ঢাবির বানানো হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিনামূল্যে পাবে শিক্ষার্থীরা

ফার্মেসি অনুষদের তৈরি হ্যান্ড স্যানিটাইজার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফার্মেসি অনুষদ। করোনা আতঙ্কে যখন সাধারণ মানুষ তাদের ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। তখন এই অনুষদের একদল শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুষদের ল্যাবে কাজ করছেন। আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় ল্যাবের ভেতরে প্রবেশ করা— দেখা গেল ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফিরোজ আহমেদ একটি পাত্রে পানি ঢালছেন। পরে জানা গেল এটি পানি নয় এটি আইসো প্রোপাইল এলকোহল।

এই উপাদান দিয়েই ঢাবির ফার্মেসি অনুষদ ও বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার যৌথ ভাবে বানিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। শুধু বানানোই নয়— এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের মাঝে বিনামূল্যে বিক্রির ঘোষণাও দিয়েছেন তারা। সহযোগিতা পেলে এটি সাধারণ মানুষকেও বিনামূল্যে দিতে চান তারা। অনুষদের এমন ঘোষণা ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে ৩ জন আক্রান্ত হয়েছে বলে জানায় রোগ তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) । এরপর দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। আতঙ্কিত হয়ে তারা মাস্ক এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে ফার্মেসি ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে ভিড় করেন। সঙ্কট দেখা দেয় মাস্ক-হ্যান্ড স্যানিটাইজারের। রাতারাতি বেড়ে যায় করোনা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় এই উপকরণের দাম। ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।

সেই ভোগান্তি থেকে রেহায় মেলেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও। তবে শিক্ষার্থীদের সেই ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদ। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাদের বিনামূল্যে হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহের জন্য নিজেরাই তৈরি করেছে উন্নত মানের হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

ফার্মেসি অনুষদের নিজস্ব ল্যাবে ফার্মেসি অনুষদ ও বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার যৌথ ভাবে এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য তারা এটি তৈরি করেছে। গত ৮ মার্চ বিভাগের নিজস্ব অর্থায়নে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানানোর কাজ শুরু হয়। ১১ মার্চ তা বানানো সম্পন্ন হয়।

করোনাভাইরাস আতঙ্কে এরইমধ্যে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। তবে যারা ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন তারা ফার্মেসি বিভাগের এমন কাজে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। শিক্ষার্থীরা জানান, ফার্মেসি অনুষদের বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মাঝে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। এটি যতদ্রুত সম্ভব বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীদের দেয়ার দাবি জানান তারা।

শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার। তিনি বলেন, করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু অসাধু ব্যবসায়ী হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা তা কিনতে সমস্যায় পড়েন। ফার্মেসি অনুষদ এবং বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টারের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজেদের টাকা খরচ করে শিক্ষার্থীদের জন্য এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়েছে। এটি প্রশংসনীয় কাজ। এই কাজ এগিয়ে নিতে যত ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন ফার্মেসি বিভাগ তা করতে প্রস্তুত রয়েছে।

পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও ল্যাবের সীমাবদ্ধতার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কাউকে এই হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সুবিধা দেয়া যাচ্ছে না জানিয়ে ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রহমান বলেন, আমাদের ল্যাবে পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে এই হ্যান্ড স্যানেটাইজার বানিয়েছে। যা সময় সাপেক্ষ। আমরা সব জনবল লাগিয়ে একদিনে সর্বোচ্চ ৫০০ হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করতে পারব। যা যথেষ্ট না। কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারিসহ প্রায় ৫০ হাজারের পরিবার। এছাড়া আমাদের অর্থেরও সঙ্কট রয়েছে। এটি আমাদের পরিবারের মাঝে দিতেই হিমশিম খাচ্ছি।

প্রথমদিন আমরা ২০০ বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করেছি জানিয়ে আব্দুর রহমান আরও বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত ২০০ বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়েছি। যা বানাতে আমাদের ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পর্যাপ্ত সহযোগিতা এবং অনুদান পেলে এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার আমরা সাধারণ মানুষদেরও দিতে চাই। তবে আমাদের যারাই সাহায্য করুক না কেন আমরা এটি বিনামূল্যে সকলকে দিতে চাই। আমরা মানব সেবার উদ্দেশ্য নিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়েছি। কোনভাবেই আমরা চাইনা এর মূল্য নিতে। বর্তমানে আমরা হ্যান্ড স্যানিটাইজার শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে দিচ্ছি। সাধারণ মানুষকেও এটি বিনামূল্যে দিতে চাই। কেউ যদি দেশের স্বার্থে এটি বানাতে চায়, তাহলে আমরা তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।

প্রসঙ্গত, চীনের উহান প্রদেশ থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে প্রায় ছয় হাজার মানুষ। বিশ্বের ১৫০টি দেশের প্রায় দেড় লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। করোনাভাইরাসের কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেনি বিজ্ঞানীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা।

Leave a Reply