রাবি উপাচার্যের অনিয়মের পাহাড়

অনিয়মের পাহাড়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়ে অনিয়মের পাহাড় গড়ে তুলেছেন । স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতিসহ, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় পরিবর্তন, যোগ্যদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম যোগ্যদের নিয়োগ, আরও বিস্তর অভিযোগ তার  বিরুদ্ধে। মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দিতে উপাচার্য নিয়োগ নীতিমালায় এনেছেন অস্বাভাবিক পরিবর্তন। এম আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ (ইউজিসি) বিভিন্ন দফতরে জমা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’-এর শিক্ষকরা।

জানতে চাইলে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. সুলতান-উল-ইসলাম জানান , শিক্ষক হতে যোগ্যতা কমিয়ে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা অবনমিত করেছেন। তিনি মেয়ে, জামাতাসহ আত্মীয়স্বজনদের নিয়োগ দিতে নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করেছেন। ফলে যোগ্যরা নিয়োগ পাচ্ছেন না। উপাচার্য অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়োগবাণিজ্যে জড়িত। আমরা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিতে এ ব্যাপারে অভিযোগ জানিয়েছি। উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ইউজিসি। ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগমকে আহ্বায়ক করে দুই সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে শুনানির জন্য ডাকলেও তিনি উপস্থিত হননি বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের তদন্তকাজ শেষ হয়েছে। শিগগিরই তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।

তথ্যমতে, অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ২০১৭ সালের ৭ মে। নিয়োগের পর পরই নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন তিনি। মেয়ে সানজানা সোবহান ও জামাতা এটিএম শাহেদ পারভেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানাতে নিয়োগ নীতিমালার পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন।

আরও জানা যায়, আগের নীতিমালায় সব বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল সনাতন পদ্ধতিতে চারটি প্রথম শ্রেণি অথবা গ্রেডিং পদ্ধতিতে এসএসসি ও এইচএসসিতে কমপক্ষে ৪ দশমিক ৫, (তবে ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত উত্তীর্ণদের ক্ষেত্রে এসএসসিতে ৪ এবং ২০০৩ সালের এইচএসসিতে ৪ পয়েন্ট), স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণি অথবা ৩ দশমিক ৫ থাকতে হবে। বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের জন্য স্নাতক অথবা স্নাতকোত্তরের একটিতে ৩ দশমিক ৫ এবং অন্যটিতে ৩ দশমিক ২৫ থাকতে হবে। তবে শর্ত ছিল, মেধা তালিকায় প্রথম থেকে সপ্তম স্থান অধিকারীরাই আবেদন করতে পারবেন।

উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার তিন মাসের মাথায় তিনি বিভিন্ন অনুষদে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা কমিয়ে আনেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকা উপাচার্যের মেয়ে সানজানা সোবহান ও জামাতা এটিএম শাহেদ পারভেজকে নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাণিজ্য অনুষদের প্রার্থীদের যোগ্যতাও কমিয়ে আনেন তিনি। একই সঙ্গে ‘প্রথম থেকে সপ্তম স্থান’ মেধাক্রমের শর্তও তুলে দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে জানা গেছে, উপাচার্যের মেয়ে ও জামাতার মেধাক্রম ছিল যথাক্রমে ২১ ও ৬৭তম।

শিক্ষকরা বলছেন, নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়োগ দিতে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ক্ষুণ করেছেন। এ ছাড়া উপাচার্য ৯টি বিভাগে ও ২টি ইনস্টিটিউটে ৩৪ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। এর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তিনি অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগবাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের জন্য শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও মেয়ে সানজানা সোবহানকে নিয়োগ দিতেই সেখানে এ বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরধারীদের আবেদনের সুযোগ রাখা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ট্যুরিজমে মার্কেটিং বিষয়ে উপাচার্যের মেয়েসহ যে দুজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের কেউই পূর্ব নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য ছিলেন না। যোগ্যতা কমিয়ে তাদের যোগ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের।

এ ছাড়া জামাতা শাহেদ পারভেজও পূর্বের নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনের অযোগ্য ছিলেন। নীতিমালা পরিবর্তন করে যোগ্যতা কমিয়ে উপাচার্য তাকে ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ) শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষকরা বলছেন, অযোগ্যদের নিয়োগ দিতে বিধি পরিবর্তন, মেধাবীদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশকে বিনষ্ট করেছেন উপাচার্য আবদুস সোবহান। মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ ছাড়াও উপাচার্য ৪৮৬তম সিন্ডিকেটে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে তার স্ত্রীর ভাগনে স্ত্রী শিউলী খাতুন, সাবেক পরিবহন প্রশাসক এম এম আলী হায়দারের স্ত্রী রুনা লায়লা ও অধ্যাপক মো. গোলাম কবীরের জামাতা তানভীর ইসলামকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল ও কলেজে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সময়ে উপাচার্য গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. জুলফিকার আলীর পুত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এসব নিয়োগে মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন- নিরাপত্তার শঙ্কা, রাবির ৯ অধ্যাপকের জিডি

আইন বিভাগে অবৈধ নিয়োগ : গত ২০১৭ সালের জুলাইয়ে আইন বিভাগে তিনটি স্থায়ী পদের বিপরীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ৪১ জন প্রার্থী এতে আবেদন করেন। এদের মধ্যে ফ্যাকাল্টি ফার্স্ট, প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকপ্রাপ্তদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক কম যোগ্যতা থাকা নূর নুসরাত সুলতানাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রথম শ্রেণি/ ৩ দশমিক ৫ না থাকা উপ-উপাচার্য অধ্যাপক জাকারিয়ার জামাতা সালাউদ্দিন সাইমুমকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সসহ বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলেও অভিযোগ শিক্ষকদের। অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানকে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে দফায় দফায় কল দেওয়া ও মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি রিসিভ করেননি। জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি হওয়া হতাশাজনক। মেধা ও জ্ঞানচর্চার স্থান হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষা গ্রহণ করতে এসে ছাত্র-ছাত্রীরা যেন অনিয়ম-দুর্নীতির দর্শন নিয়ে না যায় সেটি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা অক্ষুণ রাখতে ও শিক্ষার্থীদের দর্শনকে সমুন্নত রাখতে মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কর্তাব্যক্তিরা যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সুত্রঃ- বাংলাদেশ প্রতিদিন

2 মন্তব্য

Leave a Reply