বিশ্বের নামকরা বৃহত্তম যে ১০ বন্দর

বন্দর হলো নদী বা সমুদ্র সৈকতের নিকটবর্তী একটি স্থান, যা জাহাজসহ অন্যান্য নৌযানের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য বা যাত্রী পরিবহনে ব্যবহার হয়ে থাকে। জলভাগের সঙ্গে স্থলভাগে বাণিজ্যিক চাহিদা এবং জননিরাপত্তা যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের বিষয়ে লক্ষ্য বিবেচনায় রাখতে হয়। বিশ্বের যে কোনো দেশেরই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বন্দরের ভূমিকা অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ । সামরিক কারণেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বন্দর।

পণ্য আনা-নেয়ার ভিতিত্তে বিশ্বের বড় ১০টি পোর্টের (বন্দর) মধ্যে সাতটিই চীনে অবস্থিত। আর বাকি তিনটি রয়েছে সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়ায়।  চীনের সাতটি বৃহত্তম বন্দর।

আরো পড়ুন- বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বেড়েই চলছে

জাহাজ, বন্দর, সমুদ্র প্রভৃতির খবরাখবর নিয়ে কাজ করা সাইট ‘শিপ টেকনোলজি’র বিশ্লেষণে সেরা ১০-এ স্থান পেয়েছে এ বন্দরগুলো। পণ্য পরিবহনের পরিমাণের ভিত্তিতে এদের এই ক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আমরা জানবো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১০টি বন্দর সম্পর্কে।

১০. পোর্ট অব বুশান

বুশান বন্দরটি দক্ষিণ কোরিয়ার নাকতং নদীর মুখে অবস্থিত এটি কার্গো পরিবহনের দিক থেকে বিশ্বের দশম বৃহত্তম বন্দর। ২০১২ সালে বন্দরটি ২৯৮ মিলিয়ন বা ২৯ কোটি ৮ লাখ টন পণ্য খালাস করে।
বন্দরটি সাউথ পোর্ট, গ্যামচিওন পোর্ট , নর্থ পোর্ট এবং দাদাইপো পোর্ট নিয়ে গঠিত। একটি আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল এবং ছয়টি কন্টেইনার টার্মিনাল রয়েছে বন্দরটিতে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দরটি সমুদ্রপথে মোট রফতানি পণ্যের ৪০ শতাংশ, কন্টেইনার ৮০ শতাংশ এবং সমগ্র দেশের মত্স্য পণ্যের ৪২ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমেই আনা-নেয়া করা হয়। এটি ৮ লাখ ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। এছাড়াও বন্দরটি একই সঙ্গে ১৬৯টি জাহাজ পরিচালনা করতে সক্ষম।

৯. পোর্ট অব দালিয়ান

এটি অবস্থিত চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের লিয়াডং উপদ্বীপে। বিশ্বের ৯ম বৃহত্তম বন্দর ‘পোর্ট অব দালিয়ান’। ২০১২ সালে বন্দরটির পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৩ লাখ টনেরও বেশি । এটি ‘দালিয়ান পোর্ট কোম্পানি’র মালিকানাধীন এবং তাদের তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়।
বন্দরের এলাকাজুড়ে জিয়াংলুজিয়াও, গঞ্জিনজি, হিজুইজি, নিয়ানুয়ান, দালিয়ানগ্যাং, দালিয়ানওয়ান, সিরগৌ এবং দায়াওয়ান নামে সাতটি অঞ্চল রয়েছে।

বন্দরটি অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ কার্গো এবং ৯০ শতাংশ কন্টেইনার পরিবহনে ব্যবহার হয়। প্রায় ৮০টি বার্থ বিশিষ্ট্য এই বন্দর বিশ্বের প্রায় ৯৯টি শিপিং লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত।

৮. পোর্ট অব কিংদাও
পোর্ট অব কিংদাও বন্দরটি পীতসাগর ছাড়িয়ে শাডং উপদ্বীপের দক্ষিণ উপকূলে জিয়াঝো উপসাগরের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত । বর্তমানে এটি বিশ্বের ৮ম বৃহত্তম বন্দর। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালে ৪০ কোটি টনের বেশি পণ্য হ্যান্ডেলের রেকর্ড ছিল বন্দরটির। লৌহ আকরিকের জন্য এটি বিশ্বের বৃহত্তম বন্দর এবং চীনের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৃহত্তম বন্দর হিসেবে পরিচিত। কিংদাও পোর্ট গ্রুপের অধীনে বন্দরটি পরিচালিত হয়।

বিশ্বের ১৩০টি দেশ ও অঞ্চলের ৪৫০টির বেশি বন্দরের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। বন্দরটি কিংদাও ওল্ড পোর্ট, হুয়াংদাও অয়েল পোর্ট এবং কিয়ানওয়ান নিউ পোর্টের সমন্বয়ে গঠিত। এর নিকটেই রয়েছে কিংদাও ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল এরিয়া, কিংদাও ফ্রি ট্রেড জোন এবং কিংদাও হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন।

৭. পোর্ট অব সুঝহোও
পণ্য খালাসের দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম বন্দর হলো চীনের ‘পোর্ট অব সুঝহোও’। ২০১২ সালে এর পণ্য খালাসের রেকর্ড ৪২ কোটি ৮ লাখ টন। যা ঠিক তার আগের বছরের (২০১১ সালের) তুলনায় ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। এটি বিশ্বের ব্যস্ততম অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর একটি।
২২৪টি বার্থবিশিষ্ট বন্দরটি শত শত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের সঙ্গে কাজ করে। ‘সুঝহোও মিউনিসিপাল গভর্নমেন্ট’ এর মালিকানায় এটি পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত। যা ‘সুঝহোও হারবার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্ট’ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত।

৬. পোর্ট অব রটারড্যাম

ইউরোপের বৃহত্তম এবং বার্ষিক পণ্য খালাসের দিক থেকে বর্তমান বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম বন্দর এটি। ২০১২ সালে ৫৪ কোটি ১৫ লাখ টন পণ্য পরিবহনে যুক্ত ছিল বন্দরটি।
এর আশেপাশের একটি শিল্প কমপ্লেক্সসহ বন্দরটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪২ কিলোমিটার এবং প্রায় ১২ হাজার ৪২৬ হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত। এর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় রয়েছে ‘পোর্ট অব রটারড্যাম অথোরিটি’। এটি উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের একমাত্র বন্দর যা গভীরতার কারণে অন্যান্য দেশের জাহাজগুলো এখানে নোঙর করার ক্ষেত্রে অবারিত সুবিধা ভোগ করতে পারে।

৫. পোর্ট অব নিংবো

এই তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ‘পোর্ট অব নিংবো’। বন্দরটি উপকূলীয় প্রদেশ ঝেজিয়াংয়ে অবস্থিত। এটি বিলুন, ঝেনহাই, নিংবো, ড্যাক্সি এবং চুয়ানশান বন্দর অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত। নিংবো পোর্ট গ্রুপ এটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে।
২০১২ সালে ৪৫ কোটি ৩ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডেল করা বন্দরটি একই বছরে ১ কোটি ৫৬ লাখ টিইইউ কন্টেইনার পরিবহনের রেকর্ড স্পর্শ করে। ৩০৯টি ঘাট নিয়ে ঘটিত শতাধিক দেশের ৬০০ বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

৪. পোর্ট অব গুয়াংজু

৪৬ কোটি টনের বেশি পরিমাণ কার্গো পরিবহনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বন্দরের তালিকায় নাম লেখায় ‘পোর্ট অব গুয়াংজু’। বন্দরটি ‘পার্ল রিভার ডেল্টা’র মাঝখানে অবস্থিত।
‘গুয়াংজু পোর্ট অথোরিটি’ পরিচালিত বন্দরটি ১৯৯৯ সালে প্রথম ১০ কোটি টন কার্গো পরিবহনের রেকর্ড গড়ে। এরপর থেকেই বন্দরটি উল্লেখযোগ্য হারে কার্গো ট্রাফিক বাড়তে থাকে। এটি বর্তমানে চীনের কয়লার বৃহত্তম লোডিং ও ডিসচার্জিং বন্দর।

৩. পোর্ট অব তিয়ানজিন

বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বন্দরটি হলো ‘পোর্ট অব তিয়ানজিন’। পূর্বে যার নাম ছিল- তাংগু। ২০১২ সালে কার্গো ও কন্টেইনার পরিবহনে যথাক্রমে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ ও ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ওই বছর ৪৭ কোটি ছয় লাখ টন কার্গো এবং ১ কোটি ২৩ লাখ টন টিইইউ কন্টেইনার হ্যান্ডেল করেছে বন্দরটি।

উত্তর চীনের হাইহে নদীর মুখে অবস্থিত এই বন্দরটি ৩৩৬ বর্গ কিলোমিটার জলে এবং ১৩১ কিলোমিটার স্থলভাগে রয়েছে। বিশ্বের ১৮৯টি দেশের ৫০০-এর বেশি বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। এর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ‘তিয়ানজিন পোর্ট গ্রুপ কোম্পানিজ’।

২. পোর্ট অব সিঙ্গাপুর

৫৩ কোটি ৭৬ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডেল করা ‘পোর্ট অব সিঙ্গাপুর’ রয়েছে তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে। ২০১২ সালে বন্দরটি ৩ কোটি টন কন্টেইনার পরিবহনের রেকর্ড করে। তানজং পাগার, কেপেল, ব্রানি, পাসির পাঞ্জাং, সেমবাওয়ং এবং জুরং-এ টার্মিনাল রয়েছে। এগুলোর ব্যবস্থাপনায় রয়েছে পিএসএ সিঙ্গাপুর এবং জুরং পোর্ট।
বছরে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার জাহাজের আনাগোনা বন্দরটিতে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অনেক কারণ, বিশ্বের প্রায় ৬০০টি বন্দরের এর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে।
সিঙ্গাপুর বন্দরে বর্তমানে একটি বড় টার্মিনাল সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলছে। ২০২০ সালে পুরোপুরি চালু হওয়ার কথা ছিল। যেখানো ১৫টি বার্থ যুক্ত হবে।

১. পোর্ট অব সাংহাই

পোর্ট অব সাংহাই’ বা সাংহাই বন্দর যা কার্গো ওঠানামার ভিত্তিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বন্দর হচ্ছে চীনের । পরিসংখ্যান বলছে, চীনের এই বন্দরটিতে ২০১২ সালে ৪৮৮ মিলিয়ন বা ৪৮ কোটি ৮ লাখ টন কার্গো লোড-আনলোড হয়েছে। এর মধ্যে ৩ কোটি ২৫ লাখ ছিল ২০ ফুট সমপরিমাণ ইউনিটের (টিইইউ) কন্টেইনার।
ইয়াংজি নদীর মোহনায় অবিস্তত এই বন্দরটির আয়তন ৩ হাজার ৬১৯ বর্গ কিলোমিটার। এই পরিচালনা করে সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট গ্রুপ (এসআইপিজি)। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ জেটিতে রয়েছে ১২৫টি বার্থ (নৌযান ভিড়ানোর স্থান)। এই বন্দরে মাসে প্রায় দুই হাজার কন্টেইনার জাহাজ আসা-যাওয়া করে। চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের একচতুর্থাংশ এই বন্দর দিয়েই পরিচালিত হয়।

Leave a Reply