দেশ এবং রাষ্ট্র এ দু’টো শব্দকে একই অর্থে ব্যবহার করা যায়, আবার তাদের মধ্যে একটি তফাৎ নির্ণয় করাও সম্ভব। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে উভয়ই এক ও অভিন্ন, কারণ দেশ গঠন করতে দরকার হয় – ভূখণ্ড, মানুষ, সরকার ও সার্বভৌমত্ব।

রাষ্ট্রের বেলাও তাই, তবে জাতীয় স্বার্থরক্ষাকারী জনকল্যাণমুখী নীতিমালা, কর্মতৎপরতা ও কার্যকারিতার দিক থেকে আমার মতে এ দু’টো ধারণা এক নয়, বরং সুস্পষ্টভাবেই আলাদা।

যে দেশের সরকার স্বাধীনভাবে তার সার্বভৌমত্বের চর্চা ও প্রয়োগ করে দেশ ও জনগণের স্বার্থ হাসিল করতে পারে না অথবা ন্যূনতমপক্ষে নাগরিকদের দুয়ারে দুয়ারে ইনসাফ পৌঁছে দিতে পারে না অথবা এ দু’য়ের মাঝে কোনোটরই বিহিত করতে অপারগ – সেটা দেশ হতে পারে, কিন্তু তাকে আমি রাষ্ট্র বলতে নারাজ। আর সম্ভবত এই অর্থেই সম্প্রতি ঢাকার এক টিভি টক’শোতে জনৈক প্রবীণ সাংবাদিক একটি চমৎকার কথা বলেছেন, ‘একাত্তরে আমরা একটি দেশ পেয়েছি, রাষ্ট্র পাইনি’।

আমার প্রশ্ন, আজো কি পেয়েছি? কেবল আমরাই নই, এই জমিনে বসবাসকারী অনেক জাতি আছে যারা নিজ নিজ দেশকে যুগ যুগ ধরেও রাষ্ট্র বানাতে পারেনি। বলাই বাহুল্য, দেশ পাওয়া যত সহজ, তাকে তিলে তিলে রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা তারচেয়ে অনেক কঠিন। তাই তো, আপনার-আমার জন্মভ‚মি – প্রিয় বাংলাদেশ একটি ‘দেশ’ ছিল, ‘দেশ’-ই রইলো, ‘রাষ্ট্র’ আর হলো না।

এবার আসুন – বাংলাদেশ কেন রাষ্ট্র হলো না, এ প্রশ্নে যাওয়ার আগে দেখি, সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র বলতে কী বোঝায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র না হয়েও ইতিমধ্যে আমি ‘ইনসাফ’-এর বিষয়টি যেভাবে রাষ্ট্র-সংজ্ঞার সাথে জুড়ে দিয়েছি, তা উক্ত শাস্ত্রের কোনো কিতাবে আছে কিনা আমার জানা নেই। ধারণাটি আমি কোনো পণ্ডিতের বয়ান কিংবা গবেষণাপ্রবন্ধ থেকেও নেইনি। কথাটি আমার ব্যক্তিগত মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত। এর সাথে কেউ একমত হতে পারেন, নাও পারেন।

তবে যে কথার সঙ্গে কারো দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই তা হলো, ‘রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তার ‘সার্বভৌমত্ব। আমার আজকের আলোচনা শুরু করতে চাই এখান থেকেই। বর্তমান পৃথিবীতে দু’শ-র অধিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্বাধীন দেশ আছে যাদের সবাই তথাকথিত ‘সার্বভৌমত্বের’ দাবিদার। ‘সাধারণ পরিষদে’ পূর্ণ ভোটাধিকার-সহ তারা জাতিসঙ্ঘের সদস্যও বটে। হলে কী হবে, তাদের মধ্যে কতটা রাষ্ট্রপদবাচ্য, কতটা সত্যিকার অর্থে আপন আপন আজাদী ও সার্বভৌম ক্ষমতা এস্তেমাল করতে পারে? এ প্রশ্নগুলো বার বার ঘুরে ফিরে আসে। আম দেশসমূহের কথায় আবার ফিরে আসব। এখন একটু দেখতে চাই মুরব্বীদের কী অবস্থা।

আমরা জানি, দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের মাথার ওপর বসে আছে পাঁচ মুরব্বী (‘ক্লাব অফ ফাইভ’) – যেমন আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। এই ‘ক্লাব অফ ফাইভ’ বিশ্বসংস্থায় নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তাদের প্রত্যেকের হাতে রয়েছে শক্তিশালী ‘ভিটো’ পাওয়ার। এই অভাবনীয় ও অভিনব ক্ষমতাবলে তারা কী না করতে পারে! ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা, বিচার বিশ্লেষণ ও যাচাই বাছাইয়ের পর, ১৫ সদস্যবিশিষ্ট ‘নিরাপত্তা পরিষদে’ ভোটাভুটি হয়।

এতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পাঁচ মুরব¦ীর যে কোনো একজনের পছন্দ না হলে, সে একাই তুড়ি মেরে নিমেশে তা উড়িয়ে দিতে পারে। এ ছাড়াও ‘ক্লাব অফ ফাইভ’-এর সবাই অর্থেবিত্তে, প্রযুক্তিতে, কূটনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে দর কষাকষি করে, মারামারি করে না।

তারা পারষ্পরিক মর্যাদা, দেওয়া-নেওয়া ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সযতেœ আপন আপন সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করে, কোনো রকম সংঘাত ছাড়াই নিজেদের স্বার্থ কৌশলে উদ্ধার করতে পারে। যখন পারে না, তখন প্রতিপক্ষের উপর ক্রমাগত ক‚টনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপ বাড়াতে থাকে। কোনো এক পর্যায়ে এক বা একাধিক বন্ধুরাষ্ট্রকেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে। আখেরে কোনো সময় সফল হয়, কখনো আবার ব্যর্থও হয়। তবে প্রতিপক্ষের উপর কোনো সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে চাপিয়ে দেয় না, দিতে পারে না এবং আক্রান্ত না হলে যুদ্ধও করে না, আবার আত্মসমর্পনও করে না। আর তাই, আন্তর্জাতিক ক‚টনীতিতে সবার ওপরে সবচাইতে সুবিধাজনক জায়গায় তাদের অবস্থান।

এই তারাই যখন অন্যান্য ছোটখাটো রাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক মোয়ামেলাত করে তখন কোনো কোনো সময় নিজেদের একক ও অন্যায্য সিদ্ধান্ত অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করে না। যেমন ইংল্যান্ড করল ‘ফকলান্ড’ যুদ্ধ, আমেরিকা করল ‘ইরাক’ যুদ্ধ। ইতিহাসে এ রকম ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। তবে এ কাজটি সব সময় সবার সাথে একইভাবে করা যায় না। যখন গায়ের জোরে কোনো কিছু কারও ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারে না তখন তারা বোঝাপড়া ও দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে নিজ নিজ জাতীয় অর্থের হেফাজত করে থাকে। এখানে গেল বছরের দু’টো উদাহরণই যথেষ্ট: ১. ইরান যখন উড়ন্ত মার্কিন গোয়েন্দা ড্রোন, গুলি করে ফেলে দিল তখন আমেরিকা পাল্টা হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েও পিছু হটল, সামনে এগোতে পারল না; ২. এককালের পরাশক্তি ইংল্যান্ড, ইরানের তেলবাহী জাহাজ জিব্রাল্টারে আটকাল বটে, কিন্তু ধরে রাখতে পারল না। প্রতিপক্ষের পাল্টা অ্যাকশনে ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো।

এই ঘটনাগুলো আরেকটু ব্যাখ্যার দাবি রাখে। দেখার বিষয়, এখানে কোনো পক্ষই সীমা লঙ্ঘন করেনি। যেমন আমেরিকা ইরানের অকাশসীমা ঘেঁষে ওড়াউড়ি করে ইরানকে একটু বাজিয়ে দেখল – প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কতখানি, কী-ই বা তার আত্মপ্রত্যয়, কিন্তু বোমা ফেলল না, মানুষ মারল না, বাড়াবাড়ি করল না।

একইভাবে ইরান মানুষবিহীন ড্রোন ফেলে আমেরিকাকে সঙ্গে সঙ্গে কড়া ও কঠিন বার্তাটি দিয়ে দিল বটে, কিন্তু সেও সীমা লঙ্ঘন করল না, ভ‚পাতিত করা ওই ড্রোনের পাশেই মানুষ বহনকারী আমেরিকার অন্য বিমানের দিকে কামান দাগাল না। এভাবে উভয়ের জন্য সমস্যার একটি সমঝোতামূলক সম্মানজনক সমাধান হয়ে গেল।

সাবধানে কেউই পরিস্থিতিকে আর বাড়তে দেয়নি, উত্তপ্ত হতে দেয়নি। কাসেম সুলেমানী হত্যার পর খেলাটা একই তরিকায় শেষ হলো – যত গর্জন ততো বর্ষণ হলো না। তবে এখানে আরেকটা বাড়তি উপাদান ছিল। কেউ আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়লো, মুচকি মুচকি হাসলো। যাদের বোঝার তারা বুঝলো ঠিকই, কিন্তু কোনো অ্যাকশনে গেল না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সব খেলায় হার-জিত ও মান-অপমানের কোনো বালাই থাকে না। ইংল্যান্ডের সাথে তেলবাহী জাহাজ নিয়ে ইরানের যা ঘটে গেল তাও চরিত্রগত দিক থেকে একেবারেই এক কিসিমের।

আমার বিবেচনায়, ক‚টনৈতিক ও সামরিক দক্ষতার বলে পাঁচ মুরব্বীর সাথে ইরানকেও ‘রাষ্ট্র’ বলা যায়। এদের সাথে হাতে গোনা আরো কয়েকটি দেশকে এই কাতারে ফেলাও যায় – তার মাঝে সবার আগে যে নামটি আসে সেটা হলো ভারত তারপর আসবে তুরস্কের নাম। কৌশলগত অবস্থান, সামরিক শক্তি ও কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সাথে দীর্ঘ দিন ধরে দেনদরবার অব্যাহত রাখার পরিপ্রেক্ষিতে কেউ বলতে পারেন, পাকিস্তানও এদের দলে পড়ে আবার কেউ এ মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলতেই পারেন, এই দেশের সার্বভৌমত্ব তো চীনের কাছে বন্দক-দেওয়া।

অন্যদের কথা যদি বলি – প্রযুক্তিতে উন্নত ও অর্থনীতির ভিত্তি এতো মজবুত হওয়া সত্তে¡ও – জার্মানী, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, কানাডা ও পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য উন্নত দেশগুলোকে আমি এইসব শক্তিমান সার্বভৌম রাষ্ট্রের সমকক্ষ মনে করি না, কারণ তাদের দেখভাল, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখÐতা যুগ যুগ ধরে ‘ন্যাটো’ তথা আমেরিকার জিম্মায় রয়েছে। তাহলে সার্বভৌমত্বের মাপকাঠিতে দেখা যায় দুনিয়ার অতি অল্প সংখ্যক দেশই রাষ্ট্রপদবাচ্য।

এবার দেখতে চাই – দেশ কিংবা রাষ্ট্র হিসেবে ছোটরা কেন এত বড় ও মহৎ একটি জাতীয় দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে না। পারে না – কারণ তারা ছোট, তারা গরিব, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে তারা দুর্বল।

তারচেয়েও বড় কথা, তারা সব সময় পরাধীনতা ও হীমন্যতার মানিসকতায়ও ভোগে থাকে। তাদের কাজ কারবারে নিজেদের প্রতি আস্থা এবং আপন জনগণের প্রতি যথাযথ সম্মান ও অঙ্গীকারে বিশাল ঘাটতি প্রতিনিয়ত প্রতীয়মান হয়। তারা হামেশা বড় কিংবা পরাশক্তি সমূহের কাছ থেকে একদিকে নানা ধরনের সুবিধা নিয়ে থাকে আবার অন্য দিকে ওই বড়দের চাপে নিষ্পেষিতও হতে থাকে। এর মাঝে যে সব দেশ যত বড়, যত সবল, যত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যত বুদ্ধিমান ও কৌশলী তারা তাদের সার্বভৌমত্বকে ততটাই স্বাধীনভাবে অনুশীলন ও ব্যবহার করতে পারে অথবা অন্তত করার চেষ্টা করতে পারে।

এ ভাবে জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রেখে যে দেশ যত দৃঢ়তার সাথে যত বেশি এই অধিকার প্রয়োগ করতে পারে সে ততটাই স্বাধীন, ততটাই সার্বভৌম, ততটাই রাষ্ট্র নামের যোগ্য। বোধগম্য কারণেই, ইরান যা পারে বাংলাদেশ তা পারে না, প্রতিবেশী দেশ ভারত যা পারে, বাংলাদেশ তা পারে না। তাই অন্য সব ছোট দেশের মতন বাংলাদেশকেও তার সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের আগে তার মুরব্বীদের অর্থাৎ ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, জাপান, সৌদী আরব ইত্যাদি দেশের স্বার্থের দিকে হামেশা যতবান থাকতে হয়। (অসম্পূর্ণ)

লেখক: আবু এন. এম. ওয়াহিদ
অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি
Email: awahid2569@gmail.com