ধর্ষণ মামলার বিচারে আলাদা ট্রাইব্যুনাল সময়ের দাবি

৫ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জে ত্রাণ দেয়ার নাম করে ১০ বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়।আর ৭ এপ্রিল বরগুনার তালতলীতে এক দিনমজুরের মেয়েকে ত্রাণের কথা বলে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়।

গত ৯ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৯ বছরের একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। গাজীপুরে এক প্রবাসীর স্ত্রী ও দুই মেয়ে এবং এক ছেলে হত্যার ঘটনায় জানা যায় যে, হত্যার পূর্বে প্রবাসীর স্ত্রী ও দুটি শিশু মেয়েকে ধর্ষণ করা হয় এবং আসামিদের মধ্যে দুজন ছিল বাবা-ছেলে। কতটা ঘৃণ্য মানসিকতার ও বর্বর হলে বাবা-ছেলে মিলেও ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না!

বাংলাদেশে ধর্ষণের সার্বিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এতোক্ষণ। এবার আইনগত বিষয়ে নিয়ে আলোচনায় আসা যাক। ২০০০ সালের আগে বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচার হতো ১৮৬০ সনের দন্ডবিধি অনুযায়ী। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও বৃদ্ধি পায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা।

বেড়ে যায় যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ অপহরণের ঘটনা। এগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা প্রকাশিত হলেও বেশিরভাগ ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায় লোকলজ্জার কারণে।

এসব ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধসমূহ কঠোরভাবে দমন করার জন্য সরকার ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন নামে বিশেষ আইন পাস করে। এই আইনের আওতায় ৫৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়।

এরপর ২০১৮ সালে গঠিত হয় ৪১টি এবং সর্বশেষ চলতি বছরের শুরুতে অর্থাৎ আরো ছয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছয়টি মিলে এখন দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা হবে ১০১টি। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য এ ধরনের ট্রাইব্যুনালে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল যদি ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার কারণ সংবলিত একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করতে হবে।

যার একটি অনুলিপি সরকারকেও দিতে হবে। তাছাড়া এক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে কারণ উল্লেখপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ছাড়াও নারী পাচার, শিশু পাচার, নারী ও শিশু অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচণা, যৌন নিপীড়ন, যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানো, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির উদ্দেশ্যে শিশুর অঙ্গহানি, দাহ্য পদার্থ দ্বারা জখম বা মৃত্যু ঘটানো ইত্যাদি অপরাধের বিচার করা হয়।

২০০০ থেকে ২০২০ সালের চলতি সময় পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার মামলা বিচারাধীন আছে। অর্থাৎ এসব মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা এক হাজার ৭০০টি।

ফলে ধর্ষণ ও এ সংক্রান্ত মামলাসমূহ প্রত্যাশিত হারে দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি সম্ভবপর হচ্ছে না। অথচ ধর্ষণ এমন একটি জঘন্য অপরাধ যাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করাও অযৌক্তিক হবে না। এই জঘন্য অপরাধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে বিচার করা উচিত।

এবার আলোচনা করা যাক প্রস্তাবিত আইনে কোন কোন বিষয় থাকা উচিত। আইনে বলা থাকতে পারে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে একটি করে পৃথক ট্রাইব্যুনাল হবে।

জেলা জজ পদ মর্যাদার একজন বিচারক হবেন এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক। এই ট্রাইব্যুনাল কেবল ধর্ষণ ও ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধসমূহ বিচার করবে। যে সংস্থার হাতেই তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হোক না কেন; তদন্তের সময়সীমা ১০ দিন পর্যন্ত বেঁধে দেয়া যেতে পারে এবং তদন্ত কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন।

Leave a Reply