার টাকা নেয় সেটা আমাদের কাছ থেক নিয়েছিল চৌদ্দ হাজার করে। এছাড়া থানছি থেকে ১৩ কিলো পর্যন্ত শুধু মাত্র যাওয়া নিয়েছে দুই হাজার তিনশত টাকা করে। গাইডের খরচ নিয়েছে তিন হাজার করে। আমরা বড় টিম হওয়ায় তিনজন গাইড নিয়েছিলাম যদিও কতজন নিতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না।

একটা বিষয় আমার কাছে বেশ কষ্ট লেগেছে সেটা হল কেউ অসুস্থ হলে এখানে চিকিৎসা দেয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। আর আদিবাসীদের পড়ালেখার বন্দোবস্তও অপ্রতুল যদিও পার্বত্য উন্নয় বোর্ড বেশ চেষ্টা করছে। এত দুর্গম পাড়ায় এসে বেশ উৎসাহ পেয়েছি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বাচ্চাদের পড়াশোনার আগ্রহ দেখে।

এবার ফেরার পালা। যান্ত্রিক নগরে ফিরে যেতে হবে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে। পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর সকাল সকাল আমরা বেরিয়ে পড়ি। প্রায় আটঘন্টার ট্রেকিংয়ে আমরা কখন চড়াই কখন উতরাই পেরোই। তবে এই এই দিনের ট্রেকিং বেশ কস্টসাধ্য ছিল যদিও আমাদের তেমনটা কস্ট হয়নি আগের দুইদিনের কারনে। ঝিরিপথ, জুমঘর এবং বেশকিছু ভ্যালির মত যায়গা যখন পার হচ্ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল এই পাহাড়ের মাঝে হারিয়ে গেলে মন্দ হত না। অন্তত জীবনটা প্রকৃতির মাঝে উপভোগ করতে পারতাম!

লেখকঃ পর্যটক ও ‘গো ইউথ আশরাফুল আলম’ নামক ইউটিউব চ্যানেলের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর