ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং

করোনা মহামারীতেও অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্য। দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে সহায়তাকারী একটি অন্যতম সেবা খাত ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং । পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের মতো বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় শতভাগ কার্যক্রম ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কিন্তু অনেকেই এখাত নিয়ে খুব একটা স্পষ্ট ধারনা রাখেন না। করোনা দুর্যোগে দেশের অন্যতম এ সেবা খাত নিয়ে দেশ সমাচারের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়াডার্স এসোসিয়েশন এর জনসংযোগ পরিচালক মো: কামরুজ্জামান ইবনে আমিন (সোহাইল)

দেশ সমাচার : ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার বিষয়টি নিয়ে সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলুন।

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার হলো দেশের আমাদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে পণ্য পরিবহনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব বহনকারী একটি প্রতিষ্ঠান। ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা সহজেই বিশ্বের যে কোন দেশে পণ্য পাঠাতে বা আনতে সহায়তা করে। ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাররা উৎপাদক বা রপ্তানীকারক থেকে পণ্য গ্রহন করে সঠিক পরিবহণের মাধ্যমে বিশ্বের যে কোন দেশে আমদানিকারকের কাছে পৌঁছে দেয়। এক কথায় ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার হলো পরিবহন কারিগর। কোন দেশে পণ্য পাঠাতে বা পণ্য আনতে আমদানিকারক বা রপ্তানীকারকের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

দেশ সমাচার : কিভাবে কাজ করে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং/কর্ম প্রক্রিয়া?

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের সারা বিশ্বে নিজস্ব অফিস বা এজেন্ট থাকে। এই সব এজেন্ট সে দেশের শিপিং লাইন এবং এয়ারলাইন সমূহের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। তাঁরা আমদানি বা রপ্তানীকারকদের মনোনীত প্রতিনিধি হিসাবে নির্দেশিত বাহনে পন্য পরিবহণ করে থাকে।

দেশ সমাচার : করোনাকালে এই কাজের সীমাবদ্ধতা বা সংকটগুলো কি?

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : করোনাকালে লকডাউনে ফরওয়ার্ডিং ইন্ডাস্ট্রী সর্ব প্রথম পরিবহন সংকটে পড়ে। ব্যস্ত বন্দরগুলোতে জাহাজের আসা যাওয়া কমে যাওয়া, কন্টেইনার সংকট এবং বিশ্বের অনেক দেশে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্পেস স্বল্পতায় আমরা প্রথম মহামারীর প্রভাব অনুভব করি। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পরিবহণ সংকট বহুগুন বেড়ে যায়।

“বাড়ি থেকে কাজ” করা চালু হওয়ায় অফিসগুলি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। ফলে পরিবহন ডকুমেন্টেশন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। করোনার অজুহাতে শিপারদের কাছ থেকে বকেয়া না পাওয়ায় আমাদের পূরো ইন্ডাস্ট্রী এখন তারল্য সংকটে আছে। অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশ সমাচার : ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ব্যবসা চালাতে গিয়ে স্টেক হোল্ডারদের সাথে কোন সমস্যা হয়?

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : হ্যাঁ, মাঝে মাঝে সমস্যা হয়না এমন নয়। আমাদের স্টেক হোল্ডার হলেন দেশের আমাদানি রপ্তানিকারক। অনেক সময় বাস্তব কারণে কাঙ্খিতমূল্যে প্রত্যাশিত সেবা দিতে না পারার কারনে সমস্যা হয়। যে আমাদানি রপ্তানি কারকদের জন্য আমরা কাজ করি অনেক সময় তাঁরা আমাদের অস্তিত্ব মেনে নিতে চান না। আমাদের সেবার মুল্য দিতে চান না। ব্যবসা পরিচালনার কোন খরচ যৌক্তিক কারণে বাড়লে প্রতিবামূখর হয়ে উঠেন ।

দেশ সমাচার : সরকারের যে নীতিমালায় ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং এর কার্যক্রম চলছে তাতে কোন সমস্যা হয়?

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : ২০০৬ সালে সরকার একটি এসআরও জারি করে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কে আইনগত স্বীকৃতি দেয়। সেনা শাসন আমলে প্রণীত ঐ বিধিমালায় অনেক বিধান আমাদের ব্যবসার ধরণ, স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মাধ্যমে আই সি সি ইঙ্কোটার্মসের ভুল ব্যাখার মাধ্যমে আমাদের সেবার যৌক্তিক মুল্য নেওয়া থেকে বঞ্চিত করা হয়।

এই নীতিমালা অনুযায়ী আমাদেরকে প্রতিটি কাস্টমস হাউজে সংযুক্তি নিতে হয়। এটা একটি সমস্যা । একই লাইসেন্সে দেশের সকল বিমান বন্দর, সমুদ্র বন্দর ও কাস্টমস স্টেশনে কাজ করার সুযোগ থাকা উচিত।

দেশ সমাচার : নীতিমালায় কোন পরিবর্তন বা সরকারের কাছে কোন দাবি আছে?

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : এই নীতিমালা অনুযায়ী আমাদেরকে কাস্টমস হাউস থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী লাইসেন্স প্রদানের দায়িত্ব বানিজ্য মন্ত্রনালয়ে স্থানীন্তরিত হওয়া উচিত বলে মনে করি। আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোতেও তাই হচ্ছে। এই নীতিমালায় আরো অনেক অসুবিধা রয়েছে যা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। আমাদের এসোসিয়েশন বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে।

দেশ সমাচার : অর্থনীতিতে আপনারা কীভাবে অবদান রাখছেন?

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সহায়তাকারী একটি অন্যতম সেবা খাত। পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের মতো বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় শতভাগ কার্যক্রম ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিকভাবে লজিস্টিকস সেবা প্রদানে বিশ্বের ৫০টি উদীয়মান অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের স্থান এখন ৩৯তম। আর এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও চীনের পরেই বাংলাদেশের স্থান। এই খাতে বিনিয়োগকারী প্রায় ১,০০০ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং কোম্পানির নিরলস সেবা প্রদানের ফলশ্রুতিতে আমাদের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানী পণ্যের প্রায় শতভাগ ঋণপত্রের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ঋণপত্রের শর্তানুযায়ী ব্যাংকের অনাপত্তি ছাড়া পণ্য ডেলিভারি হলে রপ্তানিকারকরা বায়ারদের কাছ থেকে পণ্যের মুল্য পান না। তাই ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারকে তাদের বিদেশি শাখা বা পার্টনার অফিসের মাধ্যমে ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে পণ্য ডেলিভারি নিশ্চিত করতে হয়।

ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের কমিশনের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার সমৃদ্ধ হয়। ফরওয়ার্ডাররা ভ্যাট প্রদানের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে ভুমিকা রাখেন।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নির্ভর হওয়ার কারণে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং একটি শিক্ষিত জনশক্তি নির্ভর ব্যবসা। তাই, দেশে শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে এইখাত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। বর্তমানে এই খাতে প্রায় লক্ষাধিক নারী-পুরুষ কর্মরত।

দেশ সমাচার : ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং এসোসিয়েশনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানতে চাই।

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফফা) দেশের একক জাতীয় বাণিজ্য সংস্থা হিসাবে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিট হয়। দেশের সব ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের এই এসোসিয়েশনের সদস্য। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সদস্য সনদের প্রয়োজন হয়।

দেশ সমাচার : সদস্যদের জন্য কি কাজ করছে সংগঠনটি ?

কামরুজ্জামান ইবনে আমিন : বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফফা) সদস্যদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সদস্যদের স্বার্থ রক্ষায় আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। কর্ম সম্পাদনে বিভিন্ন বাধা ও চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে সদস্যদের সাহায্য করছে। সরকার এবং স্টেক হোল্ডারদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রেডের সমস্যা, আধুনিকীকরণ, বিধিবিধান প্রনয়ন এবং সেবার মান উন্নয়নে কাজ করছে।

আরো পড়ুন- মোশাররফ করিমের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা