‘মুহাম্মদ (স) আমার অনুপ্রেরণা, মদিনার মতো মানবিক একটি রাষ্ট্র গড়তে চাই’

ইমরান খান
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান

দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক দেশ গড়ার ঘোষণা দিলেন পাকিস্তানের হবু প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা না হলেও বুধবারের নির্বাচনে জয়ের দাবি করেছেন তিনি। এরপর জাতির উদ্দেশে দেয়া এক আবেগঘন ভাষণে তার আসন্ন সরকারের বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন ‘অধিনায়ক’ ইমরান।

তিনি শুরু করেন এভাবে- “২২ বছর আগে আমি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলাম। আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম কারণ আমার স্বপ্ন ছিল এমন এক পাকিস্তান তৈরি করার যেমনটি চেয়েছিলেন আমাদের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এই নির্বাচনটি পাকিস্তানের ইতিহাসে স্বরণীয় এক নির্বাচন। এই নির্বাচনে বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন। সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়েছে। এসব উপেক্ষা করে মানুষ ভোট দিয়েছে। টিভিতে দেখেছি বৃদ্ধ নারী-পুরুষরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। সবেচেয়ে বেশি ধন্যবাদ বেলুচিস্তানের মানুষদের প্রতি। সবচেয়ে বেশি কষ্ট করে তাদেরকে ভোট দিতে হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ আমরা সফল হয়েছে এবং মানুষের ভোট পেয়েছি।”

কেমন পাকিস্তান তিনি চান সে সম্পর্কে ইমরান বলেন, “খুব সংক্ষেপে আপনাদেরকে বলতে চাই কেমন পাকিস্তান আমি দেখতে চাই। মনে রাখবেন, নবী মুহাম্মদ (স) হলেন আমার অনুপ্রেরণা। মদিনার নগর রাষ্ট্রটিকে তিনি যেমন মানবিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে মানবিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত প্রথম রাষ্ট্র। এটিই আমার অনুপ্রেরণা। পাকিস্তান তেমনই একটি মানবিক রাষ্ট্র হওয়া উচিত, যেখানে আমরা আমাদের মধ্যকার দুর্বল মানুষদের দায়িত্ব গ্রহণ করবো। এখানে দুর্বলেরা ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে। আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করবো যাতে আমার সরকারের নীতি দুর্বল মানুষদের, শ্রমিক মানুষদের, কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে প্রণীত হয়। তারা সারাটা বছর ধরে কাজ করেন, কিন্তু তাদের হক পান না।”

তিনি বলেন, “আমাদের ৪৫ শতাংশ শিশুর শারিরীক বৃদ্ধি পর্যাপ্ত হয় না। ওদের শরীর ও ব্রেইন যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ে না। অনেক দেশে আড়াই কোটি মানুষও বাস করেনা। অথচ আমাদের দেশে আড়াই কোটি শিশু স্কুলে যেতে পারে না। আমার চেষ্টা থাকবে এই মানুষগুলোর জন্য কিছু করা। এ কারণে আমাদের সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হবে মানবসম্পদের উন্নয়ন। আমি চাই পুরো দেশ মিলে আমরা এভাবে ভাববো। আমি চাই পাকিস্তানের সবাই ঐক্যবদ্ধ হবে। নির্বাচনের আগে আমার বিরুদ্ধে অনেক কিছু বলা হয়েছে। এত খারাপ কথা অন্য কারো বিরুদ্ধে বলা হয়নি। কিন্তু এসবই আমি ভুলে গেছি। তারাও আমার সাথে আছেন। ব্যক্তির চেয়ে আমার লক্ষ্য অনেক গুণ বড়।”

ভাষনে তিনি জানিয়েছেন, করের টাকা নষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে থাকবেন না তিনি। তার সরকার হবে মিতব্যয়ী। সরকারি অনেক বাসভবনকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে।

পররাষ্ট্র নীতি বিষয়েও সংক্ষেপে বলেছে হবু প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিশ্বে এখন যদি এমন একটি দেশ থাকে যেটিতে শান্তি দরকার তাহলে সেটি হচ্ছে পাকিস্তান। আর এই শান্তির জন্য প্রতিবেশিদের সাথে ভাল সম্পর্কের বিকল্প নেই।’

চীন, ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশের সাথে ভাল সম্পর্ক কিভাবে আরও জোরদার করা যায় সে বিষয়ে বলার পর ভারতের বিষয়েও কথা বলেছেন ইমরান খান। তিনি বলেন, আমি মনে করি ভারতের সাথে যদি আমাদের ভাল সম্পর্ক থাকে তাহলে তাহলে তা সবার জন্য ভালো হবে। আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি দরকার। যত বাণিজ্য বাড়ানো যাবে ততই উভয়পক্ষ লাভবান হবো। কাশ্মীর একটা সমস্যা রয়েছে। গত ৩০ বছর ধরে কাশ্মীরের মানুষজন ভুক্তভোগী হয়ে আসছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এই সমস্যা সমাধানে পাকিস্তান এবং ভারতের নেতাদেরকে এক টেবিলে বসতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে তো সমাধান হবে না। যদি ভারত প্রস্তু থাকে তাহলে সম্পর্ক উন্নয়নে আমরাও প্রস্তুত। ভারত যদি এক পা আগায়, আমরা এজন্য দুই পা আগাবো। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, যদি আমরা উভয় দেশ বন্ধুত্বে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি তাহলে হবে উপমহাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঘটনা।’

ইমরান তার সরকারের ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে আরও বলেন, ‘আমরা একটা উদাহরণ তৈরি করতে চাই। কিভাবে জবাবদিহিতা করতে হয়। আমি শপথ করছি, আমার সরকার কোন রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় জড়াবে না। আমার সকল নীতি হবে দুর্বলতা কাটিয়ে দেশকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।’

পিটিআই প্রধান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর গভর্নর বাড়ি হবে পর্যটন স্থান।

তিনি চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন হবে বলে জানান, আমরা প্রতিবেশি দেশের সাথে আমাদের সম্পর্কের উন্নয়ন চাই। চীন থেকে দারিদ্র বিমোচনের উপায়টা শিখতে চাই।

আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্ক নিয়ে ইমরান বলেন, আমরা আমাদের প্রতিবেশি দেশের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চাই। আমেরিকার সাথে সম্পর্ক নিয়ে পিটিআই প্রধান বলেন, আমরা আমেরিকার সাথে সমঝোতামূলক সহযোগিতাপূর্ন সম্পর্ক চাই।

গতকাল পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ২৭২ আসনের মধ্যে ১১৮টি পেয়েছে ইমরানের দল। সরকার গঠনে ১৩৭ আসন প্রয়োজন। এজন্য তাকে অন্য কোনো দলের সাথে জোট করতে হবে।

Leave a Reply