বিতর্কে আটকে আছে বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণার : অনিয়ম খুঁজে পায়নি সংসদীয় তদন্ত কমিটি

বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণার

দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু বুক কর্নারের জন্য বই কেনায় অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজে পায়নি সংসদীয় কমিটি। অভিযোগ তদন্তে গঠিত সংসদীয় কমিটি সাংবাদিক নাজমুল হোসেনকে দায়মুক্তি দিয়েছে। একইসাথে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বই নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং কপিরাইট সংক্রান্ত জালিয়াতির সংবাদগুলোকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছে।

সংসদীয় উপ কমিটির আহবায়ক নারায়ণগঞ্জ ২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু জানান, কমিটি বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণারের বইক্রয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো নিয়মের ব্যত্যয় খুঁজে পায়নি। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জার্নি মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের দুটি বই নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ ও ‘৩০৫৩ দিন’ বই দুইটির কপিরাইট সংক্রান্ত কাগজপত্র কমিটির নিকট সঠিক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি আরও জানান, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বই জালিয়াতির মাধ্যমে নাজমুল হোসেনর বিরুদ্ধে সম্পাদক ও প্রকাশকের নাম পরিবর্তনের যে অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সে ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থান ব্যাখা করেছে এবং নাজমুল হোসেনকে দায়মুক্তি প্রদান করেছে।

       নজরুল ইসলাম বাবু’র সাথে দেশ সমাচারের কথোপকথন

এদিকে বই কেনা নিয়ে বিতর্কে আটকে আছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা পাঁচ লক্ষ বই। ৬৫ হাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’সহ আরও সাতটি বইয়ের কয়েক হাজার বান্ডিল স্তুপ হয়ে আছে রাজধানীর মিরপুরের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিচতলায় (দেখুন ভিডিও)। গত জুন মাসে বই কেনা হলেও মেধাস্বত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরী হওয়ায় বইগুলো বিদ্যালয়ে পাঠানো যাচ্ছে না।

  ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’সহ কয়েক হাজার বান্ডিল বইয়ের স্তুপের ভিডিও

অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ আরও সাতটি বইয়ের কয়েক হাজার বান্ডিল বই

জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দেড়শ কোটি টাকা খরচ করে ৬৬টি বই ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু করে। গত অর্থবছরে ৮টি বই কেনা হয়। কিন্তু জার্নি মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের ২টি বইয়ের মেধাস্বত্ত্ব জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বইয়ের বিল আটকে দেয়া হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি অনিয়ম তদন্তে গত ২৬ আগস্ট সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবুকে আহবায়ক করে চার সদস্যের একটি উপ কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন আলী আজম, বেগম শিরীন আখতার ও মোশারফ হোসেন।

কমিটির সদস্যরা গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম বৈঠক করে মন্ত্রণালয়ের কাছে বই কেনার প্রক্রিয়ার নথিপত্র তলব করে তা যাচাই বাছাই করেন।একইসাথে বই কেনার প্রক্রিয়া চালু রাখার সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে ২ নভেম্বর দ্বিতীয় বৈঠকে নির্বাচিত বই ক্রয়ের নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হয়। মুজিববর্ষে ৬৫ হাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণার স্থাপনের উদ্যোগের প্রশংসা করে সংসদীয় উপ কমিটি। একইসাথে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তালিকার অবশিষ্ট বই কেনা এবং চলতি বছরের মধ্যে বিদ্যালয়ে বই পৌছে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য ভোলা ২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক সভায় চুলচেরা বিশ্লেষণ করে প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে থাকেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেও কতিপয় ব্যক্তি বইয়ের গ্রন্থস্বত্ব ও মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগ এনেছেন, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঢালাওভাবে প্রকাশিত হয়েছে।বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও বই নির্বাচন, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং গ্রস্থস্বত্ব ও মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগ কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়নি। কিছু মহল ইর্ষান্বিত হয়ে বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণারের জন্য নির্বাচিত বই ‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ এবং বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন নিয়ে বই ‘৩০৫৩ দিন’ ক্রয়ের ক্ষেত্রে জার্নি মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের বিরুদ্ধে আনা জালিয়াতির অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন।

কমিটির আরেক সদস্য বগুড়া ৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন জানান, বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণার এর জন্য বই কেনায় অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজে পাইনি আমরা।তবে  বিতর্ক এড়াতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিলো বলে তিনি মন্তব্য করেন ।

তদন্ত কমিটির আহবায়ক জানান, উপ কমিটির তদন্ত রিপোর্ট সংসদীয় মূল কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হবে। কমিটির সদস্যরা ১৭ মার্চের আগে বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণারের নির্বাচিত ৬৬টি বই বিদ্যালয়ে পৌছে দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে। একইসাথে অনিয়ম খুঁজে না পাওয়ায় যথাযথ প্রক্রিয়া চেক প্রদানের সুপারিশ করেছে সংসদীয় তদন্ত কমিটি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে জার্নি মাল্টিমিডিয়ার প্রধান নির্বাহী নাজমুল হোসেন জানান, আমি গণমাধ্যম কর্মি হয়েও মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার। আমি কোন চেক হাতে পায়নি অথচ গণমাধ্যমে বলা হয় আমি টাকা আত্মসাত করেছি। মিডিয়ার কাছে এমন মিথ্যাচার অপ্রত্যাশিত। আমি শুরু থেকেই বলে আসছি যে বঙ্গবন্ধুর বইয়ের মেধাস্বত্ত্ব নিয়ে কোন জালিয়াতি হয়নি। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আমি কপিরাইট পেয়েছি। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ২৩% এবং কারা অধিদপ্তরকে ২০% রয়ালিটি দেয়া হচ্ছে। একটি মহল বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণারকে ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ষড়যন্ত্র করেছে। যা সত্যিই খুবই দু:খজনক। আমি সর্বোচ্চ আদালতের ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় রয়েছি।

মিরপুরের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নিচতলায় অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ আরও সাতটি বইয়ের কয়েক হাজার বান্ডিল বই

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণার এর অবশিষ্ট বই কেনার প্রক্রিয়া শুরুর তোড়জোর চলছে। একইসাথে হাইকোর্টে একটি রিটের বিষয় নিস্পত্তি হলে বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণারের জন্য কেনা ৮টি বইয়ের ৫ লক্ষ বই বিদ্যালয়গুলোয় পাঠিয়ে দেয়া হবে।

Leave a Reply